Logo

মতামত

ভেনেজুয়েলা ইস্যু অস্ত্র ব্যবসায় গতি আনবে

Icon

আলোক আচার্য

প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:০৪

ভেনেজুয়েলা ইস্যু অস্ত্র ব্যবসায় গতি আনবে

ভেনেজুয়েলার ঘটনা পৃথিবীবাসীকে অবাক করে দিলেও একটি সত্য এখান থেকে বেরিয়ে এসেছে। বর্তমান সভ্যতার নির্ণায়ক প্রযুক্তি এবং অস্ত্র এই দুইয়ের সমন্বয় অবশ্যই থাকতে হবে। ভেনেজুয়েলার সামরিক শক্তি একেবারেই কম নয়। কিন্তু প্রযুক্তিগত দুর্বলতা যে কতটা সেটা মাদুরোকে মুহূর্তের মধ্যে গ্রেফতার করে নিজের দেশে বিচারের মুখোমুখি করার ঘটনায়। বলা হতো, নিকোলাস মাদুরোর নিরাপত্তা বেশ শক্তিশালী। তাতে কী হলো? যুক্তরাষ্ট্র ঠিক মাদুরোকে শক্তি প্রয়োগ করে আটক করে নিজের দেশে নিয়ে গেলো। বিশ্বের কিছু দেশ সমালোচনা ছাড়া কিছুই করতে পারলো না। আদতে সেটা সম্ভবও নয়। যদিও এটা .মতা প্রয়োগের বাজে নজির, কিন্তু হয়েছে। এখন ভবিষ্যতে যদি অন্য কোনো পরাশক্তি কোনো কারণ দেখিয়ে সেই দেশের থেকে শক্তিমত্তায় দুর্বল কোনো দেশের একই পরিণতি করতে চায় তখনও কেউ এগিয়ে আসবে না এটাই বাস্তবতা।

প্রযুক্তি এবং সামরিক সামর্থ্যরে কাছে বর্তমান বিশ্ব বেশ অসহায়। মানুষ যুদ্ধ চায় না, এটা আসলে বাস্তবতা না। প্রকৃতপক্ষে মানুষ যুদ্ধ চায় কারণ মানুষ ক্ষমতালোভী এবং অর্থলোভী। অর্থের সাথে ক্ষমতার ঘনিষ্ট সম্পর্ক। এই যে গত বছর কয়েকটি দেশের মধ্যে যুদ্ধে বিপুল অস্ত্রের প্রয়োগ ঘটলো এখানে দুই দেশের বিপুল অস্ত্র প্রয়োজন হয়েছে। সেই অস্ত্র আবার কিনতে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হবে। তারপর আবার যুদ্ধ! যুদ্ধ যদি নাও হয় তবু মানুষ সুরক্ষার তাগিদে অস্ত্র কেনাবেচা করবে। এর ফলে যে দেশ থেকে সেসব কিনবে সেসব দেশের অর্থনীতি ফুলে ফেঁপে উঠবে। এই অস্ত্র বেশি বিক্রি করে কারা? যুক্তরাষ্ট্রের মতো কিছু দেশের অর্থনীতিই মূলত দাঁড়িয়ে গেছে বৈশ্বিক অস্ত্র বাণিজ্যের উপর। এজন্যই বলা হয় বর্তমান পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় বাণিজ্য হলো অস্ত্র বাণিজ্য। যত যুদ্ধ তত অস্ত্র। যত অস্ত্র ক্ষয় হবে তত নতুন অস্ত্রের দরকার হবে। অস্ত্র বিক্রি করেই যদি অর্থনীতির পালে হাওয়া দেওয়া যায় তাহলে ক্ষতি কি! আর যে দেশগুলো অস্ত্র বিক্রি করছে সেসব দেশ তো মোড়ল দেশ। 

পৃথিবীর হর্তা-কর্তায় পরিণত হয়েছে। মানুষের হাতে প্রচুর অস্ত্র রয়েছে এবং সেসব অস্ত্র প্রয়োগ করাই মূল উদ্দেশ্য। যতই মানুষ বলুক যে নিজের নিরাপত্তার জন্যই অস্ত্র তৈরি আদতে নিজের ক্ষমতা জাহির করাই মূল উদ্দেশ্য। আবার নিরপত্তার বিষয়টিও একেবারে অস্বীকার করা যায় না। কারণ আধুনিক অস্ত্র না থাকলে অন্য দেশ খুব সহজেই প্রভূত্ব খাটাতে পারে। আর যে কোনো দেশকে যে কোনো সময়ই যুদ্ধে নামতে হতে পারে। আর যুদ্ধের গতি প্রকৃতি নির্ধারিত হয় কার অস্ত্র কত আধুনিক এবং রণকৌশল। আর অস্ত্র না থাকলে শুধু রণকৌশল দিয়ে লাভ কি! কেবল সাহস দিয়ে আজকাল কিছু হয় না। ফলে প্রতিটি দেশ নিজের দেশের অস্ত্র ভান্ডার সমৃদ্ধি করতে ব্যস্ত হয়ে পরেছে। অস্ত্র মানেই বিপুল ব্যবসা। কাড়ি কাড়ি টাকা। একদিকে ধ্বংস আবার অন্যদিকে ফুলে ফেঁপে ওঠা। আবার শক্তিমত্তার নির্ণায়কও এই অস্ত্র। এই বিশ্ব চলছে অস্ত্রের দাপটে।

