দীর্ঘ দুই দশক পর নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৭টি আসনের মধ্যে ২০৯টিতে জয় পেয়ে এককভাবেই সরকার গঠনের সাংবিধানিক শর্ত পূরণ করেছে দলটি।
একই সঙ্গে সংসদে শক্তিশালী বিরোধী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, যারা পেয়েছে ৬৮টি আসন; আর জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পেয়েছে ছয়টি আসন।
আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনের ফল গেজেট আকারে প্রকাশ স্থগিত রয়েছে এবং শেরপুর-৩ আসনে এক প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ভোট পরে অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশনের হিসাবে ২৯৯ আসনে ভোটগ্রহণ হয়েছে গড়ে প্রায় ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ। এই নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে অনুষ্ঠিত গণভোটে বিপুল ব্যবধানে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয়েছে, যার ফলে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এ অন্তর্ভুক্ত সংবিধান সংস্কারের ৪৮ দফা বাস্তবায়নের পথ উন্মুক্ত হলো।
এদিকে অনেকদিনের ভঙ্গুর নির্বাচনী কাঠামো বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে নতুন রূপ পায়। এতে করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা জনতার রায়ে গণতন্ত্র ও দেশকে নতুন পথে দেখছে।
আওয়ামী লীগবিহীন এ নির্বাচনে ১৯ বছর পর দেশে ফিরে দলীয় নেতৃত্বে সক্রিয় হন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান; তার নেতৃত্বেই দলটি চতুর্থবারের মতো সরকার গঠনের পথে। দীর্ঘদিন দেশের রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে; সেই অধ্যায়ের অবসানের পর নতুন মেরুকরণে এই নির্বাচন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দেশীয়-আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমও ফলাফলকে ‘ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন’ ও ‘নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
সব ঠিক থাকলে দেশ নবম পুরুষ প্রধানমন্ত্রী পাচ্ছে। আর ৩৫ বছর পর পুরুষ প্রধানমন্ত্রী পাচ্ছে বাংলাদেশ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ এবং ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার হাল ধরবেন তারেক রহমান।
নিয়ম অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর নির্বাচন কমিশন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার গেজেট জারি করা হবে। এরপর নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নেবেন। এর মাধ্যমে সংসদ গঠিত হয়। এরপর সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বা জোট সংসদ নেতা নির্বাচন করার পর তিনি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় রাষ্ট্রপতি তাকে সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান।
এদিকে বিএনপি ও তারেক রহমানকে বিশ্ব নেতারা অভিনন্দন জানাচ্ছেন। অনেক দেশ নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহও প্রকাশ করেছে।
নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরছে বিএনপি: একটি অভ্যুত্থানের পর গণতান্ত্রিক পথযাত্রায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি।
আওয়ামী লীগহীন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ী হয়ে দীর্ঘ দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরছে দলটি।
বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি ২০৯, জামায়াতে ইসলামী ৬৮ ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ছয় আসনে জয়ী হয়েছে।
শুক্রবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের সচিব আখতার আহমেদ।
সচিব বলেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একটি, খেলাফত মজলিস একটি, গণঅধিকার পরিষদ একটি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) একটি, গণসংহতি আন্দোলন একটি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুটি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সাত আসনে জয় পেয়েছেন।
আখতার আহমেদ জানান, ভোট হলেও আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনের ফলাফল নিয়ে গেজেট এখন হবে না। এছাড়া, একজন প্রার্থী মারা যাওয়ার কারণে শেরপুর-৩ আসনে ভোট পরে অনুষ্ঠিত হবে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে এদিন সংস্কার প্রশ্নে গণভোটও হয়। আর তাতে অনুমিতভাবেই ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে।
এই ফলের অর্থ হলো, জুলাই সনদের অন্তর্ভুক্ত সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত ৪৮ দফা বাস্তবায়নের সম্মতি দিয়েছেন দেশের নাগরিকরা। অবশ্য গণভোটের প্রক্রিয়া ও প্রশ্নের গঠন নিয়ে সমালোচনা রয়েছে; নাগরিকরা ভোট দিয়েছেন না বুঝেই।
তারেকের নেতৃত্বে প্রত্যাবর্তন: ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া বিএনপি ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে তিনবার সরকারগঠন করেছিল তার স্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। আর এবার তাদেরই সন্তান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি চতুর্থবারের মতো দেশ শাসনের ভার নিতে যাচ্ছে।
সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সরকারের পতনের পর বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে একানব্বইয়ের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় ফিরেছিল বিএনপি। তার পরের তিন নির্বাচনে দুই বার সরকার গঠন করলেও মেয়াদ শেষ করতে পেরেছিল একবার। ২০০৮ সালের নির্বাচনে হেরে দলটি চলে গিয়েছিল শাসন ক্ষমতার বাইরে।
আওয়ামী লীগ আমলে তিনটি নির্বাচনের দুটি বর্জন করেছিল বিএনপি, একটিতে হয়েছিল ভরাডুবি। এরপর চব্বিশের অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নতুন বাস্তবতায় বিএনপির সামনে সরকারে ফেরার পথ তৈরি হয়।
১৯ বছর পর বিএনপি যখন সরকারে ফিরছে, তখন নতুন মেরুকরণে বিরোধীর আসনে নেই তাদের ৩৫ বছরের প্রধান প্রতিদ্ব›দ্বী আওয়ামী লীগ। অন্তর্বর্তী সরকারের নিষেধাজ্ঞা আর নিবন্ধন স্থগিত থাকায় সবচেয়ে বেশি সময় বাংলাদেশ শাসন করা আওয়ামী লীগের এবার ভোট করার সুযোগ ছিল না।
বাংলাদেশের যে কোনো নির্বাচন সর্বোচ্চ ১৮ আসন পাওয়া জামায়াতে ইসলামী সেই সুযোগে এবার বিএনপির সঙ্গে প্রতিদ্ব›িদ্বতা গড়েছে বেশ।
মায়ের ব্যাটন হাতে তুলে নেওয়ার ধারাবাহিকতায় তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হলে বাংলাদেশের ক্ষমতা কেন্দ্রে প্রায় তিন যুগের চেনা চেহারা বদলে যাবে।
এই সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে তার মা, বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে ঘিরে। প্রায় দেড় দশক টানা দেশ শাসন করা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এখন ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। আর আরেক সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া চিরবিদায় নিয়েছেন।
খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা দুজনে একটা সময়ে পর্যায়ক্রমে সরকার প্রধান হয়ে দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। একজন যখন সরকার প্রধান হয়েছেন, অন্যজন তখন থেকেছেন বিরোধীদলীয় নেতার ভূমিকায় রাজপথে।
এক সময় তাদের বৈরী সম্পর্ককে বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলো ‘দুই বেগমের যুদ্ধ’ হিসেবেও চিত্রিত করেছে।
২০০৪ সালে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার জন্য তখনকার বিএনপি সরকারকে দায়ী করে আওয়ামী লীগ। আবার আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে খালেদা জিয়াকে দুর্নীতি মামলার সাজা নিয়ে কারাগারে যেতে হয়েছিল। পরে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পেলেও অসুস্থতার কারণে তাকে একপ্রকার ঘরবন্দি জীবন কাটাতে হয়।
চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর খালেদা জিয়া পুরোপুরি মুক্ত হন, আদালতের রায়ে মুক্তি পান সাজা থেকেও।
গুরুতর অসুস্থতা নিয়ে ৩০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়া যখন চিরবিদায় নেন, তার কয়েক সপ্তাহ আগে ঘোষিত হয়েছিল ত্রয়োদশ নির্বাচনের তফসিল।
লন্ডনে ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে বিপুল সংবর্ধনায় দেশে ফিরে নির্বাচনী যাত্রায় নেমেছিলেন তারেক রহমান, যিনি মায়ের মৃত্যুর পর দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন।
দেশ গঠনের ‘পরিকল্পনা’ নিয়ে দেশে আসার কথা তুলে ধরে তিনি বলেছিলেন, এক্ষেত্রে দেশবাসীর সমর্থন তিনি চান।
তার দেশে ফেরার পাঁচ দিনের মাথায় মারা যান তার মা, খালেদা জিয়া; নির্বাচনী আমেজের মধ্যে তার এই বিদায়ে নির্বাচনে দলের নেতৃত্ব দেন তারেক।
ভোটের লড়াইয়ে এগিয়ে যেতে আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের শরিক কয়েকটি দলের সঙ্গে আসন সমঝোতা করে বিএনপি। তাদের জন্য আটটি আসন ছেড়ে দেয়।
২২ জানুয়ারি সিলেটের আলিয়া মাদ্রাসা থেকে নির্বাচনী প্রচার শুরু করে সারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় জনসভা করেন বিএনপি চেয়ারম্যান। ভোটের প্রচারে জামায়াতে ইসলামীকে নিশানা করে তীব্র আক্রমণ শানান তিনি। ‘মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী ও ধর্মের নামে রাজনীতি করা’ দলকে ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানান।
তারেক রহমানের প্রধান প্রতিদ্ব›দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠার কথা বলে এতদিন রাজনীতি করে আসা জামায়াতকে তিনি ভোটের প্রচারে নতুন রূপে দেখানোর চেষ্টা করেন।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতাদের একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদ বীর বিক্রমের দল এলডিপির পাশাপাশি জুলাই অভ্যুত্থানে সামনের সারিতে থাকা তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিকে সঙ্গী হিসেবে পাশে টেনে নেয় জামায়াত। প্রার্থী করা হয় একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বীকেও।
২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারে ঠাঁই পেয়েছিলেন জামায়াতে ইসলামীর দুই নেতা। তবে নিজেদের সক্ষমতায় সরকার গঠন তো দূরে থাকা, প্রধান বিরোধী দলের আসনেও বসার সুযোগ তাদের হয়নি। চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর বদলে যাওয়া বাংলাদেশে এবার তারা সে সুযোগ পেতে যাচ্ছে।
কেমন হল ভোট: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দেড় বছর পর ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে এদিন গণভোট হয়। মোটাদাগে শান্তিপূর্ণভাবেই দিনভর ভোটগ্রহণ চলে।
বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটলেও কোথাও বড় ধরনের কোনো গোলযোগের খবর পাওয়া যয়নি। কোনো কেন্দ্র বাতিল বা স্থগিতও করতে হয়নি।
ভোট চলাকালে সাত জেলায় সাতজনের জনের মৃত্যু হয়। তবে তাদের ছয়জনই মারা যান হঠাৎ অসুস্থ হয়ে। আরেকজনকে ধাক্কা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট তিনটি আসনের কয়েকটি কেন্দ্রে ‘ভোটগ্রহণে বিশৃঙ্খলার’ অভিযোগ তোলে। এনসিপি বলে, দুপুর ১২টা পর্যন্ত ভোটগহণ ‘সন্তোষজনক’ হলেও তারপর থেকেই সারা দেশ থেকে তারা বিভিন্ন অভিযোগ পেয়েছে। ভোটের সময় বিভিন্ন স্থানে অনিয়মের অভিযোগ সামনে এনেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন বলেছে, আশঙ্কাজনক কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি, কোনো কেন্দ্র ভোট স্থগিতও হয়নি। উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটে অংশগ্রহণ করায়, দেশবাসীকে ধন্যবাদও দিয়েছে তারা। ২০ বছর পর চতুর্থবার সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি, প্রথমবার বিরোধী দলে জামায়াত: সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে দীর্ঘ ২০ বছর পর চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি।
বাংলাদেশে সরকার গঠনের জন্য ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে অন্তত ১৫১টি আসনে জয় প্রয়োজন হয়। সে হিসেবে বিএনপি এককভাবেই সরকার গঠনের সাংবিধানিক শর্ত পূরণ করেছে।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ উভয় আসনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। এবারই তিনি প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন। অন্যদিকে, ঢাকা-১৫ আসনে জয় পেয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
বিএনপির পক্ষ থেকে আগেই ঘোষণা করা হয়েছিল, দল সরকার গঠন করলে তারেক রহমানই হবেন দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী।
বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, এবারই প্রথমবারের মতো সংসদে প্রধান বিরোধী দল হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট।
৩৫ বছর পর পুরুষ প্রধানমন্ত্রী পাচ্ছে বাংলাদেশ: তারেক রহমান সরকারের নেতৃত্ব দেবেন বলে বিএনপি সূত্রে জানা গেছে। এতে করে প্রায় ৩৫ বছর পর আবারও একজন পুরুষ প্রধানমন্ত্রী পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
ইতিহাস বলছে, সর্বশেষ ১৯৮৮ সালে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন কাজী জাফর আহমেদ। ১৯৯০ সালের পর থেকে দেশে আর কোনো পুরুষ প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেননি। দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
দলীয় সূত্র জানা গেছে, আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় থেকেই তারেক রহমান রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৮৮ সালে বগুড়ার গাবতলী উপজেলা বিএনপির সদস্য হিসেবে তার আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক যাত্রা শুরু। ১৯৯৩ সালে বগুড়ায় গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচনের সংস্কৃতি চালু করে তৃণমূল রাজনীতিতে আলোড়ন সৃষ্টি করেন।
২০০২ সালে তিনি দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং ২০০৯ সালে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারান্তরীণ হওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।
এদিকে বিজয় উদযাপন ঘিরে কোনো ধরনের মিছিল না করার নির্দেশনা দিয়েছে বিএনপি। দলের প্রেস উইং জানিয়েছে, ‘নিরঙ্কুশ বিজয় উপলক্ষে বাদজুমা সারা দেশে শুকরিয়া আদায় করে বিশেষ দোয়া করা হবে। অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়েও প্রার্থনার আয়োজন করা হবে।’
২৯৭ আসনের ফল; বিএনপি ২০৯, জামায়াত ৬৮, এনসিপি ৬: সংসদ নির্বাচনে বৃহস্পতিবার ২৯৯ আসনে ভোট হলেও এখন পর্যন্ত ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে ২৯৭টির। এর মধ্যে বিএনপি ২০৯, জামায়াতে ইসলামী ৬৮ ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ছয় আসনে জয়ী হয়েছে।
শুক্রবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের সচিব আখতার আহমেদ।
সচিব বলেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একটি, খেলাফত মজলিস একটি, গণঅধিকার পরিষদ একটি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) একটি, গণসংহতি আন্দোলন একটি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুটি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সাত আসনে জয় পেয়েছেন।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয় : শুক্রবার নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায়, বিপুল ব্যবধানে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়যুক্ত হয়েছে। এর ফলে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর আওতায় সংবিধানের ৪৮টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের পথ চূড়ান্তভাবে উন্মোচিত হলো।
একনজরে গণভোটের ফলাফল- মোট ভোটার : ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি। ভোট প্রদানের হার : ৬০.২৬ শতাংশ। ‘হ্যাঁ’ ভোট : ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯টি। ‘না’ ভোট : ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭টি।
কী কী পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে- গণভোটে জনগণের এই সম্মতির ফলে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় বেশকিছু বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। সেগুলো হলো-
১. ক্ষমতার ভারসাম্য: এতদিন বলা হতো, ‘বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা আসমানের সমান।’ এখন আর তা থাকছে না। নতুন সংস্কারে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কিছুটা কমিয়ে রাষ্ট্রপতির হাতে ভারসাম্য দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ, এখন থেকে আর একজন ব্যক্তি চাইলেই যা খুশি তা করতে পারবেন না; তাকে জবাবদিহিতার আওতায় আসতে হবে।
২. দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ: আমাদের সংসদ এখন থেকে দোতলা বাড়ির মতো হবে! নিচে থাকবে ‘নিম্নকক্ষ’, যারা আমাদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। ওপরে থাকবে ‘উচ্চকক্ষ’। উচ্চকক্ষ দেশের নামকরা বুদ্ধিজীবী, বিজ্ঞানী, শিল্পী এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত হবে। ফলে যেকোনো আইন পাস হওয়ার আগে দুবার যাচাই করা হবে, যাতে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত জনগণের ওপর চেপে না বসে।
৩. স্বৈরতন্ত্রের কবর; ‘৭০ অনুচ্ছেদ’ সংশোধন: সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে আগে কোনো এমপি তার দলের সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিতে পারতেন না। এতে সংসদ হয়ে পড়েছিল দলের হাতের পুতুল। এখন এই আইন শিথিল হচ্ছে। ফলে আপনার এলাকার এমপি সংসদে দলের কথা নয়, বরং আপনার (জনগণের) চাহিদার কথা মাথায় রেখে স্বাধীনভাবে কথা বলতে ও ভোট দিতে পারবেন।
৪. সাংবিধানিক পদে নিয়োগে স্বচ্ছতা: কমবে ‘আমলানির্ভরতা’: নির্বাচন কমিশন বা দুদকের মতো বড় বড় পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে আর সরকারের পছন্দের লোক বসানো সহজ হবে না। একটি নিরপেক্ষ সার্চ কমিটি বা সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে দেশের সবচেয়ে যোগ্য ও সৎ ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে এসব পদে নিয়োগ দেওয়া হবে।
৫. মৌলিক অধিকার এখন আরও শক্তিশালী: বাকস্বাধীনতা, ইন্টারনেটে মানুষের অধিকার এবং সভা-সমাবেশ করার অধিকারগুলো এখন সংবিধানে আরও দৃঢ়ভাবে সুরক্ষিত হবে। কোনো সরকারই হুট করে আইন করে মানুষের মুখ চেপে ধরতে পারবে না। সংবিধানের বিতর্কিত ৭০ অনুচ্ছেদের ছায়া থেকে বেরিয়ে সংসদ সদস্যরা সংসদে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে আগের চেয়ে বেশি স্বাধীনতা ভোগ করবেন।
নির্বাচন ও গণভোটে ভোট পড়েছে ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ: সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ২৯৯ আসনে ভোট পড়েছে ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
