সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট : ভোটাররা কতটা প্রস্তুত?
নুরুল ইসলাম ফরহাদ
প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭:৫৯
গ্রাফিক্স : বাংলাদেশের খবর
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে— জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট। তবে ফরিদগঞ্জের ভোটারদের মধ্যে অনেকেই এখনও গণভোটকে পুরোপুরি বোঝেন না। তারা জানেন কেবল হ্যাঁ বা না-তে ভোট দিতে হবে, কিন্তু বিষয়বস্তু, প্রক্রিয়া এবং গণভোটের গুরুত্ব তাদের কাছে স্পষ্ট নয়।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনো দুটি নির্বাচন একত্রে হয়নি। সংসদ নির্বাচন এবং ক্ষমতার পরিবর্তনের বিষয়টি ভোটাররা তুলনামূলকভাবে ভালো বোঝেন। কিন্তু গণভোট— যা মূলত নির্দিষ্ট সংস্কার বা নীতি গ্রহণের জন্য জনগণের সমর্থন যাচাই করার প্রক্রিয়া— এখনও অনেকের কাছে অস্পষ্ট। গত ৩৫ বছরে দেশে কোনো গণভোট হয়নি। ফলে নতুন প্রজন্মের ভোটাররা এটি আগে দেখেনি। রাষ্ট্রপতি বা স্থানীয় নির্বাচনেও প্রার্থী থাকত, যেখানে ভোটারদের পছন্দের সুযোগ ছিল। কিন্তু গণভোটে কোনো প্রার্থী থাকে না; এটি একক বিষয় বা প্রস্তাবের সমর্থন বা বিরোধ নির্ধারণের একটি সরল ভোট। এই ভিন্নতা অনেকের জন্য বিভ্রান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এ বিষয়ে কিছু সচেতন ভোটারও প্রশ্ন করছেন। উদাহরণস্বরূপ, যদি চারটি প্রশ্নের মধ্যে দু’টির সঙ্গে একমত এবং অন্য দু’টিতে ভিন্নমত থাকে, তাহলে কীভাবে একজন ভোটার একটি হ্যাঁ বা না ভোটের মাধ্যমে নিজের মতামত সঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারবেন? এই প্রশ্নই প্রমাণ করে, গণভোটের প্রক্রিয়া এবং সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সাধারণ ভোটারদের সচেতনতা এখনও অপর্যাপ্ত।
চাঁদপুর-৪ এ বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ও সাবেক সংসদ সদস্য হারুনুর রশিদ বলেন, ‘বর্তমান মানুষ অনেক সচেতন, অনেক কিছু জানেন ও বোঝেন। গণভোট নিয়ে কাজ করার এখনো অনেক সময় আছে।’ হারুনুর রশিদের এই মন্তব্যে বোঝা যায় যে রাজনৈতিক দলের দৃষ্টি এখনো গণভোটের প্রচারণা ও শিক্ষার দিকে পুরোপুরি নিবদ্ধ হয়নি। সংসদ নির্বাচনের চাপ এবং প্রচারণায় ফলাফল-focused মনোভাবের কারণে গণভোট বিষয়ে যথেষ্ট সময় দেওয়া হচ্ছে না।
একই আসনে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী ও জেলা জামায়াতের আমির বিল্লাল হোসেন মিয়াজী বলেন, ‘অন্য দলের তুলনায় জামায়াত গণভোট নিয়ে বেশি প্রচারণা চালিয়েছে এবং করছে। জেলা ব্যাপী প্রায় দশ লাখ লিফলেট বিতরণ করেছি। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি প্রশাসনকেও গণভোট বিষয়ে আরও সচেতন প্রচারণা চালানো উচিত।’ এই মন্তব্য ইঙ্গিত করে যে, রাজনৈতিক দলের উদ্যোগ থাকলেও সরকারি প্রচারণা সীমিত এবং ভোটার সচেতনতার জন্য অপর্যাপ্ত। এটি একটি প্রান্তিক দুর্বলতা, যা ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি এবং অনিরাপদ বোধ সৃষ্টি করছে।
ফরিদগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেটু কুমার বড়ুয়া জানিয়েছেন, এবারের গণভোটে অনেকগুলো সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে সাংবিধানিক সংস্কারও রয়েছে। উপজেলা প্রশাসন লিফলেট বিতরণ ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে জনগণকে বিষয়বস্তুর সঙ্গে পরিচিত করাচ্ছে। এ মন্তব্যে জানা যায়, প্রশাসনের প্রচেষ্টা সীমিত হলেও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, যা ভোটারদের জন্য শিক্ষামূলক। তবে এ প্রচেষ্টা ব্যাপক বা দৃঢ়ভাবে লক্ষ্যযোগ্য নয়।
মোটকথা, ভোটাররা সংবিধান ও নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়গুলো বোঝার চেষ্টা করছেন, কিন্তু গণভোট এখনও তাদের কাছে অস্পষ্ট। রাজনৈতিক দলগুলো সংসদ নির্বাচনের চাপের মধ্যে থাকায় গণভোট বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও যথেষ্ট প্রচারণা না থাকায় ভোটারদের বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ছে। বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই পরিস্থিতি ভোটার শিক্ষা ও গণভোটের গ্রহণযোগ্যতার মধ্যে একটি ফাঁক তৈরি করছে, যা প্রভাব ফেলতে পারে ভোটারদের সঠিক অংশগ্রহণে।
লেখক : সাংবাদিক; ফরিদগঞ্জ (চাঁদপুর) প্রতিনিধি, বাংলাদেশের খবর
এমএইচএস

