কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসেন আলো হয়ে। যাঁদের পরশ পেলে আলোকিত মানুষ হওয়া যায়। তবে তাঁরা নিজেরা সামনে না এসে অন্যদের সামনে দাঁড় করান। নিজের নাম বড় না করে গড়ে তোলেন অসংখ্য নাম। লালবাগ জামেয়ার প্রবীণ মুহাদ্দিস মাওলানা আব্দুর রহিম (রহ.) ছিলেন ঠিক তেমনই এক নীরব আলোকবর্তিকা। তাঁর জীবনে কোনো চমকপ্রদ গল্পের সমাহার ছিল না, ছিল ধারাবাহিক দায়িত্ববোধ, নিরবচ্ছিন্ন মেহনত, ইখলাস আর আজীবন ইলমি খেদমতের সুদীর্ঘ সাধনা। তাঁর ইন্তেকালের দিনটি প্রমাণ করে দিয়েছে যে, নীরবে যাঁরা দ্বীনের কাজ করেন, আল্লাহ তাআলা তাঁদের বিদায়টুকু করেন অনন্য মর্যাদার।
প্রায় পাঁচ দশক ধরে লালবাগ জামিয়া কোরআনিয়া আরাবিয়ায় হাদিসের দরস দেওয়া এই মানুষটি কখনো নিজেকে আলাদা করে তুলে ধরেননি। চাননি যশ জৌলুস সুনাম সুখ্যাতি। তিনি ছিলেন মাদরাসার কামরায় বসে থাকা একজন দায়িত্বশীল উস্তাদ। সময়ের পরিক্রমায় যিনি হয়ে উঠেছিলেন অসংখ্য আলেম গড়ার কারিগর।
জন্ম, পরিবার ও শৈশব:
১৯৪১ সালের ৫ জুলাই কুমিল্লা জেলার মুজাফফরগঞ্জ এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন মাওলানা আব্দুর রহিম (রহ.)। তাঁর পিতা মরহুম আইয়ুব আলি ছিলেন ধর্মের প্রতি গভীর অনুরাগী একজন মানুষ। ছিলেন নৈতিকতা ও দ্বীনের প্রতি ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। গ্রামীণ নির্মল পরিবেশেই মাওলানা আব্দুর রহিম (রহ.) বেড়ে ওঠেন। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন শান্ত প্রকৃতির। কম কথা বলতেন। অনর্থক কাজ এড়িয়ে চলতেন। যে কোনো কাজের ব্যাপারে ছিলেন গভীর মনোযোগী।
শিক্ষাজীবন:
গ্রামের মাদরাসায় পড়াশোনার শুরু। খুব দ্রুতই তাঁর মধ্যে ইলমের প্রতি ঝোঁক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কুমিল্লার প্রখ্যাত মুরুব্বি ও আলেম মাওলানা শেখজী (রহ.) তাঁর প্রতিভা ও আখলাকের দিকে বিশেষ নজর দেন। এই শিক্ষকই ছিলেন তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার অন্যতম কারিগর।
ঢাকায় আগমন:
মাওলানা শেখজী (রহ.)-এর কাছে শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করার পর তিনি যখন ইলমে হাদিসের উচ্চতর পর্যায়ে পৌছান, তখনই সিদ্ধান্ত হয় তাঁকে ঢাকায় পাঠানো হবে। সে সময় ঢাকার লালবাগ মাদরাসা ছিল উপমহাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইলমি কেন্দ্র। শেখজী (রহ.) নিজে তরুণ আব্দুর রহিমকে ঢাকায় নিয়ে আসেন এবং লালবাগ জামিয়ার তৎকালীন মুরুব্বি (সদর সাহেব হুজুর) শামসুল হক ফরিদপুরী (রহ.)-এর হাতে তুলে দেন।
ইলমের একনিষ্ঠ খাদেম:
ঢাকায় এসে অনেকেই স্থায়ী বাসা, পারিবারিক আরাম আয়েশ, সামাজিক অবস্থান গড়ে তোলেন। কিন্তু মাওলানা আব্দুর রহিম (রহ.) এসবের ধারেকাছেও খাননি। তিনি ছিলেন ইলমের একনিষ্ঠ খাদেম। লালবাগ মাদরাসার কামরা তাঁর ঠিকানা ছিল এই একটাই। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর, প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে এই কামরাই ছিল তাঁর ঘর, বিশ্রাম, ইবাদত, মোজাহাদা আর ইলম চর্চার জায়গা।
তিনি নিয়মিত হাদিসের দরস দিতেন। ক্লাসে প্রবেশ করতেন ধীরপায়ে নীরবে। মুখে লেগে থাকত নির্মল মৃদু হাসি। কিতাব খুলে বসতেন গভীর মনোযোগে। তাঁর দরসে ছিল অন্যরকম প্রশান্তি। স্পষ্ট উচ্চারণে ধীর লয়ে কথা বলতেন। কোনো শব্দ অস্পষ্ট কিংবা বোধগম্যহীন থাকত না।