ভেনেজুয়েলার ঘটনা বিশ্বের দেশগুলোর চোখ খুলে দিয়েছে। এখানে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে- এক. যতই শক্তিশালী বন্ধুরাষ্ট্র থাকুক বিপদের সময় সেই দেশকে পাশে নাও পাওয়া যেতে পারে এবং দুই. নিজের এবং দেশের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আরও অনেক বেশি উন্নত করতে হবে। এটা করতে হলে প্রতিরক্ষা খাতে প্রচুর বিনিয়োগ করতে হবে এবং সরঞ্জামের আধুনিকায়ন করতে হবে। ২০২৫ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে ১৪২ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা অঞ্চলটিতে এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের চুক্তি। চুক্তির আওতায় রয়েছে সি১৩০জে পরিবহন বিমান, প্রেটরিয়েট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, এমকিউ৯বি সি গার্ডিয়ান ড্রোন, এমরাম (এআইএম‑১২০সি৮) ক্ষেপণাস্ত্র, স্ট্রাইকার সাঁজোয়া যানবাহন ও উন্নত রাডার সিস্টেম। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ১.৬ ডলারের সামরিক চুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রি ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ২০২৩ সালে সর্বমোট ২৩  হাজার ৮০০ কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রি করেছে সামরিক খাতে নিজেও সর্বোচ্চ ব্যয় করা দেশটি। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত সোমবার জানায়, আট হাজার ১০০ কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রিতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছে। এই অস্ত্র বিক্রির মাত্রা  ২০২২ সালের তুলনায় ৫৬ শতাংশ বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে পাকিস্তান তাদের প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে। প্রকৃত ব্যয়যোগ্য বাকি ৩৩ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে নয় বিলিয়ন ডলারই রাখা হয়েছে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের জন্য।  বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলত ভারতের সঙ্গে ১৯ দিনের ভয়াবহ সংঘাত থেকে পাওয়া শিক্ষাই পাকিস্তানকে প্রতিরক্ষা খাতকে এমন গুরুত্ব দিতে বাধ্য করল।

গত ১ ডিসেম্বর প্রকাশিত তথ্যে স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপ্রি) জানিয়েছে, ২০২৪ সালে বিশ্বের শীর্ষ ১০০ অস্ত্র ও সামরিক সেবা উৎপাদনকারী কোম্পানির বিক্রি বেড়ে রেকর্ড ৬৭৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এ প্রতিবেদনে গাজা ও ইউক্রেন যুদ্ধ, বাড়তি সামরিক ব্যয় এবং বৈশ্বিক উত্তেজনা এ এ প্রবৃদ্ধির প্রধান কারণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানিগুলোর আয়ে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছে; শুধু ইউরোপেই ২৬টি কোম্পানির মোট আয় বেড়েছে ১৩ শতাংশ। অন্যদিকে চীনা প্রতিরক্ষা খাতের সমস্যার কারণে এশিয়ায় বিক্রি সামান্য কমেছে। প্রথমবারের মতো ধনকুবের ইলন মাস্কের স্পেসএক্স এ তালিকায় জায়গা পেয়েছে; তাদের সামরিক আয় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক দশমিক আট বিলিয়ন ডলারে। ইউক্রেন যুদ্ধ সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম উৎপাদনে ইউরোপের কোম্পানিগুলো দ্রুত সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। চেক রিপাবলিকের চেকোস্লেভাক গ্রুপ ইউক্রেনের জন্য গোলাবারুদ তৈরি করে আয় বাড়িয়েছে প্রায় ১৯৩ শতাংশ, যা তালিকার যেকোনো কোম্পানির মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি। ইউক্রেনের নিজস্ব প্রতিরক্ষা সংস্থা ইউক্রেনিয়ান ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রির আয়ও বেড়েছে ৪১ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে লকহিড মার্টিন, নর্থরপ গ্রুম্যান ও জেনারেল ডায়নামিকস আয়ের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে। দেশটির ৩৯টি কোম্পানির মধ্যে ৩০টিই আয় বাড়িয়েছে; মোট বিক্রি পৌঁছেছে ৩৩৪ বিলিয়ন ডলারে।

গত পাঁচ বছরে বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলে মার্কিন অস্ত্র সরবরাহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ইউরোপের ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোতে অস্ত্র সরবরাহ ৫২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬৪ শতাংশে পৌঁছেছে। এছাড়া, এসব দেশে মার্কিন অস্ত্র আমদানি ১০৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ইউরোপে মার্কিন অস্ত্র রপ্তানির হার ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যেখানে একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে এই হার ছিল ৩৩ শতাংশ।  ২০২৩ সালে সিপ্রি এর গবেষণায় বিশ্বের শীর্ষ ১০০ প্রতিষ্ঠান নিয়ে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করে তাতে বলা হয়, তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রেরই ৪২টি প্রতিষ্ঠান জায়গা করে নিয়েছে, যাদের দখলে রয়েছে বৈশ্বিক অস্ত্র-বাণিজ্যের মোট আয়ের ৫১ শতাংশ। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠানগুলো ৬০ হাজার কোটি ডলার আয় করেছে। সিপ্রির গবেষণায় জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ৪২টি কোম্পানি ঐ বছর আয় করে ৩০ হাজার কোটি ডলারের ওপরে, যা ২০২১ সালের তুলনায় সাত দশমিক নয় শতাংশ কম। ইউরোপীয়রা তার আগের বছর ১২ হাজার ১০০ কোটি ডলার আয় করে, যা  বছর শেষে কমেছে শূন্য দশমিক নয় শতাংশ। জার্মানির চারটি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে বছর শেষে এক দশমিক এক শতাংশ বেশি আয় করে। চীনের আট কোম্পানি তালিকায় স্থান পায়, যাদের তিনটি শীর্ষ দশে। একক দেশ তারা যুক্তরাষ্ট্রের পরেই। চীনা কোম্পানিগুলোর আয় ছিল ১০৮ বিলিয়ন ডলার।

নিজেদের শক্তিমত্তা বৃদ্ধি করা, হুমকি থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা এবং এ উদ্দেশ্যে সামরিক খাতে নতুন নতুন অস্ত্র যোগ করা এবং বিশ্ব প্রতিযোগিতায় নিজেকে উপযুক্ত করে গড়ে তোলা এখন প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বের প্রবণতা। সমরক্ষেত্র আধুনিকায়নে ব্যস্ত প্রতিটি দেশ। কেউ অস্ত্র তৈরি করছে আবার কেউ অস্ত্র কিনছে।  ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে বিশ্বে অর্থ রপ্তানির হাত চার দশমিক ছয় শতাংশ কমে গিয়েছিল। কিন্তু ইউক্রেন সংকটের কারণে এখন অস্ত্র রপ্তানি ১৯ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছে স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিচার্স ইনস্টিটিউট। আরও জানা যায়, আমেরিকা ও আফ্রিকায় অস্ত্র আমদানি কমলেও ভারত এবং সৌদি আরব আগের চেয়ে বেশি অস্ত্র কিনছে। এরপরই এগিয়ে আছে মিসর। সামরিক ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে কোনো ঝুঁকি মোকাবেলায় জোটে যোগদান এবং অস্ত্রের আধুনিকায়ন এই মুহূর্তে আরও বেশি অত্যাবশ্যকীয় হয়ে উঠেছে।

পৃথিবী এখন আগের থেকে অনেক বেশি যুদ্ধের ঝুঁকিতে রয়েছে। সুতরাং এই ঝুঁকি মোকাবিলায় দরকার অস্ত্র। অস্ত্র উৎপাদন এবং বিক্রি এখন সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা। ইতোমধ্যেই অনেক উন্নত দেশ অস্ত্রের আমদানি ও উন্নয়নে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের ঘোষণা দিয়েছে।  ভবিষ্যতে যে এই বাজার আরও বিস্তৃত হবে এবং অস্ত্র বিক্রি আরও বৃদ্ধি পাবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। ভেনেজুয়েলার ঘটনায় কেন কোনো দেশ আরও বেশি অত্যাধুনিক অস্ত্রের পিছনে ব্যয় করবে না সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে। এর ফলে মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলেও হবে, দরকার নিরাপত্তা। কিন্তু একটি দেশ কেন অন্য একটি দেশের থেকে নিরাপত্তা চাইবে! আধুনিক বিশ্বে এ কোন সমিরকণ ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে। সামর্থ্য থাকলেই তা প্রয়োগ করা যায় এই নীতি প্রতিষ্ঠিত হলে ভবিষ্যতে আরও খারাপ কিছু ঘটতে পারে। তবে এর বিপরীত ঘটনাও ঘটতে পারে। এর ফলে বিশ্বের অনেক দেশ আরও বেশি কাছাকাছি আসবে এবং মৈত্রী স্থাপন করবে। আপাতত যে বিশ্ব একটি মারাত্বক ঝুঁকির দিকে চলেছে সে কথা বলাই যায়।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

বিকেপি/এমবি 

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর