ব্যালট পেপারে রাষ্ট্রবদল, ১৯৭৭ থেকে ২০২৬ সালের গণভোটের ইতিবৃত্ত
প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৫২
বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে এখন ফাল্গুনের আগাম বাতাস। কিন্তু এবারের ফাল্গুন কেবল ঋতু পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে আসছে না, সঙ্গে নিয়ে আসছে রাষ্ট্র পরিবর্তনের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি আগামী বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। এই দিন বাংলাদেশের জনগণ কেবল জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেবেন না , একই সঙ্গে তারা রায় দেবেন রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামোর ওপর।
বাংলাদেশের ইতিহাসে গণভোট বা 'রেফারেন্ডাম' শব্দটি নতুন নয়। তবে এবারের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্বাধীনতার ৫৫ বছরে দাঁড়িয়ে আমরা যখন চতুর্থবারের মতো গণভোটের মুখোমুখি হচ্ছি, তখন ইতিহাসের দিকে একটু ফিরে তাকানো জরুরি। পেছনের তিনটি গণভোট কেন হয়েছিল? ফলাফল কী ছিল? আর এবারের ভোটটি কেন আলাদা।
১৯৭৭ : আস্থার সংকটে প্রথম হানা
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ প্রথম গণভোট প্রত্যক্ষ করে ১৯৭৭ সালের ৩০ মে। সময়টা ছিল অস্থিরতায় পরিপূর্ণ। পটপরিবর্তনের নানা নাটকীয়তার পর তখন ক্ষমতায় সেনাপ্রধান ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজের শাসনের বৈধতা এবং তার ঘোষিত ১৯ দফা কর্মসূচির ওপর জনগণের আস্থা যাচাই করতে চাইলেন। সেই ভোটের নাম হয়ে গেল 'হ্যাঁ-না' ভোট।
ব্যালট পেপারে প্রশ্ন ছিল সহজ। আপনি কি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ওপর আস্থাশীল? ফলাফল ছিল একচেটিয়া। নির্বাচন কমিশনের হিসেবে সেই ভোটে ৯৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ ভোট পড়েছিল 'হ্যাঁ' বা জিয়াউর রহমানের পক্ষে। মাত্র ১ দশমিক ১২ শতাংশ মানুষ 'না' ভোট দিয়েছিলেন। যদিও সেই ভোটের স্বচ্ছতা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক ছিল বহু বছর।
১৯৮৫ : ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
প্রায় আট বছর পর ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে। তখন ক্ষমতায় আরেক সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ১৯৮২ সালে ক্ষমতা দখলের পর তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রবল চাপের মুখে পড়েন। নিজের অবস্থান শক্ত করতে এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনের আগ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে টিকে থাকার ম্যান্ডেট নিতে তিনি গণভোটের ডাক দেন।
দিনটি ছিল ২১ মার্চ, ১৯৮৫। বিরোধী রাজনৈতিক জোটগুলো এই ভোট বর্জন করেছিল। তবুও ভোট হলো এবং ফলাফল সেই একই ধারায়। নির্বাচন কমিশনের নথিতে দেখা যায়, ৯৪ দশমিক ১৪ শতাংশ ভোট পড়েছিল এরশাদের পক্ষে। 'না' ভোট ছিল মাত্র ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এই দুটি গণভোট মূলত ছিল ব্যক্তির ক্ষমতাকে আইনি বৈধতা দেওয়ার প্রয়াস।
১৯৯১ : গণতন্ত্রের পথে ফেরার লড়াই
১৯৯০ এর গণঅভ্যুত্থানে এরশাদের পতনের পর বাংলাদেশ এক নতুন যুগের সন্ধিক্ষণে দাঁড়ায়। ১৯৯১ সালের গণভোটটি ছিল আগের দুটির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। এটি কোনো ব্যক্তিকে ক্ষমতায় রাখার ভোট ছিল না, এটি ছিল পদ্ধতি পরিবর্তনের ভোট।
তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের শাসনামলে প্রশ্ন উঠল, দেশ কি রাষ্ট্রপতি শাসিত থাকবে নাকি সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে যাবে? প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা সংসদে ঐকমত্যে পৌঁছালেন। কিন্তু সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী চূড়ান্ত করতে প্রয়োজন ছিল জনগণের রায়।
১৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত সেই ভোটে জনগণ বিপুল উৎসাহে অংশ নেয়। ৮৪ দশমিক ৪২ শতাংশ মানুষ সংসদীয় পদ্ধতির পক্ষে অর্থাৎ 'হ্যাঁ' ভোট দেয়। ১৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ মানুষ অবশ্য রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির পক্ষে রায় দিয়েছিল। এটিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম নিরপেক্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ গণভোট হিসেবে দাবি করা হয়।
২০২৬ : নতুন বাংলাদেশ গড়ার ডাক
১৯৯১ সালের দীর্ঘ ৩৫ বছর পর, জনতা গণভোটের ব্যালট পেপার হাতে নিতে যাচ্ছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে চতুর্থ গণভোট। তবে এবারের ভোটটি অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার যে রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থান বিশ্ব দেখেছে, তার আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দিতেই এই আয়োজন। এবারের গণভোটের মূল বিষয় হলো ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ এবং সংবিধানের সংস্কার।
ভোটাররা এবার শুধু প্রার্থী বা দল বাছবেন না, তারা সিদ্ধান্ত নেবেন রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতির ওপর। প্রস্তাবনায় রয়েছে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা, যেখানে ৩০০ আসনের নিম্নকক্ষ ছাড়াও ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ থাকবে। উদ্দেশ্য হলো ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার লাগাম টানতে দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী না হওয়ার বিধান এবং বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতার বিষয়টিও সংস্কারে থাকছে।
অতীতের গণভোটগুলোতে আমরা ব্যক্তিকে বৈধতা দিতে দেখেছি, পদ্ধতি পরিবর্তন হতে দেখেছি। কিন্তু ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সম্ভবত রাষ্ট্রকে নতুন করে নির্মাণ হতে দেখা যাবে। এখন অপেক্ষা কেবল ১২ ফেব্রুয়ারির। ইতিহাসের রায় জানার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আর মাত্র কয়েকটি দিন।


