‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নে কী বদলাবে— তা জানেন না ৫৪ শতাংশ মানুষ’
বাংলাদেশের প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪:৩৮
ছবি : বাংলাদেশের খবর
জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন ও গণভোটের আগে ভোটারদের মধ্যে তথ্যঘাটতি এবং নির্বাচন-পরবর্তী অনিশ্চয়তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগের চিত্র উঠে এসেছে একটি জাতীয় জনধারণা জরিপে। জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৫৪ শতাংশ মানুষই জানেন না— জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে বাস্তবে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ জরিপের ফলাফল তুলে ধরেন আইআইডির নির্বাহী প্রধান সাইদ আহমেদ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ইয়ুথ ফর পলিসির প্রধান সানজিদা রহমানসহ সংগঠনটির অন্যান্য সদস্যরা।
ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেটিকস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইআইডি) এবং তাদের যুব প্ল্যাটফর্ম ইয়ুথ ফর পলিসির পরিচালিত এ জরিপে দেখা গেছে, বিশেষ করে বয়স্ক, গ্রামীণ এবং কম শিক্ষিত ভোটারদের বড় অংশ গণভোট ও জুলাই সনদ সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে কম অবহিত। একই সঙ্গে নির্বাচন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা এবং ফলাফল গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও এসব গোষ্ঠীর মধ্যে উদ্বেগের মাত্রা বেশি।
২০২৬ সালের ৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারি দেশের আট বিভাগে স্তরভিত্তিক কভারেজ পরিকল্পনার আওতায় ৯ হাজার ৮৯২ জন যোগ্য ভোটারের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। জরিপটি দল-নিরপেক্ষ বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা। এর লক্ষ্য ছিল— ভোটাররা সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত তথ্য পাচ্ছেন কি না, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নিজেকে অন্তর্ভুক্ত ও নিরাপদ মনে করছেন কি না এবং পুরো প্রক্রিয়ার ন্যায্যতা নিয়ে তাদের আস্থা কতটা— তা বোঝা।
এক ‘হ্যাঁ–না’ ভোটে বহু সংস্কার, বিভ্রান্তির আশঙ্কা
গণভোটের ব্যালটে ভোটারদের একটি মাত্র বাক্সে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ চিহ্ন দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্নটিতে একাধিক সংস্কার প্রস্তাব একসঙ্গে যুক্ত থাকায় ভোটার বিভ্রান্তির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে জরিপে উঠে এসেছে। বাস্তবে একটি মাত্র ভোটের মাধ্যমে একাধিক প্রতিশ্রুতি ও কাঠামোগত পরিবর্তনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত চাওয়া হচ্ছে, অথচ সংশ্লিষ্ট দলিল ও প্রস্তাবের সঙ্গে বহু ভোটারের পরিচিতি সীমিত।
জরিপ বলছে, ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দিলে বাস্তবে কী পরিণতি হবে— সে বিষয়ে আত্মবিশ্বাস কম অনেকেরই।
জুলাই সনদ সম্পর্কে জানেন মাত্র ৩৭ শতাংশ
জাতীয়ভাবে মাত্র ৩৭.২ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তারা জুলাই সনদের বিষয়বস্তু জানেন। তবে বয়স, এলাকা ও শিক্ষার ভিত্তিতে এখানে বড় বৈষম্য স্পষ্ট।
৩৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে জানেন এমন ভোটারের হার ২৩.২ শতাংশ, যেখানে ১৮–৩৫ বছর বয়সীদের মধ্যে তা ৪৫.৭ শতাংশ।
গ্রামাঞ্চলে জানেন ৩২.৪ শতাংশ, নগর এলাকায় এ হার ৪১.৪ শতাংশ।
যাদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, তাদের মধ্যে মাত্র ৮.৪ শতাংশ বলেছেন, তারা সনদের বিষয়বস্তু জানেন। নির্দিষ্ট সংস্কার বিষয়েও একই ধরনের ঘাটতি দেখা গেছে। মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত প্রস্তাব সম্পর্কে জানেন বলে জানিয়েছেন ৪৩.১ শতাংশ; বিপরীতে ৫৫.৩ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা জানেন না বা নিশ্চিত নন।
ব্যালট বোঝার সক্ষমতায়ও পিছিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী
জাতীয়ভাবে ৭২.৪ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, তারা গণভোটের ব্যালটের লেখা সহজে পড়তে ও বুঝতে পারেন। তবে ৩৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে এ হার কমে আসে ৫৭.৪ শতাংশে এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই এমন ভোটারদের মধ্যে তা নেমে আসে মাত্র ২৬.৬ শতাংশে।
অনেকে আবার জানিয়েছেন, ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ জিতলে কী হবে— সে বিষয়টিও তাদের কাছে পরিষ্কার নয়।
‘হ্যাঁ’ জিতলে কী হবে— এ বিষয়ে জাতীয়ভাবে ২৯.৬ শতাংশের স্পষ্ট ধারণা নেই; প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই এমন ভোটারদের মধ্যে এ হার ৬২.২ শতাংশ।
‘না’ জিতলে কী হবে— তা জানেন না জাতীয়ভাবে ৩৩.৬ শতাংশ, আর একই গোষ্ঠীতে তা ৬৭.৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
দলীয় অবস্থান সম্পর্কেও অনিশ্চয়তা
নিজেদের পছন্দের রাজনৈতিক দল জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে কি না— এ প্রশ্নে মাত্র ৪৩ শতাংশ উত্তরদাতা ‘হ্যাঁ’ বলেছেন। ৩৭.৪ শতাংশ বলেছেন ‘জানি না’ এবং ১২.৫ শতাংশ উত্তর দিতে চাননি।
এ অনিশ্চয়তা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে বয়স্ক, গ্রামীণ এবং কম শিক্ষিত ভোটারদের মধ্যে।
নির্বাচন ঘিরে উদ্বেগ ও আস্থার সংকট
জরিপে অংশ নেওয়া ৫৫ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, নির্বাচনের দিনে সমস্যা বা নিরাপত্তাহীনতা ভোটার উপস্থিতিকে ব্যাহত করতে পারে।
ফলাফল গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও অনিশ্চয়তা স্পষ্ট— মাত্র ৫১ শতাংশ মনে করেন, পরাজিত পক্ষগুলো নির্বাচন ফলাফল মেনে নেবে। ৩৫.৮ শতাংশ এ বিষয়ে অনিশ্চিত বা উত্তর দিতে অনিচ্ছুক।
সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়েও জনধারণায় দ্বিধা রয়েছে। ৪৭.৯ শতাংশ সরকারকে নিরপেক্ষ মনে করলেও ৩৩.৭ শতাংশ জানেন না সরকার নিরপেক্ষ কি না।
তবু ভোটে অংশগ্রহণের প্রত্যাশা জোরালো
উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও ৮৬.৪ শতাংশ উত্তরদাতা আশা করছেন, তারা নিরাপদে ভোট দিতে পারবেন।
এছাড়া ৮২.৫ শতাংশ মনে করেন, তাদের এলাকায় ধর্মীয় বা জাতিগত সংখ্যালঘুরাও ভয় ছাড়াই ভোট দিতে পারবেন।
বিশেষজ্ঞ পর্যবেক্ষণ
জরিপের ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে, পর্যাপ্ত জনসম্পৃক্ততা ও সহজ ভাষায় তথ্যপ্রচারের অভাবে সংস্কার অ্যাজেন্ডা প্রত্যাশিত গণতান্ত্রিক বৈধতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এক প্রশ্নে একাধিক সংস্কার যুক্ত করা নির্বাচন-পরবর্তী ব্যাখ্যাগত দ্বন্দ্বও উসকে দিতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে ন্যূনতম মানদণ্ড হিসেবে অন্তর্ভুক্তি, নিরাপত্তা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং ফলাফল-পরবর্তী অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন বলে মত জরিপ সংশ্লিষ্টদের।
এমএএস/এমবি

