Logo

মতামত

শিশুদের সাজ, আমাদের দায়বদ্ধতা

Icon

ফারজানা জিতু

প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:২৪

শিশুদের সাজ, আমাদের দায়বদ্ধতা

কর্ডোভা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের যেমন খুশি তেমন সাজো প্রতিযোগিতায় কে.জি. ওয়ানের শিক্ষার্থী ৫ বছর বয়সী শেখ আয়েশা বিনতে নূর আনায়া সেজেছে ‘মিনা’।

শিশুরা জন্মগতভাবেই অনুকরণপ্রিয়। তারা যা দেখে, তাই শেখে; যা বারবার তাদের চোখের সামনে আসে, তাকেই তারা স্বাভাবিক বলে গ্রহণ করে নেয়। তাই শৈশবে আমরা তাদের কী দেখাচ্ছি, কী শেখাচ্ছি এবং কোন বিষয়গুলোকে তাদের কাছে মজার বা স্বাভাবিক হিসেবে উপস্থাপন করছি— তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের আজকের ছোট একটি সিদ্ধান্ত তাদের আগামীর রুচি ও ব্যক্তিত্বের ভিত্তি গড়ে দেয়।

স্কুলগুলোতে ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ প্রতিযোগিতা অত্যন্ত জনপ্রিয় বহুকাল ধরেই। এর মূল উদ্দেশ্য শিশুদের সৃজনশীলতা বাড়ানো হলেও বাস্তবে অনেক সময় দেখা যায়, শিশুদের বয়সের সাথে মানানসই নয় এমন সাজে তাদের মঞ্চে তোলা হচ্ছে। বড়দের কোনো গ্ল্যামার-কেন্দ্রিক চরিত্র, সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া কোনো সস্তা ট্রেন্ড কিংবা কৃত্রিম অঙ্গভঙ্গি কপি করে শিশুদের সাজানো হচ্ছে। প্রশ্ন জাগে— এই তথাকথিত বিনোদন কি শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশের জন্য আদৌ সঠিক?

বয়সানুযায়ী সাজ কেন জরুরি?
শিশু মনোবিজ্ঞান অনুসারে, ৪ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুরা তাদের আত্মপরিচয় গঠনের প্রাথমিক ও অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে থাকে। এ সময় তারা পরিবার, রূপকথার গল্প, কার্টুন বা শিক্ষকের আদর্শের আয়নায় নিজেদের জগতকে চিনতে শেখে। এই বয়সে তাদের যদি কৃত্রিমভাবে বড়দের মতো সাজিয়ে তোলা হয়, তবে শৈশবের স্বাভাবিক সরলতা ও পবিত্রতা থেকে তারা বিচ্যুত হয়।

এর একটি দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব শিশুর মনের ওপর পড়ে। যখন একটি শিশু তার বয়সের বাইরের কোনো চরিত্র বা ভাইরাল কোনো অঙ্গভঙ্গি নকল করে হাততালি পায়, তখন তার মধ্যে আত্মপরিচয়ের বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। সে নিজের সহজাত শিশুসুলভ আচরণের চেয়ে অন্যকে খুশি করার জন্য পারফর্ম করাকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে। এতে শিশুর স্বাভাবিক আত্মমূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়; সে মনে করতে শুরু করে যে, সে নিজে যেমন, তার চেয়ে অন্য কেউ সেজে থাকাই বেশি আকর্ষণীয়। শৈশবের নিজস্ব ভাষা হলো মিতাচার ও কৌতূহল— একে কৃত্রিমতার ছাঁচে ঢেলে দিলে শিশু অকালেই তার মানসিক সজীবতা হারিয়ে ফেলে।

ঐতিহ্যের সাথে পরিচয় : কেন এটি পরিচয় নির্মাণে কার্যকর?
আমরা যদি চাই আমাদের সন্তানরা ভবিষ্যতে বিশ্বের দরবারে নিজেদের সংস্কৃতি নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক, তবে সেই শিকড়ের বীজ বপন করতে হবে শৈশবেই। উদাহরণস্বরূপ—

১. গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী পেশা : কুমার, তাঁতি, কৃষক বা জেলে।

২. শাশ্বত পোশাক : দেশীয় সুতার শাড়ি, পাঞ্জাবি বা গ্রাম্য গামছা।

৩. লোককথার চরিত্র : আমাদের লোকজ কাহিনি বা মিনার মতো সচেতনতামূলক চরিত্র।

এই সাজগুলো কেবল পোশাকি পরিবর্তন নয়, বরং এগুলো শিশুর পরিচয় নির্মাণে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখে। যখন একটি শিশু তাঁতি বা জেলে সাজে, তখন সে আমাদের শ্রমজীবী মানুষের জীবন সংগ্রাম ও দেশের অর্থনীতির ভিত্তি সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা পায়। এটি তার মাঝে সহমর্মিতা তৈরি করে। পোশাকের মাধ্যমে সে যখন নিজের অঞ্চলের ইতিহাসকে ধারণ করে, তখন তার মধ্যে একটি সাংস্কৃতিক নিরাপত্তা ভাবনা তৈরি হয়। সে বুঝতে শেখে যে তার শিকড় অনেক গভীর ও সমৃদ্ধ। এই বোধটি তাকে বড় হয়ে বিদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ থেকে রক্ষা করে এবং নিজের স্বকীয়তা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

সৃজনশীলতা মানেই অবাস্তবতা নয়
অনেকে হয়তো বলবেন, শিশুরা তো কেবল মজাই করছে। কিন্তু এই মজার প্রভাব তার মন-মগজে গেঁথে যায়, অবচেতনে কোথায় থেকে যায়। কেনোই বা বিনোদনের নামে শিশুর বয়সের গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনার গণ্ডিকে পেরিয়ে যেতে হবে? প্রকৃত সৃজনশীলতা ফুটে ওঠে যখন শিশু গ্রামের ডাকপিয়ন, নকশী কাঁথার কারিগর কিংবা পাটের পণ্য উদ্যোক্তা সেজে আসে। এই সাজগুলো শিশুকে বাস্তব জীবনের বৈচিত্র্যের সাথে পরিচিত করে এবং অবচেতনেই তার মনে দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলে। বিষয়গুলো শিশুর অবচেতন মনে দীর্ঘস্থায়ী জায়গা করে নেয় এবং সে সমাজ ও দেশ নিয়ে ইতিবাচকভাবে ভাবতে শুরু করে।

মিডিয়ার প্রভাব ও অভিভাবকদের দায়বদ্ধতা 
আজকের শিশুরা ইউটিউব, রিলস ও শর্ট ভিডিওর ভাইরাল স্রোতে ভেসে বড় হচ্ছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল ট্রেন্ড ও সস্তা ভাইরাল চ্যালেঞ্জগুলো তাদের চোখের সামনে প্রতিনিয়ত ঘুরপাক খাচ্ছে। অভিভাবক হিসেবে আমরা অনেক সময় সস্তা জনপ্রিয়তার লোভে ভাবি, সবাই তো করছে, আমার সন্তানও একটু করুক। কিন্তু সবাই করছে বলেই কি তা শিশুর জন্য মঙ্গলজনক?

একটি শিশুর সুস্থ ও স্থিতিশীল মানসিক বিকাশের জন্য নিরবচ্ছিন্ন শৈশব প্রয়োজন। বয়সের তুলনায় অগ্রিম বা অকালপক্ব বিষয়গুলো বারবার সামনে আনলে শিশুরা দ্রুত বড় হয়ে ওঠার এক অদৃশ্য চাপে ভোগে। একটি শিশুর প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ওঠার পেছনে তার অভিভাবকের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। কিন্তু আমরা কি সেই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছি? আজকের শিশু যখন ভাইরাল আসক্তি ও লোকদেখানো সস্তা জনপ্রিয়তাকে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে বড় হবে, তখন হয়তো আমরাই তাকে দোষারোপ করব। অথচ এর প্রকৃত দায়ভার কিন্তু আমাদেরই— যারা তার হাতে শৈশবে ভুল আদর্শ তুলে দিয়েছি।

আমাদের করণীয়
১. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা : যেমন খুশি তেমন সাজো প্রতিযোগিতার পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট থিম যেমন—ঐতিহ্য, দেশীয় পেশা, জাতীয় বীর বা পরিবেশ সচেতনতা নির্ধারণ করে দেওয়া।

২. সচেতন অভিভাবকত্ব : সাজ যেন শিশুর ব্যক্তিত্ব ও বয়সের সাথে মানানসই হয়। অতিরিক্ত প্রসাধন বা বড়দের মতো কৃত্রিম অঙ্গভঙ্গি পরিহার করা উচিত।

৩. দেশীয় গল্পের চর্চা : শিশুকে নিজস্ব সংস্কৃতির বীরত্বগাথা ও অনুপ্রেরণামূলক গল্পের সাথে নিবিড়ভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া।

৪. শিশুর ইচ্ছা ও মতামত : কোনো সাজ চাপিয়ে না দিয়ে তার পছন্দের কারণ জানতে চাওয়া এবং তাকে সেই চরিত্রের ইতিবাচক দিকগুলো বুঝিয়ে বলা।

আশার আলো
শত বিভ্রান্তির ভিড়েও যখন কোনো শিশু মিনা সেজে বা গ্রামবাংলার চিরায়ত কোনো চরিত্রে মঞ্চে দাঁড়ায়, তখন মনে হয় আমাদের শিকড় এখনও অনেক শক্ত। শিশুরা কাঁচা মাটির মতো; আমরা বড়রা তাদের যেভাবে ছাঁচ দেব, তারা সেভাবেই গড়ে উঠবে। মনে রাখতে হবে, সাজ কেবল এক টুকরো পোশাক নয়— এটি একটি শক্তিশালী বার্তা, একটি জীবনবোধ এবং আগামীর দিশারি। আমাদের আজকের সচেতন সিদ্ধান্তই ঠিক করে দেবে, আমাদের সন্তানরা ট্রেন্ডের জোয়ারে খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে নাকি নিজস্ব সংস্কৃতির পাহাড়সম ভিত্তিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।

ফারজানা জিতু : হস্তশিল্প উদ্যোক্তা; ব্যবস্থাপনা পরিচালক, শিল্পপুরাণ

এমএইচএস

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর