তদন্ত প্রতিবেদন
বিগত ৩ নির্বাচন ছিল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ‘মাস্টারপ্ল্যান’
বাংলাদেশের প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:১৮
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে হওয়া তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ‘মাস্টারপ্ল্যান’ হিসেবে দাবি করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে তিন নির্বাচনের ‘দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড’ তদন্তে গঠিত কমিশন।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে এ বন্দোবস্ত করা হয়েছিল’ বলেও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে কমিশন তাদের তদন্ত প্রতিবেদন হস্তান্তর করে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
এদিন সন্ধ্যায় যমুনার সামনে ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, ‘রিফর্মের জন্য যেসব কমিশন করা হয়েছিল, আজ তার শেষ কমিশনের শেষ রিপোর্ট পেশ করা হয়েছে। এই কমিশনটি হলো— ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন তদন্ত কমিশন।’
কমিশনপ্রধান হাইকোর্ট বিভাগের সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইন বলেন, “২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪—এই তিনটি নির্বাচন আলাদা আলাদা মনে হলেও আসলে এটি একটি ‘মাস্টারপ্ল্যান’। এই ‘মাস্টারপ্ল্যান’টি ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর থেকেই নেওয়া হয়। ওই নির্বাচনের পর থেকেই একটি কৌশল ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা। পরে ২০১১ সালে সেটি বাতিল করা হয়। ওই সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করার পেছনে একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ছিল। যেকোনোভাবে ও যেকোনো কৌশলে যতদিন সম্ভব ক্ষমতায় থাকার ক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ছিল একটি বড় বাধা। ব্যবস্থা বাতিলের পর যে নির্বাচনগুলো হয়েছে, তার সবকিছুই আমাদের প্রতিবেদনে স্বচ্ছভাবে উঠে এসেছে।”
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের তিনটি সংসদ নির্বাচন ঘিরে অভিযোগ পর্যালোচনা এবং নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা বিশ্লেষণের জন্য গত জুন মাসে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। পরে ক্ষমতা বাড়িয়ে সেটিকে কমিশনে রূপান্তর করা হয়।
৩০ জুলাই কমিশনের দায়িত্ব দিয়ে জারি করা প্রজ্ঞাপনে আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা বলা হলেও কয়েক দফা সময় বাড়ানোর পর সোমবার তা জমা দেওয়া হয়।
২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন পর্যালোচনার জন্য গত ২৬ জুন এই কমিটি গঠন করা হয়।
হাইকোর্ট বিভাগের সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইনকে কমিশনের সভাপতি করা হয়। সদস্য হিসেবে রয়েছেন সরকারের সাবেক গ্রেড-১ কর্মকর্তা শামীম আল মামুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মাহফুজুল হক (সুপণ), ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী ব্যারিস্টার তাজরিয়ান আকরাম হোসাইন এবং নির্বাচন বিশ্লেষক মো. আব্দুল আলীম।
যা বলছে প্রতিবেদন
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং অবশিষ্ট ১৪৭টি আসনে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতার’ নামে নির্বাচন ছিল সম্পূর্ণ সাজানো ও সুপরিকল্পিত। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে এই বন্দোবস্ত করা হয়েছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালের নির্বাচন সারা বিশ্বে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন হিসেবে সমালোচিত হওয়ায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ২০১৮ সালের নির্বাচনকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ করার মিশন নেয়। বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দল এই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বুঝতে না পেরে নির্বাচনে অংশ নেয়।
তদন্ত কমিশনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে রাতের বেলায় ব্যালট পেপারে সিল মেরে আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করা হয়। আওয়ামী লীগকে জেতাতে প্রশাসনের মধ্যে এক ধরনের অসৎ প্রতিযোগিতা দেখা যায়। ফলে কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোট প্রদানের হার ১০০ শতাংশের বেশি হয়ে যায়।
২০২৪ সালে বিএনপিসহ বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় ‘ডামি প্রার্থী’ দিয়ে নির্বাচনকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ দেখানোর অপকৌশল গ্রহণ করা হয়।
তিনটি নির্বাচনই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিকল্পিত হয় এবং বাস্তবায়নে প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করা হয়। কিছু কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি বিশেষ সেল গঠন করা হয়, যা ‘নির্বাচন সেল’ নামে পরিচিত ছিল।
২০১৪ থেকে ২০২৪ সময়কালে নির্বাচন ব্যবস্থাকে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে মূলত প্রশাসনের হাতে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময়ে কমিশনের পরিবর্তে প্রশাসনই হয়ে ওঠে নির্বাচন পরিচালনার মূল শক্তি।
তিনটি সংসদ নির্বাচনে অনিয়মে কয়েক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী যুক্ত থাকায় এবং তদন্ত কমিশনের জন্য বরাদ্দ সময় সীমিত হওয়ায় সুনির্দিষ্টভাবে কার কী ভূমিকা ছিল, তা চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নির্বাচন ব্যবস্থাকে কলুষিত করতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল, নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও সশস্ত্র বাহিনীর একটি অংশকে ব্যবহার, বিরোধী প্রার্থী ও কর্মীদের নামে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা, অজামিনযোগ্য মামলায় গ্রেপ্তার ও গুম, জাল ভোট প্রদান, নির্বাহী বিভাগকে ব্যবহার করে নির্বাচনি কারচুপি এবং ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানোর মতো ঘটনা ঘটেছে।
এ ছাড়া ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের প্রবেশে বাধা, অনিয়মতান্ত্রিকভাবে সংসদীয় সীমানা নির্ধারণ, আগে থেকেই ব্যালট বাক্স ভরে রাখা, ভোট প্রদানের হারে পরিবর্তন, গণমাধ্যমকর্মীদের প্রবেশে কড়াকড়ি, সরকারের আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ, প্রার্থীদের ভয়ভীতি ও প্রলোভন দেখিয়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহার, নির্বাচনের পর আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশ না করা, নির্বাচনসংক্রান্ত নথি ধ্বংস, অভিযোগ যথাযথভাবে তদন্ত না করা, ডামি প্রার্থী দাঁড় করানো, বিরোধী দলে ভাঙন সৃষ্টি, পর্যবেক্ষক নিবন্ধনে পক্ষপাতিত্ব, রাজনৈতিক দল নিবন্ধনে বৈষম্য এবং নির্বাচনের নামে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের অভিযোগ উঠে এসেছে।
ইভিএম প্রসঙ্গে অধ্যাপক কাজী মাহফুজুল হক (সুপণ) বলেন, ইভিএম চালুর সময় সরকার ও সরকারদলীয় জোট ছাড়া কোনো রাজনৈতিক দল বা বিশেষজ্ঞ এটি সমর্থন করেননি। তারপরও তিন হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়।
তিনি জানান, একাদশ সংসদ নির্বাচনে মাত্র ছয়টি আসনে ইভিএম ব্যবহার করা হয়। মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রকল্প চালু রেখে অর্থ ব্যয় করা।
তিনি বলেন, ‘তদন্ত করে আমরা দেখেছি, এই প্রকল্পটি নির্বাচন কমিশনের নয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারেক আহমদ সিদ্দিকী ও তাঁর অনুসারী কর্মকর্তারা জোর করে এটি ইসির ওপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন।’
তিনি আরও বলেন, পুরো প্রক্রিয়াটি অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হয়। ইভিএমে বাতিল ভোট শূন্য হলেও কারচুপি ঠেকানো যায়নি।
কমিশনের মতে, ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচন নিয়েও তদন্ত হওয়া উচিত।
কাজী মাহফুজুল হক (সুপণ) বলেন, “আমাদের তদন্তের পরিধি ছিল ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪। তবে তদন্ত করতে গিয়ে মনে হয়েছে, ২০০৮ সালের নির্বাচন নিয়েও তদন্ত প্রয়োজন।”
তিনি জানান, ২০১৮ সালে ভোট পড়ার হার ছিল ৮০.১৮ শতাংশ, আর ২০০৮ সালে তা ছিল ৮৮ শতাংশ। ২০১৮ সালে ২১৩টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে, যা বাস্তবসম্মত নয়।
তিনি বলেন, ‘তাহলে ২০০৮ সালে এমন কেন্দ্রের সংখ্যা কত ছিল, তা নিয়ে সন্দেহ জাগে। প্রতিটি নির্বাচনে ভোটগ্রহণের হার পরিবর্তন করা হয়েছে। এটি ইসি ও প্রশাসনকে ব্যবহার করে করা হয়েছে। আমাদের দৃঢ় সন্দেহ— ওই নির্বাচনেও ব্যাপক কারচুপি হয়েছে এবং তা তদন্ত হওয়া উচিত।’
কমিশন সদস্য শামীম আল মামুন বলেন, তিনটি নির্বাচন নিয়ে ৩০০ পৃষ্ঠার বেশি প্রতিবেদন সরকার প্রকাশ করবে।
তিনি জানান, ২০১৪ সালে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন হয় এবং বাকি ১৪৭টি আসনের ভোট ছিল সম্পূর্ণ সাজানো ও সুপরিকল্পিত।
এসআইবি/এমএইচএস