মাওলানা আব্দুর রহিম (রহ.)-এর শিক্ষাদান পদ্ধতি ছিল ব্যতিক্রমী। তিনি কখনো ছাত্রদের সঙ্গে কঠোর আচরণ করতেন না। ভালোবাসা দিয়ে বুঝাতে চেষ্টা করতেন সবসময়। কোনো ছাত্রের মধ্যে কানুনবিরোধী কিছু দেখলে তিনি উচ্চস্বরে ধমক দিতেন না। পরম স্নেহ ও ভালোবাসায় তাকে সংশোধনের চেষ্টা করতেন। ছাত্রদের প্রহার তো দূর কি বাত, কখনো নিয়ন্ত্রণহীন উচ্চ আওয়াজে কথা বলতেও কেউ তাঁকে দেখেনি। তাঁর রাগ ছিল দায়িত্বের, কিন্তু তার প্রকাশ ছিল স্নেহের।
ব্যক্তিত্ব ও আখলাক:
হুজুর ছিলেন স্বভাবতই সুদর্শন। লাল টুকটুকে চেহারা, উজ্জ্বল চোখ, ঝকঝকে দাঁতের হাসি। বাহ্যিক এসব সৌন্দর্যের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় ছিল তাঁর আত্মিক সৌন্দর্য। দীর্ঘ ইলমি সাধন্য, আত্মশুদ্ধির চেষ্টা ও ইখলাস তাঁর ব্যক্তিত্বে আলাদা জৌলুস এনে দিয়েছিল। তাঁর সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললে যে কারো মন ভালো হয়ে যেতো।
পরিবার ও সন্তানসন্ততি:
মাওলানা আব্দুর রহিম (রহ.) প্রায়ই বলতেন, 'আমি সবসময় চেষ্টা করেছি ছাত্রদের হক আদায় করতে, এজন্য আল্লাহ তাআলা আমার সন্তানদের মানুষ করেছেন।'
এ কথার বাস্তব প্রমাণ ছিল তাঁর পরিবার। পাঁচ পুত্র ও এক কন্যা, তাদের প্রত্যেকেই দ্বীনের খেদমতে সুপ্রতিষ্ঠিত। তাঁর সন্তানরা আজ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে মুহাদ্দিস, মুফতি ও উস্তাদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এটি একজন আলেমের জীবনের সবচেয়ে বড় সফলতা।
তাঁর পাঁচ পুত্র যথাক্রমে: ১. মুফতি সাঈদ আহমদ। প্রধান মুফতি, জামিয়াতুল আবরার রহমানিয়া। ২. মুফতি ফরিদ আহমদ। মুহাদ্দিস, জামিয়া কোরআনিয়া আরাবিয়া, লালবাগ, ঢাকা।
৩. মুফতি শিব্বির আহমদ। প্রধান মুফতি, মাদরাসা বাইতুল উলুম ঢালকানগর।
৪. মুফতি মুখতার আহমদ। শায়খুল হাদিস, বাইতুন নূর, সায়েদাবাদ।
৫. মুফতি শরিফ আহমদ। মুদাররিস, মারকাজুল ফিকরিল ইসলামী উত্তরা, ঢাকা।
ইন্তিকাল:
২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ তারিখে গাজীপুর খালেকিয়া মাদরাসার মাহফিলে তিনি ছাত্রদের পাগড়ি পরান এবং নসিহত করেন। পরদিন ২৮ ডিসেম্বর সকালে লালবাগ মাদরাসায় নিয়মিত দরস দেন। হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন। জোহর ও আসর নামাজ মসজিদে জামাআতের সঙ্গেই আদ্যয় করেন।
মাগরিবের আগে সামান্য দুর্বলতা অনুভব করলেও তিনি নিজ কক্ষে নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে তাসবিহ ও তাহলিলে মগ্ন হন। কিছুক্ষণ পর খাদেমকে শরীর ভালো না লাগার কথ্য জানান। তারপর নামাজের বিছানায় শুয়ে পড়েন। খাদেম হুজুরের ছেলে মাওলানা ফরিদ আহমদকে বিষয়টি জানানোর জন্য বাইরে বের হন।
খাদেম ফিরে এসে দেখেন হুজুর ঘুমাচ্ছেন। ডাক দেন। সাড়া নেই। স্পর্শ করে বোঝেন শরীর ঠান্ডা। তখনই নিশ্চিত হন ইবাদত ও জিকিরের মাঝেই তিনি মহান রবের ডাকে সাড়া দিয়েছেন।
মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব, খতীব বাইতুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ; মাওলানা আব্দুল মতিন সাহেব, পীর সাহেব ঢালকানগর: মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাহেব, মসজিদে আকবর কমপ্লেক্স, ঢাকা; তাঁদের মতো নক্ষত্রতুল্য বহু আলেম তাঁর ছাত্র ছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দার যাবতীয় নেক আমল করুল করুন। মানবীয় সব ধরনের ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন। তাঁর কবরকে নুরান্বিত করুন। আমিন।
লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা

