Logo

জাতীয়

আলজাজিরার বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের নির্বাচনে এখনো নেপথ্যের শক্তি কি সেনাবাহিনী?

Icon

ডিজিটাল ডেস্ক

প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:৪৪

বাংলাদেশের নির্বাচনে এখনো নেপথ্যের শক্তি কি সেনাবাহিনী?

বাংলাদেশের অভ্যুত্থান ও সামরিক শাসনের যুগ আপাতদৃষ্টিতে শেষ হয়ে থাকতে পারে, তবে বিশ্লেষকরা বলছেন যে সেনাবাহিনী এখনো রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী একটি শক্তিশালী শক্তি হিসেবে রয়ে গেছে। ঢাকার রাজনৈতিক আড্ডায় যখনই দেশের প্রকৃত ক্ষমতার লাগাম কার হাতে তা নিয়ে বিতর্ক হয়, তখন একটি শব্দ বারবার ফিরে আসে : ‘কচুক্ষেত’। সেনানিবাসের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলো যে এলাকায় অবস্থিত, সাম্প্রতিক জনআলোচনায় সেই এলাকাটি বেসামরিক বিষয়ে, বিশেষ করে রাজনীতিতে সেনানিবাসের প্রভাবের একটি সংক্ষিপ্ত নাম বা রূপক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে সেনাবাহিনীর প্রভাব ও ভূমিকা নিয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচন থেকে মাত্র কয়েক সপ্তাহ দূরে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর এটিই প্রথম নির্বাচন, যে আন্দোলনের মাধ্যমে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটে এবং নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন ক্ষমতায় আসে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সেনাবাহিনী সরাসরি নির্বাচনী ক্ষমতার জন্য লড়াই করছে না। কিন্তু তারা বর্তমানে জনশৃঙ্খলার সবচেয়ে দৃশ্যমান গ্যারান্টর হিসেবে ভোটের পরিবেশের কেন্দ্রে চলে এসেছে। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর পুলিশের মনোবল ও সক্ষমতা এখনো দুর্বল এবং দেশ এখনো সেই ‘নিরাপত্তা ব্যবস্থার’ হিসাব মেলাচ্ছে, যা পর্যবেক্ষক ও সরকারি তদন্ত অনুসারে হাসিনার অধীনে রাজনৈতিক ফলাফল নির্ধারণে ব্যবহৃত হয়েছিল।

প্রায় দেড় বছর ধরে সৈন্যরা বাংলাদেশের রাস্তায় টহল দিচ্ছে এবং তাদের হাতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনী দায়িত্বে এই মোতায়েন আরও বাড়বে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে দেশজুড়ে প্রায় ১ লাখ সেনা মোতায়েন করা হতে পারে এবং নির্বাচনী বিধিমালার প্রস্তাবিত পরিবর্তন অনুযায়ী সশস্ত্র বাহিনীকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের ‘আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী’র তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সেনাবাহিনী আজ সরাসরি ক্ষমতা দখলের মতো অবস্থানে নেই, তবে এটি একটি শক্তিশালী কেন্দ্র হিসেবে রয়ে গেছে। এমন একটি প্রতিষ্ঠান যা রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে মিশে আছে এবং যা এর নিরাপত্তা ভূমিকা, গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এবং সরকারের ভেতরে শক্তিশালী অবস্থানের মাধ্যমে বেসামরিক পছন্দগুলোকে সীমিত করতে সক্ষম।

সেনাবাহিনীর বর্তমান ভূমিকা
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বাংলাদেশ ও মিয়ানমার বিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরামর্শক থমাস কিন বলেন, সেনাবাহিনী কেবল রাজনৈতিকভাবেই নয়, বরং পুলিশের দুর্বলতার মাঝে ‘দৈনন্দিন নিরাপত্তার মাধ্যমেও অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থন’ দিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি চায় দ্রুত একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর হোক যাতে দেশ একটি শক্তিশালী সাংবিধানিক ভিত্তিতে ফিরে আসে এবং সৈন্যরা ‘ব্যারাকে ফিরে যেতে’ পারে।

থমাস কিন বলেন, ‘সেনাবাহিনীর মধ্যে বিভিন্ন উপদল এবং মতাদর্শ থাকতে পারে, তবে সামগ্রিকভাবে আমি বলব যে সেনাবাহিনী চায় নির্বাচনটি যেন যথাসম্ভব সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হয়।’ তিনি যুক্তি দেন যে, যদি সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এবং সামরিক বাহিনী ক্ষমতা নিতে চাইত, তবে ৫ আগস্ট রাজনৈতিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার দিনেই তারা তা করতে পারত। কিন্তু তারা তা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কারণ অতীতে সরাসরি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরীক্ষা-নিরীক্ষার নেতিবাচক ফলাফল থেকে তারা শিক্ষা নিয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ শাহান বলেন, সামরিক বাহিনী সচেতন ছিল যে ক্ষমতা দখল করলে তাদের জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনসহ প্রধান স্বার্থগুলো ঝুঁকির মুখে পড়ত, যা সশস্ত্র বাহিনীর জন্য বড় ধরনের আর্থিক সুবিধা ও মর্যাদা বয়ে আনে। তবে শাহান মনে করেন যে সামরিক বাহিনী এখনো একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পক্ষ’ হিসেবে রয়ে গেছে। বর্তমানে তাদের প্রভাব সরাসরি হস্তক্ষেপের চেয়ে তাদের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কাঠামোর মাধ্যমে প্রাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক ওজনের ওপর বেশি নির্ভরশীল।

তিনি সেনাবাহিনীর ‘কর্পোরেট’ পদচিহ্নের দিকেও ইঙ্গিত করেন। এই পদচিহ্ন রাষ্ট্রের প্রধান অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে সম্পৃক্ততা, সামরিক বাহিনীর নিজস্ব ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং বাণিজ্যিক ও রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোতে কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের উপস্থিতির মাধ্যমে বিস্তৃত। শাহান বলেন, বিগত হাসিনা সরকার তাদের ‘সুযোগ-সুবিধার ভাগ’ দিয়েছিল, যার ফলে ‘এক ধরনের দুর্নীতির সংস্কৃতি মজ্জাগত’ হয়ে গেছে। এটি পরবর্তী সরকারের ওপরও একই সুযোগ-সুবিধা বজায় রাখার জন্য একটি অনানুষ্ঠানিক চাপ হিসেবে কাজ করতে পারে।

সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও লেখক রাজিব হোসেন অবশ্য মনে করেন সেনাবাহিনী এবার নিরপেক্ষ থাকবে। তিনি বলেন, ‘গত দেড় বছরে আমরা মাঠ পর্যায়ে যা দেখেছি, তাতে সেনাবাহিনী কোনো দলীয় আচরণ করেছে এমন কোনো রেকর্ড নেই।’ তবে তিনি যোগ করেন যে, সেনাবাহিনীর ওপর চাপ এখন তীব্র। অভ্যন্তরীণভাবে একটি বোধ কাজ করছে যে, যদি সেনাবাহিনী নিরপেক্ষ থাকতে ব্যর্থ হয়, তবে তারা তাদের অবশিষ্ট জন-গ্রহণযোগ্যতাও হারাবে।

অতীতের সামরিক হস্তক্ষেপ ও বর্তমান বাস্তবতা
সেনাবাহিনী সবসময় বর্তমানের মতো অবস্থানে ছিল না। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর দেশ অভ্যুত্থান ও পাল্টা-অভ্যুত্থানের এক যুগে প্রবেশ করে। সেখান থেকেই জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন এবং বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮১ সালে তিনি নিহত হন এবং ১৯৮২ সালে এইচ এম এরশাদ ক্ষমতা দখল করে প্রায় এক দশক শাসন করেন। ২০০৭ সালে আবারও সেনাবাহিনী সমর্থিত একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসে। ২০০৯ সালে হাসিনা পুনরায় ক্ষমতায় আসার পরই সেনাবাহিনী পুরোপুরি বেসামরিক শাসনের অধীনে চলে যায়।

অস্পষ্ট সীমারেখা
সেনাবাহিনী ক্ষমতা চায় না বললেও তারা প্রায়ই রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করেছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেনারেল জামান ১৮ মাসের মধ্যে নির্বাচনের সময়সীমা নিয়ে কথা বললে সমালোচনার সৃষ্টি হয়। বিশ্লেষক আসিফ শাহান বলেন, নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা সেনাপ্রধানের দায়িত্বের বাইরে। এটি তখন এমন দেখায় যেন তিনি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ডিক্টেট করছেন।

হাসিনার রেখে যাওয়া ক্ষত ও বিচার প্রক্রিয়া
বিশ্লেষকরা বলছেন যে সামরিক বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে এখন এত তীব্র বিতর্ক হওয়ার অন্যতম কারণ হলো বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ক্ষত। হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৫শ’র বেশি মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। বর্তমানে বেশ কয়েকজন সেনাসদস্যের বিরুদ্ধে বেসামরিক ট্রাইব্যুনালে গুম ও হত্যার বিচার চলছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল। রাজিব হোসেন মনে করেন, এই বিচার প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে না, বরং এটি সেনাবাহিনীর হৃতগৌরব পুনরুদ্ধারের একটি সুযোগ।

থমাস কিন বলেন, বাংলাদেশের জন্য আসল পরীক্ষা হবে তারা নিরাপত্তা সংস্থাকে দলীয় রাজনীতিতে পুনরায় মিশে যাওয়া থেকে আটকাতে পারে কি না। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে সেনাবাহিনী একটি স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে গণতন্ত্র ও বেসামরিক নেতৃত্বের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবে। তবে এর দায়ভার কেবল জেনারেলদের নয়, বেসামরিক রাজনীতিবিদদেরও সেনাবাহিনী অপব্যবহার করার প্রলোভন ত্যাগ করতে হবে।

সূত্র : আলজাজিরা 

এমএইচএস

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

সংসদ নির্বাচন সেনাবাহিনী

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর