Logo

জাতীয়

সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনে ব্যাপক প্রস্তুতি

Icon

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:৩৪

সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনে ব্যাপক প্রস্তুতি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের লক্ষে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ভোটগ্রহণের কয়েক দিন আগে থেকেই মাঠে নামানো হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ১০ লাখ সদস্য। নিয়োজিত করা হয়েছে সহস্রাধিক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। জারি করা হয়েছে সভা-সমাবেশ ও যান চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ। একই সঙ্গে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের হাতে পৌঁছেছে পৌনে পাঁচ লাখ পোস্টাল ব্যালট, সম্পন্ন হচ্ছে ব্যালট বাক্স ও নির্বাচনী সরঞ্জাম বিতরণ। ইসি নির্বাচন ও গণভোট স্থগিতের গুজবকে ভিত্তিহীন আখ্যা দিয়ে ভোটারদের বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে এবং ভোটকেন্দ্রকে ধূমপানমুক্ত এলাকা ঘোষণা করেছে। 

ঢাকার ১৩টি আসনে ৯৬ ঘণ্টার সভা-সমাবেশ নিষেধাজ্ঞা, মোটরসাইকেল ও নির্দিষ্ট যানবাহন চলাচলে নিয়ন্ত্রণ এবং প্রার্থীদের প্রচারণা শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে- নির্বাচন ঘিরে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। প্রায় ১৩ কোটি ভোটার, ২৯৯ আসনে দুই হাজারের বেশি প্রার্থী এবং প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্রকে ঘিরে এই নির্বাচন ও গণভোট দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ এক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে।

নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গতকাল রোববার মাঠে নেমেছে বিভিন্ন বাহিনীর ১০ লাখ সদস্য। এ ছাড়া এদিন থেকে মাঠে নেমেছেন ১ হাজার ৫১ জন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট। তারা ভোটের মাঠে থাকবেন ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে মাঠে নামছেন তারা।

ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা পরিপত্রে বলা হয়েছে, নির্বাচন সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালনা শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য পুলিশ, বিজিবি, আনসার ও ভিডিপি এবং কোস্টগার্ড মোতায়েন করা হয়েছে এবং স্থানীয় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তায় ইন এইড টু সিভিল পাওয়ারের আওতায় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে।

পরিপত্রে আরও বলা হয়, নির্বাচনী এলাকায় শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য সশস্ত্র বাহিনী, বিজিবি, কোস্টগার্ড, র‌্যাব, পুলিশ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) এবং আনসার ব্যাটালিয়ন মোবাইল এবং স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করবে। বিজিবি, র‌্যাব, এপিবিএন এবং আনসার ব্যাটালিয়ন জেলা, উপজেলা ও থানাভিত্তিক কাজ করবে। আর উপকূলীয় এলাকার জন্য কোস্টগার্ড মোতায়েন থাকবে।

আরও বলা হয়, সব বাহিনী রিটার্নিং অফিসারের কাছে রিপোর্ট করবে। এ ছাড়া তার নির্দেশ এবং পরামর্শ অনুসারে সবার দায়িত্ব পালন করবে।

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রোববার থেকে বিভিন্ন বাহিনীর মোট ৯ লাখ ৭০ হাজার ৯৪৮ জন নিরাপত্তা সদস্যের নির্বাচনী দায়িত্বে আছেন। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ১ লাখ ৩ জন সদস্য। এছাড়া নৌবাহিনীর ৫ হাজার, বিমানবাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০, বিজিবির ৩৭ হাজার ৪৫৩, কোস্টগার্ডের ৩ হাজার ৫৮৫, পুলিশের ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩, র‍্যাবের ৯ হাজার ৩৪৯ এবং আনসার ও ভিডিপির ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৪৮৩ জন সদস্য। এর বাইরে ১ হাজার ৯২২ জন বিএনসিসি ক্যাডেট এবং ৪৫ হাজার ৮২০ জন গ্রাম পুলিশ (চৌকিদার ও দফাদার) দায়িত্ব পালন করছেন।

জানা গেছে, এ নির্বাচনে মেট্রোপলিটন এলাকার বাইরে সারা দেশে প্রতিটি সাধারণ ভোটকেন্দ্রে ১৬-১৭ জন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৭-১৮ জন পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবেন। আর মেট্রোপলিটন এলাকার সাধারণ ভোটকেন্দ্রে পুলিশ ও আনসারের ১৬ জন ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৭ জন থাকবেন। দুর্গম ঘোষিত ২৫ জেলার নির্দিষ্ট এলাকার ভোটকেন্দ্রে ১৬-১৮ জন করে পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েন করা হবে। এসব সদস্য ভোটগ্রহণের দুদিন আগ থেকে ভোটের দিন পর্যন্ত দায়িত্বে থাকবেন।

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সাংবাদিকদের বলেন, সেনাবাহিনী আগে থেকেই মাঠে আছে। রোববার থেকে আরও যুক্ত হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে তারা ভোটের আগে ও পরে সাত দিন থাকবে। আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বৈঠক করেছি। তারা সবাই বলেছে, মাঠের অবস্থা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভালো এবং নির্বাচনের জন্য সহায়ক আছে।

এ সময় তিনি আরও বলেন, সব ব্যালট বাক্স জেলায় জেলায় পাঠানো হয়েছে। রিটার্নিং অফিসাররা সেগুলো গ্রহণ করছে। এখন সবাই ভোটের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত।

শুক্রবার ইনকিলাব মঞ্চের আন্দোলন নির্বাচনের পরিবেশে কোনও প্রভাব পড়েছি কিনা, এ নিয়ে আপনারা চিন্তিত কিনা জানতে চাইলে এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, না, আমরা ওটাকে চিন্তিত মনে করি না। তবে নির্বাচনের যেহেতু আর দুই-চার দিন বাকি আছে, তাদের দাবি দাওয়া থাকতেই পারে। তারা যেন নির্বাচনের স্বার্থে এই দাবি দাওয়াগুলো আপাতত বন্ধ রাখে। এটা আমরা আহ্বান জানাই। আমরা মনে করি নির্বাচনের পরিবেশ সম্পূর্ণ ভালো আছে।

রিটার্নিং কর্মকর্তাদের হাতে পৌঁছাল পৌনে ৫ লাখ পোস্টাল ব্যালট: প্রবাস ও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ৪ লাখ ৭০ হাজার ২০২টি পোস্টাল ব্যালট রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছেছে। এর মধ্যে প্রবাসী ভোটারদের পাঠানো ৩ লাখ ১৮ হাজার ১২৫টি ব্যালট রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাঠানোর কাজ শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

রোববার ইসির পোস্টাল ব্যালটে প্রবাসী ও অভ্যন্তরীণ ভোটার নিবন্ধন বিষয়ক ‘ওসিভি-এসডিআই’ প্রকল্পের টিম লিডার সালীম আহমাদ খান এ তথ্য জানান।

ইসি জানায়, বিভিন্ন দেশে ৭ লাখ ৬৬ হাজার ৮৬২টি পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হয়েছে। প্রবাসীরা গ্রহণ করেছেন ৫ লাখ ২৭ হাজার ৪৫০টি পোস্টাল ব্যালট। এর মধ্যে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন ৫ লাখ ৩  হাজার ৪৪১ জন প্রবাসী এবং দেশে ফেরত পাঠাতে পোস্ট অফিসে পোস্টাল ব্যালট জমা দিয়েছেন ৪ লাখ  ৮৪ হাজার ৭৬৫ জন প্রবাসী। বাংলাদেশে পৌঁছেছে ৪ লাখ ২৮ হাজার ৮২৮টি, যার মধ্যে ৩ লাখ ১৮ হাজার ১২৫টি ব্যালট রিটার্ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাঠানোর কাজ শেষ করেছে ইসি। ইসি আরও জানায়, দেশের অভ্যন্তরে অবস্থিত ভোটারদের কাছে পাঠানো হয়েছে ৭ লাখ ৬০ হাজার ৮৯৮টি ব্যালট। এর মধ্যে গ্রহণ করেছেন ৪ লাখ ৪৩ হাজার ৫৪২ জন ভোটার। ভোট দিয়েছেন ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৮৯৮ জন, আর পোস্ট অফিসে জমা দিয়েছেন ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৮৯৮ জন। রিটার্নিং কর্মকর্তা এর মধ্যে ব্যালট গ্রহণ করেছেন ১ লাখ ৫২ হাজার ৭৭টি।

ভোটকেন্দ্রকে ধূমপানমুক্ত এলাকা হিসেবে নিশ্চিত করার নির্দেশ ইসির: সংসদ নির্বাচন ও গণভোট চলাকালে কেন্দ্রগুলোকে ধূমপানমুক্ত এলাকা হিসেবে নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

ইসি সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব মো. শহিদুল ইসলামের সই করা এক চিঠিতে এ কথা বলা হয়েছে। চিঠিটি স¤প্রতি সব রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়েছে।

ঢাকার ১৩ আসনে ৯৬ ঘণ্টা সভা-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা: ঢাকা মহানগরের ১৩টি সংসদীয় আসনে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ উপলক্ষে ভোটগ্রহণের আগে ও পরে মোট ৯৬ ঘণ্টা সব ধরনের জনসভা, মিছিল ও শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

নিষেধাজ্ঞাটি ঢাকা-৪ থেকে ঢাকা-১২, ঢাকা-১৪ এবং ঢাকা-১৬ থেকে ঢাকা-১৮ আসনে কার্যকর থাকবে। ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার ও রিটার্নিং অফিসার শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরীর স্বাক্ষরিত এক গণবিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ‘স্থগিতের’ তথ্য ভিত্তিহীন-ইসি: গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন ‘স্থগিত’ হওয়ার বিষয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অপপ্রচারকে ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর বলে উল্লেখ করে এসবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

রোববার ইসির জনসংযোগ পরিচালক রুহুল আমিন মল্লিক সাংবাদিকদের এ তথ্য জানিয়েছেন। 

ভোটের দিন ২৪ ঘণ্টা যেসব যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা, চলবে যেসব: জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে সারা দেশে যানবাহন চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে সরকার। এ বিষয়ে গত ১ ফেব্রুয়ারি একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে বিধিনিষেধের বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দিয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ৩২ ধারা অনুযায়ী ভোটগ্রহণের দিন বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ট্যাক্সিক্যাব, পিকআপ, মাইক্রোবাস ও ট্রাক চলাচল বন্ধ থাকবে। এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে ১১ ফেব্রুয়ারি (বুধবার) দিবাগত রাত ১২টা থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত ১২টা পর্যন্ত  টানা ২৪ ঘণ্টা।

এদিকে, নির্দেশনা অনুযায়ী, ১০ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত ১২টা থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত ১২টা পর্যন্ত মোট ৭২ ঘণ্টা সারা দেশে মোটরসাইকেল চলাচল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ থাকবে।

ভোট দেখতে আসছেন ৫০০ বিদেশি প্রতিনিধি: গণভোট ও সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিদেশি সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের উদ্দেশ্যে বিশেষ ব্রিফিংয়ের আয়োজন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আগামী ১১ ফেব্রুয়ারি (বুধবার) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে এ ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হবে। রোববার নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ পরিচালক মো. রুহুল আমিন মল্লিক সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানান, এবারের নির্বাচন ও গণভোট পর্যবেক্ষণ করতে বিদেশি সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষক মিলিয়ে প্রায় ৫০০ জনের মতো প্রতিনিধি বাংলাদেশে আসবেন। তাদের অবস্থান ও তথ্য সংগ্রহের সুবিধার্থে এরই মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।

এদিকে ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের আগে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টায় প্রচার শেষ করতে হবে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

এবারের সংসদ নির্বাচনে ২৯৯ আসনে দুই হাজার ৯ জন প্রতিদ্ব›দ্বী রয়েছে। এরমধ্যে আড়াই শতাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছে, বাকিরা ৫১টি দলের প্রার্থী। এবার প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের জন্য ৩০০ আসনে প্রায় ৪২ হাজার ৭৭৯ ভোটকেন্দ্র। 

বিকেপি/এমবি 

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

সংসদ নির্বাচন

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর