Logo

রাজনীতি

আওয়ামী লীগের ভোটার নিয়ে টানাটানি

Icon

এম. ইসলাম

প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:০০

আওয়ামী লীগের ভোটার নিয়ে টানাটানি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক মাঠে এক অদ্ভুত বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় নির্বাচনে সরাসরি অংশ নিতে না পারলেও আওয়ামী লীগ কার্যত এই নির্বাচনের অন্যতম নির্ধারক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা বিপুল কর্মী-সমর্থকের ভোটের জন্য এখন বিএনপি, জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা। 

কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্বাচন বর্জনের আহ্বান উপেক্ষা করে তৃণমূলের বড় অংশ ভোটের মাঠে সক্রিয়- কোথাও বিএনপি বা জামায়াত প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা, কোথাও স্বতন্ত্র প্রার্থীকে সমর্থন, আবার কোথাও গণভোটে ‘না’ ভোটের ক্যাম্পেইনে যুক্ত হচ্ছেন তারা। বিদেশে অবস্থানরত সুবিধাভোগী শীর্ষ নেতাদের প্রতি ক্ষোভ, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ এবং স্থানীয় বাস্তবতা মিলিয়ে আওয়ামী লীগের তৃণমূল এখন কেন্দ্রের নির্দেশনার বাইরে গিয়ে নিজের মতো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।

মাঠপর্যায়ে প্রকাশ্য প্রচারণা, পাল্টাপাল্টি হামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা যেমন সামনে আসছে, তেমনি রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন- এই ভোটারদের অংশগ্রহণই অনেক আসনে জয়-পরাজয়ের চূড়ান্ত ফয়সালা দেবে এবং একই সঙ্গে নির্বাচনের ভোটার উপস্থিতি ও গ্রহণযোগ্যতার ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলবে।

আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকায় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না আওয়ামী লীগ। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় ভোটের মাঠে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক দলটি। আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থক সারা দেশে অনেক। দলটির রয়েছে বিপুল ভোট ব্যাংক। প্রভাবশালী ও ‘অপরাধী’ নেতাকর্মীরা পালিয়ে গেলেও সারা দেশে কর্মী-সমর্থকরা আছেন। তাদের ভোট নিয়েই এখন টানাটানি চলছে।

বিএনপি এবং জামায়াত জোটের পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও এখন আওয়ামী লীগের তৃণমূলের ভোটকে টার্গেট করে এগোচ্ছে। আর ব্যালটে অনুপস্থিত থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে টিকে থাকা, নিরাপত্তা বিবেচনা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ মাথায় রেখে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা সারা দেশে এখন ভোটের মাঠে। বড় দুই দলের নেতাদের পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আওয়ামী লীগের ভোটার টানার বিষয়ে কৌশলী বক্তব্য দিচ্ছেন।

অনুসন্ধান বলছে, গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীরা চাপে রয়েছেন। দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের একটি অংশ বিদেশে অবস্থান করে বেশ আয়েশী জীবন-যাপন করছেন। তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে তাদের নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। ফলে, বিদেশ থেকে দলের শীর্ষ নেতাদের নির্বাচন বর্জনের যে আহ্বান রয়েছে তা তৃণমূল আমলে নিচ্ছে না।

দলগুলোর নেতারা যাই বলুন না কেন, আওয়ামী লীগের সমর্থকদের বড় অংশটি বিএনপি বা জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন, আবার অনেকে স্বতন্ত্র প্রার্থীকে সমর্থন দিচ্ছেন।

সা¤প্রতিক সময়ে ঢাকা, মাদারীপুর, রাজশাহীসহ কয়েকটি এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের প্রকাশ্যে নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে। একটি দলকে সমর্থন দেওয়ায় আরেকটি দলের নেতারা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পিটিয়েছেন এমন ঘটনাও ঘটেছে রাজশাহীসহ একাধিক স্থানে।

মাদারীপুরের শিবচরে গত ৩ ফেব্রুয়ারি বিকালে সাবেক পৌর মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা আওলাদ হোসেন খানের বাসভবনে স্থানীয় বিএনপির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত উঠান বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগ নেতারা বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে ক্যাম্পেইন করেন। বৈঠকে অংশ নেওয়া আওয়ামী লীগ নেতাদের দাবি, সাবেক চিফ হুইপ নূর-ই আলম চৌধুরী লিটনের নির্দেশেই তারা ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী নাদিরা আক্তারের পক্ষে মাঠে নেমেছেন।

সাবেক পৌর কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা আক্তার হোসেন বলেন, ‘আমরা ধানের শীষে ভোট দিয়ে নাদিরা আপাকে জয়যুক্ত করব এবং পৌরসভা থেকে সর্বাধিক ভোট তাকেই দেব। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।’

ওই ঘটনার একদিন পর ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ ব্যানারে শিবচর থানা ঘেরাও করে আওয়ামী লীগ নেতাদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান জামায়াত প্রার্থীর সমর্থকরা।

অবশ্য আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা ভিন্ন কথা বলছেন। দলটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিম বলেন, ‘যে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেই সেটি আসলে কোনো নির্বাচন নয়। আমাদের কর্মীদের কেন্দ্রে যেতে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। তাই আপাতত কোনো প্রার্থীর পক্ষে কাজ করলেও শেষ পর্যন্ত তারা ভোটকেন্দ্রে যাবেন না।’

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী দৈনিক বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘বিদেশে পালিয়ে থাকা শীর্ষ নেতারা যাই বলুন না কেন তৃণমূলে বাস্তবতা একেবারে ভিন্ন। বড় অংশটি ভোটের মাঠে থাকায় নির্বাচনে ভোটের পারসেন্ট বাড়তে পারে। ফলে, নির্বাচনের গ্রহণযোগ্য বাড়তে পারে। পাশাপাশি এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটাররা কোনো একটি আসনের ফলাফল পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেন।’

ভোটের মাঠে থাকা সব দল বা প্রার্থীরা এখন আওয়ামী লীগের ভোটারদের টার্গেট করছেন; এমনটি জানা যাচ্ছে আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরেও। আওয়ামী লীগের ভোটার কব্জায় নিতে এখন রীতিমতো বিএনপি ও জামায়াত উভয় দলই কৌশলী বক্তব্য দিচ্ছে। আওয়ামী লীগের তৃণমূল যে ভোটের মাঠে নেমে পড়েছে তা বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের কথাতেও প্রমাণ মেলে।

জামায়াত ইসলামী কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসাইন দৈনিক বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘দেশের সম্পদ অবৈধভাবে লুটপাট করে যারা বিদেশে আয়েশী জীবন-যাপন করছেন তাদের কথা কেন বিপদে পড়ে থাকা আওয়ামী লীগ কর্মীরা শুনবেন?’

তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের অনেকেই গত তিন নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি। তাই এবার দলটির কর্মী-সমর্থকরা ভোট উৎসবে অংশ নিচ্ছেন। তারা সৎ ও যোগ্য প্রার্থী এবং বিপদে যারা পাশে ছিলেন তাদের ভোট দেবেন। তারা কোন চাঁদাবাজকে ভোট দেবেন না।’

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও পাবনা-৪ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, ‘স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও সংখ্যালঘু থেকে শুরু করে নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আওয়ামী লীগের নিরপরাধ ভোটাররা এবার বিএনপির প্রার্থীদের ভোট দেবেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ-কর্মী সমর্থকরা ভোটের মাঠে রয়েছেন এবং তারা ভোটও দিতে যাবেন।’

গত কয়েক দিনে কয়েকটি আসনে নির্বাচনী মাঠ পর্ববেক্ষণে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নির্বাচনী মাঠে অনেকটাই প্রকাশ্যে। 

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা যার যার এলাকা নিয়ে নেতাকর্মীদের বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন। সেখানে তারা গণভোটে ‘না’ ভোট দেওয়া এবং বিএনপির  প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাইছেন। যদিও তৃণমূল কেন্দ্রের কথা আমলে না নিয়ে সুবিধামতো প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন।

গত ৩ ফেব্রুয়ারি বিকালে আওয়ামী লীগের সাবেক ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমানের মালিকানাধীন এনাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ডা. এবং তার স্ত্রী রৌশন আরা লাভলী ও শ্যালক সাইফুল ইসলামকে ঢাকা-১৯ (সাভার- আশুলিয়া) আসনের বিএনপি প্রার্থী ডা. দেওয়ান সালাউদ্দিন বাবুর পক্ষে প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

৫ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী-৪ আসনে বাগমারা উপজেলায় জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. আব্দুল বারীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় চালানোয় আওয়ামী লীগ নেতা মহিদুল ইসলাম (৪৮) ও তেলিপুকুর গাঙ্গোপাড়া বাজারে এনামুল হককে (২৭) মারধর করা হয়। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় শান্ত (২২) নামের এক তরুণকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। 

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা সাতক্ষীরায় একাধিক নির্বাচনী আসনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অনেকেরই দেখা মিলছে জামায়াত প্রার্থীর প্রচারণায়।

আবার ঝিনাইদহ-৪ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সাইফুল ইসলাম ফিরোজের পক্ষে প্রকাশ্যে অনেক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা কাজ করছেন।

অর্থাৎ সারা দেশে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মাঠে বিষয়টি এখন স্পষ্ট। সরাসরি ভোটে অংশগ্রহণ করতে না পারলেও এই নির্বাচনে কর্মী-সমর্থকরা অনেক আসনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে সেটিও এখন পরিষ্কার।

বিকেপি/এমবি

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

সংসদ নির্বাচন আওয়ামী লীগ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর