গ্রাফিক্স : বাংলাদেশের খবর
৩৪ দিন পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আর নিজেদের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। জনগণের সঙ্গে দূরত্ব কমানোর জন্য নেওয়া হয়েছে পুলিশের বিভিন্ন সংস্কার কর্মসূচি।
বিগত সরকারের পুরোটা সময় নানান কর্মকাণ্ডে সমালোচিত হয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। বিরোধী মত দমনে পুলিশকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার, নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আক্রমণাত্ব ভূমিকা, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ফলে জনমনে পুলিশের প্রতি চরম অসন্তোষ ও অনাস্থার সৃষ্টি হয়।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ইমেজ থেকে বের হয়ে জনমনে আস্থার জায়গায় ফিরে আসতে চায় পুলিশ। পুলিশের শীর্ষমহল থেকেও এমনটাই বলা হয়েছে। সে লক্ষ্যে কাজও শুরু করেছে বাহিনীটি। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুলিশের ভারমূর্তি পুনরুদ্ধারে শুধু নির্বাচনই একমাত্র পথ নয়। বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মধ্যে এটা হতে পারে উল্লেখযোগ একটি পদক্ষেপ। সফল হতে হলে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রধান এ বাহিনীকে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষ ভূমিকাই জনসাধারনের সঙ্গে পুলিশের দূরত্ব কমাতে সহায়তা করবে।
বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের পুরোটা সময় প্রায় ১৬ বছর আওয়ামী লীগের দলীয় ও সরকারের লাঠিয়াল বাহিনীর ভূমিকা পালন করেছে পুলিশ। সর্বশেষ জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশের নৃশংস হত্যা ও নির্যাতন জনমনে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করে। বিগত সরকারের সময়ে ‘রাতের ভোট’, ‘বিনা ভোট’, ‘ডামি ভোটে’ পুলিশকে সরাসরি ব্যবহার করা হয়েছিল। ফলে ৫ আগস্টের পর চরম আস্থার সংকটে পড়ে বাহিনীটি। সেই সংকট থেকে বের হয়ে এসে জনমনে আস্থার জায়গায় ফেরার চেষ্টা করছে পুলিশ। আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার তথা বদনাম ঘোচানোর প্রধান প্লাটফর্ম হিসেবে বেছে নিয়েছে পুলিশ। বাহিনীটির শীর্ষ পর্যায় থেকেও এমনটাই বলা হয়েছে।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, ২০১৮ সালের কলঙ্কজনক নির্বাচনের পর পুলিশের যে বদনাম হয়েছিল, সামনের নির্বাচনে সেই বদনাম ঘোচানোর একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তিনি মনে করেন আসন্ন নির্বাচনটি দেশে-বিদেশে গ্রহণযোগ্য হবে। এছাড়া গত ৩ জানুয়ারি দুপুরে রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পুলিশের বর্তমান প্রধান অগ্রাধিকার।
ডিএমপি কমিশনার আরও বলেন, জানুয়ারি মাসের ২১ বা ২২ তারিখ থেকে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা শুরু হতে পারে। তখনই মূল জটিলতা তৈরির সম্ভাবনা থাকে। আমরা নিরপেক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে চাই এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেওয়া সম্ভব হবে।
এরই মধ্যে পুলিশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে বিশেষ প্রশিক্ষণ, বডি ক্যামেরা, যোগ্য কর্মকর্তা বাছাইসহ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বাহিনীর ভেতরে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেছেন, নির্বাচনে সব বাহিনী মিলে প্রায় ৮ লাখ সদস্য নিয়োজিত থাকবে। তাদের সবার প্রশিক্ষণ হবে। নির্বাচনের সময় বডি ক্যামেরা থাকবে। চেষ্টা করা হচ্ছে ৪৭ হাজার ভোট কেন্দ্রে প্রতিটিতে একটি করে বডি ক্যামেরা দেওয়ার। নির্বাচনকে সামনে রেখে বাহিনীর যারা নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করবে তাদের সবাইকে ট্রেনিং দেওয়া হবে। প্রশিক্ষণ শেষে মহড়াও হবে। এছাড়া প্রশাসনে বিশেষ করে এসপি ও ওসিদের লটারির মাধ্যমে পদায়ন করা হয়েছে।
তবে বৈধ-অবৈধ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, মব ভায়োলেন্স, জেল পলাতক বিপুল সংখ্যক দাগী আসামি, দেশে ও বিদেশে আওয়ামী লীগের বিপুল সংখ্যক পলাতক নেতা-কর্মী, ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে তাদের ছড়ানো গুজব এবং কালো টাকার ব্যবহারের আশঙ্কা পুলিশের ভাবমুর্তি পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জকে কঠিন করে তুলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
জানা গেছে, জুলাই আন্দোলনের সময় দেশের থানা ও ফাঁড়িগুলো থেকে লুট হওয়া ১৩ শতাধিক অস্ত্র এবং আড়াই হাজারের বেশি গোলাবারুদ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। সেই সঙ্গে লাইসেন্সকৃত বৈধ সব অস্ত্রও জমা হয়নি থানাগুলোতে। এসব অস্ত্রের বড় একটি অংশ রয়েছে বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমমনাদের হাতে। যাদের একটি বড় অংশ দেশ ছেড়ে যাওয়া শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। এসব অস্ত্র অবৈধভাবে ব্যবহারের শঙ্কা রয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, জুলাই ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়ি থেকে ৫ হাজার ৭৫৩টি অস্ত্র লুট হয়। এ সময় গণভবন থেকে লুট হওয়া স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) ৩২টি ভয়ংকর অস্ত্রও রয়েছে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৩৯০টি অস্ত্র উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এখনো এক হাজার ৩৩৫টি অস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি। একই সময়ে থানা থেকে ৬ লাখ ৫১ হাজার ৮৩২টি গোলাবারুদ লুট হয়। যার মধ্যে ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৬৪৩টি গোলাবারুদ উদ্ধার হয়েছে। এখানো দুই লাখ ৫৭ হাজার ১৮৯টি গোলাবারুদ উদ্ধার করা যায়নি।
লুণ্ঠিত ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার প্রসঙ্গে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেছেন, অস্ত্র উদ্ধার একটা চলমান প্রক্রিয়া। প্রতিদিন অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে। নির্বাচনের আগেই লুটে নেওয়া সব অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হবে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সীমান্ত এলাকা দিয়ে কোনো ধরনের অস্ত্র ঢুকতে দেওয়া হবে না।
এছাড়া, জুলাই-আগষ্টে কারগার থেকে পালিয়ে যাওয়া আসামিরাও বিঘ্ন ঘটাতে পারে আইনশৃঙ্খলা। কারা সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ৫ আগস্ট বিভিন্ন কারাগার থেকে ২ হাজার ২৩২ জন বন্দি পালিয়ে গিয়েছিল। পরে গ্রেপ্তার ও ফিরে আসেন ১ হাজার ৫১৯ জন। এখনো ৭১৩ জন বন্দি পলাতক রয়েছেন। এর মধ্যে জঙ্গি ৯ জন, মৃতদণ্ড ও যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি ৬০ জন। এখনো উদ্ধার হয়নি গণঅভ্যুত্থানে কারগার থেকে লুটে নেওয়া ২৭টি অস্ত্র ও কিছু গোলাবারুদ। যদিও ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অস্ত্র ফেরত দিলে পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
অপরদিকে গত ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া মব ভায়োলেন্সও নির্বাচনে নেতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। আসকের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মব সন্ত্রাসে কমপক্ষে ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন। এর আগে ২০২৪ সালে মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিহত হয়েছিলেন অন্তত ১২৮ জন। কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না এই মব ভায়োলেন্স।
এসব বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক, সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বাংলাদেশের খবরকে বলেন, পুলিশ বিভিন্নভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। কতটুকু ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে তা একটা বড় পরিসরে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দৃশ্যমান হবে। কিন্তু চ্যালেঞ্জগুলো বহাল রেখে সক্ষমতার বিষয়গুলো যেমন- অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে, সমনি¦তভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ব্যত্যয় রয়েছে। এখনো লুট হওয়া অস্ত্রের বড় একটি অংশ উদ্ধার হয়নি, গোলাবারুদ কত লুট হয়েছে তা বলতেই পারছে না। কিছু ফাঁড়ি আগুন দিয়ে পোড়ানো হয়েছে, তার কোনো হিসাবই নেই। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কারগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দিরা। তাদের বড় একটি অংশ এখনো ফিরে আসেনি। তারা গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত। তারা বড় ধরনের অপরাধ ঘটাতে পারে। এসব বিষয় নিয়ে পুলিশ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে আছে।’
ড. তৌহিদুল হক আরও বলেন, ‘আমাদের নির্বাচনে পেশি শক্তির ব্যবহারের একটা বড় অংশ হলো অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার। তারপর নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাত সহিংসতা সৃষ্টি। প্রচার-প্রচারণা শুরু হলেই এসব সংঘাত-সহিংসতা সৃষ্টি হবে। এছাড়া টার্গেট কিলিংয়ের প্রসংগগুলো আছে। যে কোনো উপায়ে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার মনোভাব অনেক প্রার্থীর মধ্যে অতীতেও ছিল, বর্তমানেও আছে। চলমান রাজনীতির যে সমীকরণ এই সমীকরণও অনেক প্রার্থী ও ভোটারের মধ্যে উত্তাপ ছড়াবে। এ প্রসঙ্গগুলো কঠোরভাবে কোনো ধরনের বিবেচনাকে গণ্য না করে প্রয়োগ করতে পারলে তাদের যে নতুন সক্ষমতার বিকাশ ঘটেছে তা দৃশ্যমান হবে। আমরা এটাও লক্ষ্য করেছি, পুলিশ কোথাও কোন ব্যবস্থা নিতে গিয়ে পুলিশ নিজেই একটা ব্যবস্থার মধ্যে পড়ে যায়। চাপের মুখে আসামিকে ছেড়ে দিতে বা জামিন দিতে হয়েছে। এটা অন্য অপরাধীদের মধ্যে একটা বার্তা দেয় যে, পুলিশকে চাপের মুখে রাখতে পারলে মব সৃষ্টি বা মব সহিংসতা সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে পুলিশ দ্রুততার সঙ্গে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছে না। এসব বিষয় অপরাধীদের সক্রিয় করে।’
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘আমাদের দেশে নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় সত্য হলো, আমরা ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক, কার্যক্রমের অধিকাংশ ক্ষেত্রে অগণতান্ত্রিক। এই প্রসঙ্গগুলোই নির্বাচনকেন্দ্রিক আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে বড় ব্যাপার। এ জায়গাগুলোতে নজর দিতে হবে। আমার দৃষ্টিতে যেটা মনে হয়, পুলিশকে স্বাধীনভাবে আইন প্রয়োগের সুযোগ দিতে হবে। পুলিশকে স্বাধীনতা দিলাম কিন্তু পেছন থেকে লাগাম টেনে ধরলাম- এমন করলে পুলিশ সফল হবে না। কোনো ধরনের অপরাধ সংঘটিত হলে অপরাধীর কোনো ধরনের রাজনৈতিক বিবেচনা, প্রভাব, পেশাগত পরিচয়ের বিবেচনা গণ্য করতে গেলে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে না। পুলিশকে স্বাধীনভাবে যেকোনো প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে হবে। আবার যে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে সে বিষয়ে যেন কেউ প্রভাব বিস্তার করতে না পারে।’
বিকেপি/এমএইচএস

