বগুড়া-১
বিএনপির মূল প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিকল্প প্রার্থীর আপিল, কী ব্যবস্থা নেবে দল?
বাংলাদেশের প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১৮:৩৯
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত মূল প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে আপিল করেছেন দলেরই এক বিকল্প প্রার্থী। বগুড়া-১ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী কাজী রফিকুল ইসলামের মনোনয়নের বিরুদ্ধে আপিল করেন ওই আসনের বিকল্প প্রার্থী একেএম আহসানুল তৈয়ব জাকির। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং দলীয় পর্যায়ে আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
দলীয় সূত্র জানায়, সম্প্রতি একেএম আহসানুল তৈয়ব জাকির বেসরকারি একটি ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে নির্বাচন কমিশনে গিয়ে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী কাজী রফিকুল ইসলামের মনোনয়ন বাতিলের আবেদন করেন।
এর আগে রিটার্নিং কর্মকর্তা কাজী রফিকুল ইসলামের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেন। এরপরও তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন আহসানুল তৈয়ব জাকির।
এই আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয় দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য কাজী রফিকুল ইসলামকে। পরে তার বিরুদ্ধে ঋণ খেলাপির অভিযোগ ওঠায় মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন রাতে সোনাতলা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আহসানুল তৈয়ব জাকিরকে ডামি প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয় বিএনপি। তার মনোনয়নে ‘সংযুক্তি-২’ উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ, কোনো কারণে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী কাজী রফিকুল ইসলামের মনোনয়ন বাতিল হলে জাকির বিকল্প হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেবেন।
যাচাই-বাছাই শেষে বগুড়া জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় কাজী রফিকুল ইসলাম এবং বিকল্প প্রার্থী একেএম আহসানুল তৈয়ব জাকির— উভয়ের মনোনয়নই বৈধ ঘোষণা করে। তবে পরবর্তীতে ৯ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনে গিয়ে কাজী রফিকুল ইসলামের প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে আপিল করেন জাকির। দলীয়ভাবে এটি শৃঙ্খলা পরিপন্থি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান বেগম সেলিমা রহমান বলেন, ‘দলের মূল প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের কার্যক্রম না চালানোর বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। এরপরও কেউ যদি দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে কাজ করেন, তাহলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কাজী রফিকুল ইসলামের ভাষ্য, তিনি বিএনপির প্রথম দফায় ঘোষিত ২৩৭ জন মনোনীত প্রার্থীর একজন এবং দলের ঘোষণার পর থেকেই মাঠে কাজ করছেন। তিনি অভিযোগ করেন, শুরু থেকেই তাকে অনলাইন ও অফলাইনে হেনস্তা করা হচ্ছে এবং তার বক্তব্য সম্পাদনা করে বিকৃতভাবে প্রচার করা হয়েছে। তিনি বলেন, দলের একজন নেতা হয়ে দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে আপিল করায় তিনি বিব্রত।
তিনি আরও বলেন, ‘ধানের শীষের বিজয় মানে জনতার বিজয়’— এই বক্তব্য বিকৃতভাবে প্রচার করা হয়। পরে বিএনপির মিডিয়া সেল বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করে বিবৃতি দেয়। তিনি দলের সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেন এবং সবাইকে দলীয় বিভাজন এড়িয়ে চলার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে অভিযুক্ত একেএম আহসানুল তৈয়ব জাকিরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, ‘কাজী রফিকুল ইসলামও বিএনপির প্রার্থী, আমিও বিএনপির প্রার্থী।’ প্রতিবেদকের কাছে আপিল সংক্রান্ত কাগজপত্র রয়েছে জানালে তিনি ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। পরে তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কাজী রফিকুল ইসলামকে নিয়ে ভুয়া ফটোকার্ড ও বক্তব্য বিকৃত করে প্রচার করা হচ্ছিল। এসব কর্মকাণ্ডে জাকিরের ঘনিষ্ঠরা জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে বগুড়া-১ আসনে জামায়াতে ইসলাম মনোনীত প্রার্থী অধ্যক্ষ শাহাবুদ্দিন নির্বাচন করছেন, যিনি আহসানুল তৈয়ব জাকিরের আত্মীয় বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। স্থানীয়দের মতে, বগুড়া বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হওয়ায় বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো দলটিকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে।
মূল প্রার্থী ও বিকল্প প্রার্থী— ধারণাটা কী?
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো কোনো কোনো আসনে মূল প্রার্থীর পাশাপাশি বিকল্প বা ডামি প্রার্থী দেওয়ার চল রয়েছে। এটি মূলত মনোনয়ন বাতিল, আইনি জটিলতা বা টেকনিক্যাল কারণে প্রার্থী শূন্যতা এড়ানোর জন্য একটি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কৌশল। তবে বিকল্প প্রার্থীর ভূমিকা সীমিত— তিনি নীরবে প্রস্তুত থাকবেন এবং কেবল মূল প্রার্থী বাতিল হলে দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দায়িত্ব নেবেন। বিকল্প প্রার্থী যদি নিজেই মূল প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন বা নির্বাচন কমিশনে আপিল করেন, তা ব্যাকআপের সীমা ছাড়িয়ে গিয়ে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হয়। দলগুলো সাধারণত একে দেখে— অন্তঃকোন্দল, গ্রুপিং রাজনীতি, বহিঃশক্তির প্রভাবের আশঙ্কা বা ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা হিসেবে। এই কারণে প্রায় সব দলেই এ ধরনের ঘটনায়— শোকজ, মনোনয়ন বাতিল বা দলীয় পদ স্থগিতের নজির রয়েছে।

