আগুনের বাজার ও থমকে যাওয়া বেতন : দেয়ালে পিঠ ঠেকেছে যাদের
হাফেজ মুফতী রাশেদুর রহমান
প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:০৮
২০১৫ সালের শেষ পে-স্কেলের পর ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে দশটি বছর খসে গেছে। এই এক দশকে চাল, ডাল আর তেলের বাজারে যে আগুন লেগেছে, তাতে সাধারণ সরকারি কর্মচারীদের জীবন পুড়ে ছারখার। অথচ এখন যখন নতুন পে-কমিশনের মাধ্যমে বেতন বাড়ানোর আলাপ উঠছে, অমনি একদল পণ্ডিত তথাকথিত অর্থনীতির তত্ত্ব আওড়াতে শুরু করেছেন। ১.০৬ লাখ কোটি টাকার হিসাব দেখিয়ে তাঁরা সাধারণ মানুষের মনে ভীতি ছড়াচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবতার রুক্ষ জমিতে দাঁড়িয়ে এই বিপুল ব্যয়কে স্রেফ খরচ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি আসলে রাষ্ট্রের একটি অত্যাবশ্যকীয় বিনিয়োগ।
খালি পেটে কি আর সততার শপথ নেওয়া যায়? আমরা দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন চাই, কিন্তু একজন পিয়ন বা নিচুতলার কেরানির বেতন যখন তার বাজারের ফর্দের অর্ধেকও মেটাতে পারে না, তখন তাকে নৈতিকতার ছবক দেওয়া এক ধরণের নিষ্ঠুরতা। স্বচ্ছতার প্রথম শর্ত হলো কর্মচারীর আর্থিক নিরাপত্তা। পকেটে টান থাকলে মানুষের মন বিষিয়ে ওঠে, আর সেই বিষের প্রভাব পড়ে সরাসরি জনসেবায়। তাই ঘুষের পথ বন্ধ করতে চাইলে আগে ভাতের থালাটা নিশ্চিত করতে হবে।
যাঁরা ১.০৬ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব সংকটের দোহাই দিচ্ছেন, তাঁরা মুদ্রার একটা পিঠই দেখছেন। সরকারি কর্মচারীরা এই টাকা সিন্দুকে তুলে রাখেন না। এই টাকা ঘুরেফিরে বাজারের রক্ত সঞ্চালন হিসেবেই কাজ করে। একজন কর্মচারীর হাতে টাকা থাকা মানেই হলো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর দোকানে কেনাবেচা বাড়া, গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হওয়া। ফলে এই টাকা আসলে বাজারেই ফেরত আসে, যা পরোক্ষভাবে শিল্প উৎপাদন ও ব্যবসায়িক গতিশীলতাকে বাড়িয়ে দেয়।
আজকের দিনে বেসরকারি খাতের চাকচিক্যের কাছে মেধাবীরা সরকারি চাকরিতে আগ্রহ হারাচ্ছে। রাষ্ট্র যদি তার সেরা মেধাবীদের সেবা নিতে চায়, তবে তাদের যোগ্য সম্মান আর সম্মানীর কথা ভাবতেই হবে। তা না হলে দেশের প্রশাসন মেধাশূন্য হয়ে পড়বে, যার চড়া মূল্য শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে গুনতে হবে। আমরা ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বানাতে চাই, অথচ সেই স্মার্টনেস আনবে যে মানুষগুলো, তাদের জীবনযাত্রাই যদি মান্ধাতা আমলের রয়ে যায়, তবে প্রযুক্তি আর দক্ষতার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে।
বাজারের চড়া দরে এখন মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস উঠছে। সরকারি বেতন কাঠামো দেশের বাজারের জন্য একটা মানদণ্ড হিসেবে কাজ করে। সরকার যখন বেতন বাড়ায়, তখন বেসরকারি খাতও চাপে পড়ে বেতন বাড়াতে বাধ্য হয়। এতে করে সামগ্রিকভাবে দেশের কর্মজীবী মানুষের জীবনযাত্রার মান এক ধাপ ওপরে ওঠে। মুদ্রাস্ফীতির দোহাই দিয়ে এই দাবিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া মানে হলো ১০.৬ লাখ কর্মচারীর পরিবারকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেওয়া।
রাজস্বের ঘাটতি মেটানোর উপায় কি কেবল কর্মচারীদের বেতন আটকে রাখা? বরং প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়িয়ে কর ফাঁকি রোধ করতে পারলে ১.০৬ লাখ কোটি টাকা জোগাড় করা অসম্ভব কোনো বিষয় না। দক্ষ আর সন্তুষ্ট একটা বাহিনীই পারে রাষ্ট্রের ফুটো হওয়া বালতিটা মেরামত করতে। কর্মচারীরা যখন জানেন যে রাষ্ট্র তাঁদের খেয়াল রাখছে, তখন তাঁদের ভেতরেও কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা জন্মায়। এই মানসিক স্বস্তিটুকু ছাড়া ভালো আউটপুট আশা করা বাতুলতা।
পরিশেষে একটা কথা পরিষ্কার- পে-কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা কোনো করুণা বা দান নয়। এটি সময়ের দাবি এবং সামাজিক সুবিচারের প্রশ্ন। অর্থনীতিবিদদের খাতা-কলমের হিসাবের চেয়েও বড় সত্য হলো লাখো মানুষের হাহাকার। বাজারের এই অগ্নিমূল্যে তাঁদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। সরকার যদি দ্রুত বেতন বৃদ্ধির সাহসী সিদ্ধান্ত না নেয়, তবে প্রশাসনের ক্ষোভ আর অদক্ষতা পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে স্থবির করে দিতে পারে। তাই রাজস্বের ভয় না দেখিয়ে মানুষের পেটের জ্বালা মেটানোকেই অগ্রাধিকার দেওয়া এখন সময়ের সেরা দাবি।
লেখক : সিনিয়র পেশ ইমাম, বুয়েট সেন্ট্রাল মসজিদ ঢাকা
বিকেপি/এমবি