গতকাল শুক্রবার নির্বাচন কমিশনের (ইসি) জনসংযোগ শাখার পরিচালক মো. রুহুল আমিন মল্লিক এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ২৯৯টি আসনে গড়ে ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভোট পড়েছে। সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তাদের পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে এ ভোটের হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর আগে, বেলা ১১টার দিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণা আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
জাতি হিসেবে আমরা চূড়ান্তভাবে বিজয়ী হয়েছি-ইসি সানাউল্লাহ: জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঈদ উৎসবের মতো জনগণ অংশগ্রহণ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। তিনি বলেছেন, ‘আমরা জাতি হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিজয়ী হয়েছি।’
শুক্রবার বেলা পৌনে ১১টার দিকে রাজধানীর আগারগাঁও নির্বাচন ভবনে ভোটের প্রাথমিক বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা শেষে সমাপনী বক্তব্যে নির্বাচন কমিশনার এ কথা বলেন।
নির্বাচন কমিশনার মো. সানাউল্লাহ বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে সত্যিই একটি শুভ সকাল আজ, ১৩ ফেব্রুয়ারি। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস আমাদের গণতান্ত্রিক নবযাত্রায় সকালটা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। যে যার অবস্থান থেকে ভূমিকা রেখেছেন, সবার প্রতি নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও সব কমিশনারের পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’
ফলাফল নিয়ে যা বলছে বৈশ্বিক গণমাধ্যম: ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি তাদের এক প্রতিবেদনের শিরোনামে বলেছে, ‘তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি বাংলাদেশে বিশাল জয়ের দিকে এগিয়ে, স্বীকার করল জামায়াত’।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় অর্জনের মাধ্যমে ঢাকায় ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের পথে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পার্টি (বিএনপি)।
ভারতীয় বার্তাসংস্থা এএনআই তাদের প্রতিবেদনের শিরোনামে বলেছে, ‘বাংলাদেশের নির্বাচন : ভোট গণনা চলছে, জনমত তারেক রহমানের নেতৃত্বের পক্ষে’।
ভারতের জাতীয় দৈনিক দ্য হিন্দু তাদের শিরোনামে বলেছে, ২০ বছর পর বিএনপিকে জয়ের পথে নেৃতত্ব দিলেন তারেক রহমান।’
পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় সংবাদ চ্যানেল জিও নিউজ তাদের প্রতিবেদনের শিরোনামে লিখেছে, ‘বাংলাদেশের ঐতিহাসিক নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জিতল বিএনপি।’ আরেক প্রতিবেদনের শিরোনামে বলা হয়েছে, ‘বিএনপির বিজয়ের পর (নতুন সরকারের অধীনে) বাংলাদেশের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায় পাকিস্তান।’
পাকিস্তানের জাতীয় দৈনিক ডন তাদের প্রতিবেদনের শিরোনামে লিখেছে, ‘নির্বাচনে বড় বিজয় পেল বিএনপি, স্থিতিশীলতা রক্ষর প্রতিশ্রুতি’।
ত্রয়োদশ নির্বাচনে বিএনপির বিজয়কে তাদের ওয়েবসাইটে প্রধান সংবাদ (লিড নিউজ) করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি। সেই প্রতিবেদনের শিরোনামে বলা হয়েছে, ‘জেন-জি উত্থানের পর প্রথম নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় পেলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পার্টি।’
বাংলাদেশের নির্বাচনের ফলাফলকে নিজেদের লিড নিউজ করেছে ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্সও। সেই প্রতিবেদনের শিরোনামে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের নির্বাচনে বিএনপির জয়, প্রাক্তন শাসকদের পুত্র প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন।’
যুক্তরাজ্যের জাতীয় দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানও নিজেদের ওয়েবসাইটে বাংলাদেশের নির্বাচনের ফলাফলকে প্রধান সংবাদ করেছে। সেই সংবাদের শিরোনামে বলা হয়েছে, ‘হাসিনাকে ছুড়ে ফেলার পর প্রথম নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয় পেলো বিএনপি।’
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন তাদের প্রতিবেদনের শিরোনামে বলেছে, ‘জেন-জি উত্থানের পর প্রথম নির্বাচনে বড় জয় পেলো বিএনপি।’
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা তাদের প্রতিবেদনের শিরোনামে বলেছে, ‘নির্বাচনে বিজয় দাবি করছে বিএনপি, জামায়াত ভোট গণনায় সন্তুষ্ট নয়।’
বিকেপি/এমবি

