Logo

মতামত

দেশে স্মার্ট সম্পাদক নেই

নিয়ন মতিয়ুল

নিয়ন মতিয়ুল

প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫:৪৬

দেশে স্মার্ট সম্পাদক নেই

প্রতীকী ছবি (এআই দিয়ে তৈরি)

পুরোনো কাঠামোয় অভ্যস্ত সম্পাদকেরা তরুণদের ‘নাবালক’ বা ‘অপরিণত’ ভাবেন। সেখানে স্মার্ট সম্পাদকেরা তাদের দেখেন আগামীর ‘রিডার-কন্ট্রিবিউটর’ হিসেবে। প্রথাগতরা রিপোর্টারকে স্টাফ আর নিউজরুমকে ‘প্রোডাকশন হাউজ’ ভাবেন। বিপরীতে স্মার্টরা তাদের ‘রিসার্চার+রিপোর্টার’, নিউজরুমকে ‘নলেজ ল্যাব’ হিসেবে দেখেন। পুরোনো ধারার সম্পাদকেরা যেখানে নিউজ সেন্সর করেন, স্মার্টরা সেখানে বিকল্প কৌশল প্রয়োগ করেন। নিজের প্ল্যানে অনড় আর বাস্তবায়নে ডিক্টেটর হয়ে ওঠেন প্রথাগতরা। আর স্মার্টরা বলেন, ‘আমার প্ল্যান আছে। তবে তোমাদেরটা শুনতে চাই।’

দুই ধারার বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে বলা যায়, দেশে সত্যিই কোনো স্মার্ট সম্পাদক নেই, বিশেষত প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়। ডিজিটালে কেউ কেউ নিউজ আউটলেটকে মুনাফামুখী করে তোলায় ব্যাপক সফলতা দেখালেও অডিয়েন্সের শতভাগ আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছেন। তবে দেশে স্মার্ট হয়ে ওঠার যোগ্য সাংবাদিক যে নেই, তা কিন্তু নয়। মূলত, সম্ভাব্যরা হেরে যাচ্ছেন কাঠামোগত বাস্তবতার কাছে। ফলে ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না গোটা নিউজ ইন্ডাস্ট্রি।

দেশে অপার সম্ভাবনাময় বিগ বাজেটের বড় বড় পত্রিকা এসে কয়েক মাস চমক দেখিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে। সাময়িকভাবে বেকার পরিণত হন শত শত সাংবাদিক। জীবিকা আর পরিচয়ের তাগিদে প্রথাগত সম্পাদকেরা মরিয়া হয়ে নতুন বিনিয়োগকারী খুঁজে বের করেন। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পুরোনো সহকর্মীদের জড়ো করে যথারীতি নতুন প্রকল্পের অনিশ্চিত যাত্রা শুরু করেন। দু-একটি পত্রিকা বিজনেস মডেলে বড় দৃষ্টান্ত দেখালেও সেগুলোর সম্পাদকেরা প্রথাগত ব্যবস্থাপনা কাঠামো ও রাজনৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছেন অনেক সময়। ফলে একুশ শতকের শুরু থেকে এখন অবধি স্মার্ট সম্পাদকের আবির্ভাব দেখা যাচ্ছে না।

কেন?
প্রশ্ন হচ্ছে, স্মার্ট সম্পাদক নেই কেন, তৈরি হতে বাধা কোথায়? এসব প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে ইতিহাসে। আশি-নব্বইয়ের দশকে দেশে শুরু হওয়া দৈনিক পত্রিকার বিপ্লবে সহযাত্রী ছিলেন তখনকার রাজপথ ও ক্যাম্পাসভিত্তিক রাজনীতির আদর্শবাদী তরুণদের বড় অংশ। যারা বিগত আড়াই দশক ধরে রাজনৈতিক ন্যারেটিভ উৎপাদন করে করে স্টার সাংবাদিককে পরিণত হয়েছেন। আর তাদের হাতেই লেখা হয়েছে ক্ষমতাশ্রয়ী, দলদাস সাংবাদিকতার ইতিহাস। জুলাই বিপ্লবের পর যাদের বেশির ভাগ পর্দার অন্তরালে চলে গেলেও সংবাদমাধ্যমের ‘রূপান্তরবিমুখ রাজনৈতিক বয়ান নির্মাণের কাঠামো’ এখন উল্টো অভিমুখে বহাল তবিয়তে। নানা কারণে সেই অনড় কাঠামো ভাঙতে না পারায় সম্পাদকেরা স্মার্ট হয়ে উঠতে পারছেন না। সম্পাদকদের সেই অপারগতার পেছনে কাজ করছে মোটামুটি ৫টি কারণ :

১. তথ্যপ্রযুক্তির হাত ধরে বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকতার যে ডিজিটাল ফরম্যাট গড়ে উঠেছে, তার প্রকৃত কাঠামো অনুধাবনে পিছিয়ে আছেন প্রথাগত সম্পাদকেরা। ফলে সংবাদমাধ্যমের আধুনিক রূপান্তরমুখী কাঠামো তৈরিতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

২. ঔপনিবেশিক কাঠামোয় আবদ্ধ মস্তিষ্ক তাদের ষাট-সত্তর দশকের রাজনীতি আর ব্যবস্থাপনার ফ্রেমে আটকে ফেলেছে। অনেক সময় দেশ-জনগণের চেয়েও দল বা দলের আদর্শই তাদের বেশি নিয়ন্ত্রণ করে।

৩. মানচিত্রহীন গ্লোবাল কাঠামোয় বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে ব্যর্থ হচ্ছেন প্রথাগতরা। ফলে তাদের অডিয়েন্স হিসেবে টার্গেট করে ‘নলেজ আর্কাইভ’ মডেলের নিউজ কোম্পানি বা আউটলেট গড়ে তোলা তাদের জন্য কঠিন।

৪. নতুন প্রজন্মের রূপান্তরকামী তরুণ বা ডিজিটাল ট্যালেন্টকে প্রথাগতরা সুযোগ দিতে ভয় পান। ফলে নিউ মডেল, নিউ আইডিয়া, ডিজিটাল ল্যাঙ্গুয়েজ থেকে বঞ্চিত হন।

৫. দীর্ঘমেয়াদি ভিশন-মিশন ছাড়াই, করপোরেট মালিকদের সঙ্গে বার্গেনিং ইস্যুতে কোনো স্পেস না রেখেই ক্ষণিকের চমক দেখানোর পরিকল্পনা করেন প্রথাগত সম্পাদকেরা। ফলে তাদের সম্পাদকীয় স্বাধীনতা সীমিত হয়ে পড়ায় স্মার্ট হওয়ার সুযোগ কমে যায়।

অথচ স্মার্ট সম্পাদকের হাত ধরেই নিউজরুম স্মার্ট হয়ে উঠতে পারে। স্মার্ট নিউজরুম সংবাদকর্মীদের মনোজগতে সাড়া ফেলে বৈশ্বিক মানের হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। ফলে তারা গণমানুষের আস্থা অর্জন করে নতুন প্রজন্মের মধ্যে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে স্বপ্ন গুঁজে দিতে সক্ষম হন। যা সরকার বা রাষ্ট্রে সুশাসন আর গণতন্ত্র নিশ্চিত করে, বৈষম্যহীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক, সহনশীল, উন্নত সমাজের দিকে তাড়িত করতে সক্ষম হবে। এতে সাবস্ক্রিপশন বা পেইড মডেলের স্ব-নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমের বিপ্লব ঘটতে পারে।

১০ জানুয়ারি, ২০২৫; সার্কুলার রোড, ঢাকা

নিয়ন মতিয়ুল : লেখক, গণমাধ্যম বিশ্লেষক ও সাংবাদিক

এমএইচএস

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

গণমাধ্যম

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর