পকেট নিউজরুম : যেভাবে একটি স্মার্টফোন বদলে দিল সাংবাদিকতার ব্যাকরণ
প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০:৫৬
ছবি : এআই দিয়ে তৈরি
দৃশ্যপট ১
বিশাল ওবি ভ্যান, কাঁধে ভারী ক্যামেরা, হাতে বুম মাইক্রোফোন, সঙ্গে পুরো একদল কলাকুশলী। ব্রেকিং নিউজ কভার করতে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে তাদের সময় লাগল বেশ খানিকটা।
দৃশ্যপট ২
জিন্সের পকেটে একটি স্মার্টফোন, কানে ছোট একটি ইয়ারফোন, আর ঘটনাস্থলে একা দাঁড়িয়ে একজন সাংবাদিক। কোনো ভারী সরঞ্জাম নেই, নেই কোনো সহকর্মী। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই তিনি পুরো দুনিয়াকে দেখিয়ে দিলেন ঘটনাস্থলের লাইভ চিত্র।
বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, দ্বিতীয় দৃশ্যটিই আজকের সাংবাদিকতার আসল বাস্তবতা। সাংবাদিকতার অভিধানে এর কেতাবি নাম ‘মোজো’ (MOJO) বা মোবাইল জার্নালিজম। এটি এমন এক জাদুর কাঠি, যা সাংবাদিকতাকে স্টুডিওর চার দেয়াল থেকে বের করে নিয়ে এসেছে সাধারণ মানুষের হাতের মুঠোয়।
এই বিপ্লবের শুরুটা খুব বেশিদিন আগের নয়। ২০০৭ সালে অ্যাপল যখন প্রথম আইফোন বাজারে আনল, তখন কেউ ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি এই যন্ত্রটি একদিন সিএনএন বা বিবিসির বিশাল ক্যামেরাকে চ্যালেঞ্জ জানাবে। তবে রয়টার্স এবং বিবিসির মতো দূরদর্শী প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকই বুঝতে পেরেছিল, আগামীর ভবিষ্যৎ এই ছোট্ট লেন্সেই লুকিয়ে আছে। তারা তাদের সাংবাদিকদের হাতে ভারী ক্যামেরা তুলে দেওয়ার বদলে তুলে দিল স্মার্টফোন। সেই শুরু। এরপর থ্রিজি, ফোরজি এবং হাল আমলের ফাইভজি ইন্টারনেট মোজো সাংবাদিকতাকে দিয়েছে রকেটের গতি।
কেন এই মোজো সাংবাদিকতা এত জনপ্রিয় হলো? এর উত্তর লুকিয়ে আছে তিনটি শব্দের মধ্যে গতি, সাশ্রয় এবং অ্যাক্সেস। প্রথাগত সাংবাদিকতায় যেখানে একটি রিপোর্ট তৈরি করে সম্প্রচার করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগত, সেখানে একজন মোজো সাংবাদিক শুট, এডিট এবং আপলোড সবই করছেন বাসের সিটে বসে কিংবা ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়েই। যুদ্ধক্ষেত্র, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা চরম হট্টগোলের মধ্যে যেখানে বড় ক্যামেরা নিয়ে প্রবেশ করা প্রায় অসম্ভব, সেখানে স্মার্টফোন যেন অদৃশ্য এক শক্তি।
এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ আমরা দেখেছি বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া কিছু ঐতিহাসিক ঘটনায়। সিরিয়ার আলেপ্পো শহরের কথাই ধরা যাক। ওয়াদ আল কাতিব নামের এক তরুণী মা যখন তাঁর শিশুকন্যা সামার জন্য যুদ্ধের স্মৃতি ধরে রাখছিলেন নিজের সাধারণ ফোনে, তখন তিনি আসলে তৈরি করছিলেন ইতিহাসের অন্যতম সেরা প্রামাণ্যচিত্র ‘ফর সামা’। অস্কারের মঞ্চ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল সেই মোবাইল ফুটেজ। আবার নেপালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের সময় যখন বড় বড় স্যাটেলাইট অচল, তখন বিবিসি ফাইভ লাইভের সাংবাদিক নিক গার্নেট শুধুমাত্র তাঁর আইফোন ব্যবহার করে বিশ্ববাসীকে জানিয়েছিলেন ধ্বংসস্তূপের খবর।
আমাদের খুব বেশি দূরে তাকাতে হবে না। ২০২৪ সালের জুলাই মাস। বাংলাদেশের রাজপথ যখন উত্তাল, তখন মূলধারার গণমাধ্যম যেখানে পৌঁছাতে পারেনি বা নানা চাপে সীমাবদ্ধ ছিল, সেখানে সত্যের মশাল হাতে নিয়েছিলেন সাধারণ শিক্ষার্থী এবং মোজো সাংবাদিকরা। রংপুরের আবু সাঈদের সেই বুক পেতে দেওয়ার দৃশ্য কিংবা হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণের সেই ভয়াবহ ফুটেজ কোনো পেশাদার টিভি ক্যামেরায় নয়, বরং ধারণ করা হয়েছিল সাধারণ স্মার্টফোনে। ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের সময়ও এই ফোনগুলোই ছিল তথ্যের একমাত্র ভল্ট, যা পরে বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেছে। আল জাজিরা থেকে শুরু করে সিএনএন সবাই আস্থার সাথে ভরসা করছে এই মোজো সাংবাদিকদের ওপর।
অবশ্য মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, ফোনের ছোট লেন্সে কি আর পেশাদার ক্যামেরার মতো গভীরতা পাওয়া সম্ভব? রাতে কম আলোতে ছবির মান কমে যাওয়া কিংবা অডিওতে বাতাসের শব্দ এসব চ্যালেঞ্জ এখনো আছে। তার চেয়ে বড় ভয় হলো ভুয়া খবর। যেহেতু যে কেউ সাংবাদিক বনে যেতে পারছে, তাই অনেক সময় সঠিক তথ্য যাচাই না করেই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যা বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। কিন্তু অভিজ্ঞ সাংবাদিকরা মনে করেন, যন্ত্র নয়, ঘটনা প্রকাশ করাই আসল কথা।
ভবিষ্যৎ কী বলছে? মোজো ফেস্টের প্রতিষ্ঠাতা গ্লেন মুলকাহির মতে, ‘মোজো এখন আর কোনো বিকল্প নয়, এটি এখন মানসম্মত পছন্দ।’ আগামী দিনে নিউজরুম হবে পুরোটাই মোবাইলকেন্দ্রিক। আরেক ধাপ এগিয়ে হ্যাসট্যাগ আওয়ার স্টোরিজের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ইউসুফ ওমর মনে করেন, ভবিষ্যতে আমাদের হাতেও ফোন থাকবে না। আমরা স্মার্ট চশমা বা পরিধানযোগ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে চোখের পলকেই লাইভ করব।
তবে প্রযুক্তি যা-ই আসুক, মোজো সাংবাদিকতা একটি ধ্রুব সত্য প্রতিষ্ঠা করেছে সংবাদ এখন আর করপোরেট অফিসের চার দেয়ালে বন্দি নয়। ক্ষমতা এখন জনগণের হাতে, আর সেই ক্ষমতার উৎস পকেটে থাকা ওই ছোট্ট যন্ত্রটি।
লেখক : ডিজিটাল গ্রোথ এডিটর, বাংলাদেশের খবর


