ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায় গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে এক অবিসংবাদিত সত্য আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হয় যে, ইসলামের পথ কখনোই কেবল ভাষণ, যুক্তি কিংবা আবেগঘন বক্তব্যে প্রশস্ত হয়নি; বরং তা বারবার প্রশস্ত হয়েছে শহীদদের পবিত্র রক্তধারায়। তাদের এ রক্ত ক্ষণস্থায়ী নয়, বরং চিরজীবী; তাদের এ ত্যাগ ক্ষয়প্রাপ্ত নয়, বরং যুগে যুগে ঈমানের আলো জ্বালিয়ে রাখে। ইসলামের সূচনা থেকে আজ পর্যন্ত হক ও বাতিলের যে অবিরাম সংঘর্ষ চলে আসছে, তার প্রতিটি বাঁকে দাঁড়িয়ে আছে এক অমর কাফেলা। ইতিহাস যেই কাফেলা চিহ্নিত করেছে ‘শহীদি কাফেলা’ নামে।
তবে দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আমাদের সমাজে ‘শহীদ’ শব্দটি নিয়ে ব্যাপক বিভ্রান্তি ও অস্পষ্টতা বিদ্যমান। কে প্রকৃত শহীদ, কাকে শহীদ বলা যায়, কোন মৃত্যু শহাদাত হিসেবে গণ্য হয় আর কোনটি হয় না, এসব বিষয়ে আবেগ, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা সামাজিক প্রচলনকে অনেক সময় শরিয়তের মানদণ্ডের ওপর প্রাধান্য দেওয়া হয়। ফলে কখনো শহিদের মর্যাদা এমন ব্যক্তির ওপর আরোপ করা হয়, যাঁর মৃত্যু শরঈ দৃষ্টিতে শহাদাতের অন্তর্ভুক্ত নয়; আবার অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত শহাদাতের উচ্চ মর্যাদা সম্পর্কে মানুষ উদাসীন থেকে যায়।
অথচ শহীদগণ কোনো সাধারণ শ্রেণি নন; তাঁরা আল্লাহ তা‘আলার বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত এক মহান জামাআত। যাঁদের পথ অনুসরণের নির্দেশ কোরআনে ঘোষিত হয়েছে, যাঁদের সান্নিধ্যকে আল্লাহ তা‘আলা সর্বোত্তম সঙ্গ বলে আখ্যায়িত করেছেন। আর এই পবিত্র জামাআত কেয়ামত পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে, ইসলামের অস্তিত্ব ও মর্যাদার জীবন্ত সাক্ষী হয়ে।
তাই শহাদাতের ধারণাকে আবেগ নয়, বরং কোরআন-সুন্নাহর আলোকে স্পষ্টভাবে অনুধাবন করা আজ সময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ দাবি। শহীদ হওয়ার ক্ষেত্রসমূহ, তার শর্তাবলি, প্রকারভেদ এবং শরঈ বিধান সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকলে একদিকে যেমন শহীদদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়, অন্যদিকে তেমনি দ্বীনি চিন্তায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়।
শহীদ কে
শহীদ বলা সেই ব্যক্তিকে, যাকে মুশরিকরা হত্যা করেছে; অথবা যাকে জিহাদের ময়দানে পাওয়া গেছে এবং তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে; বা যাকে কোনো মুসলমান অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে। আর উক্ত হত্যার কারণে (হত্যাকারীর উপর) দিয়াত (রক্তপণ) অপরিহার্য হয়নি। (হেদায়া, শহীদ অধ্যায়)
হযরত আবু মূসা আশ‘আরি (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “এক ব্যক্তি রাসুল (সা.) -এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করল: “কেউ যুদ্ধ করে গনীমতের জন্য, কেউ যুদ্ধ করে খ্যাতির জন্য, আবার কেউ যুদ্ধ করে নিজের বীরত্ব ও অবস্থান প্রদর্শনের জন্য, তাহলে এদের মধ্যে কে আল্লাহর পথে জিহাদকারী? উত্তরে রাসুল (সা.) বললেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর দ্বীন উচ্চ করার জন্য যুদ্ধ করবে, সেই আল্লাহর পথে জিহাদকারী।” (সহিহ বুখারি-২৮১০)
পরে এ শব্দের মর্ম আরও বিস্তৃত হয়েছে। ফলে নবি (সা.) ঐসব ব্যক্তিদেরকেও শহীদ বলে আখ্যায়িত করেছেন, যারা পেটের পীড়ায় বা পানিতে ডুবে, আগুনে পুড়ে, ধসে পড়া ভবনের নিচে চাপা পড়ে, ইত্যাদিতে কারণে মৃত্যুবরণ করে। (আন-নিহায়া, ইবনে আসির কৃত-২/৫১৩)
কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে শহীদদের ফজিলত
শাহাদাত ইসলামে কেবল একটি মৃত্যুর নাম নয়; বরং এটি এক মহান জীবন, এক অনন্য মর্যাদা এবং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বিশেষ সম্মানপ্রাপ্ত হওয়ার ঘোষণা। কোরআনুল কারিম ও হাদিসে নববিতে শহীদদের যে উচ্চ মর্যাদা ও অতুলনীয় ফজিলতের কথা বর্ণিত হয়েছে, তা অন্য কোনো শ্রেণির মানুষের ক্ষেত্রে এত ব্যাপকভাবে পাওয়া যায় না।
শহীদগণ মৃত নন, তাঁরা জীবিত: আল্লাহ তা‘আলা কোরআনে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, “যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে, তোমরা তাদের মৃত বলো না; বরং তারা জীবিত, কিন্তু তোমরা তা অনুভব করতে পারো না।” (সুরা বাকারা-১৫৪)
শহীদ মৃত্যুর যন্ত্রণা অনুভব করে না: রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, “শহীদ নিহত হওয়ার কষ্ট ততটুকুই অনুভব করে, যতটুকু তোমাদের কেউ পিঁপড়ার কামড় অনুভব করে।” (সুনানে তিরমিযি-১৬৬৮) এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে শহীদদের জন্য বিশেষ রহমত, যেন দুনিয়ার কষ্ট তাঁদের জন্য সহজ হয়ে যায়।
শহিদের স্থান জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তরে: শহীদদের জন্য জান্নাতে বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। বদর যুদ্ধের শহীদ হারিসা (রাযি.)-এর মা যখন তাঁর সন্তানের অবস্থান জানতে চাইলেন, রাসুল (সা.) বললেন, “হে হারিসার মা! জান্নাতে বহু উদ্যান রয়েছে, আর তোমার পুত্র জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ স্তরে অবস্থান করছে।” (সহিহ বুখারি-২৮০৯)
কেয়ামতের দিন শহিদের রক্ত হবে মেশকের মতো ঘ্রাণ যুক্ত: রাসুল (সা.) বলেন, “আল্লাহর পথে যে ব্যক্তি আহত হয়, সে কেয়ামতের দিন এমন অবস্থায় আসবে, তার রক্তের রং হবে রক্তের মতো, কিন্তু ঘ্রাণ হবে মিশকের মতো।” (সহিহ বুখারি-২৮০৯)
আল্লাহ তাআলা শহীদদের প্রতি সন্তুষ্ট হন: হাদিসে এসেছে, শহীদগণ যখন আল্লাহর দরবারে পৌঁছে যান, তখন আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হন এবং তাঁদেরকেও সন্তুষ্ট করে দেন। (সহিহ বুখারি-২৮১০)
শহীদ গণ্য হওয়ার জন্য যেসব শর্তের বিদ্যমানতা আবশ্যক
ফিকহে ইসলামি অনুযায়ী, প্রত্যেক নিহত ব্যক্তিকেই ‘শহীদ’ বলা যায় না। বরং শহীদ হওয়ার জন্য কিছু নির্দিষ্ট শরঈ শর্ত পূরণ হওয়া আবশ্যক। ফিকহের কিতাবাদিতে এই সব শর্ত সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, যাতে শহাদাতের মর্যাদা যথাযথভাবে সংরক্ষিত থাকে এবং ভ্রান্ত ধারণার অবসান ঘটে। নিম্মে কয়েক মৌলিক শর্ত তুলে ধরা হল।
নিহত ব্যক্তি মুসলমান হওয়া
শহীদ হওয়ার নিহত মুসলিম হওয়া একটি মৌলিক শর্ত। সুতরাং, অমুসলিম ব্যক্তি শরিয়তে শহীদ হিসেবে গণ্য হয় না।
হত্যাটি অন্যায়ভাবে সংঘটিত হওয়া
হত্যাটা জুলুম ও অন্যায়ের ভিত্তিতে হওয়া। যদি কাউকে শরঈভাবে বৈধ কারণে (যেমন: কিসাস, হদ ইত্যাদি) হত্যা করা হয়, তবে সে ব্যক্তি শহীদ হিসেবে গণ্য হবে না।
হত্যার কারণে দিয়াত অপরিহার্য না হওয়া
শহীদ হওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, নিহত হওয়ার কারণে দিয়াত বা শরিয়ত নির্ধারিত আর্থিক ক্ষতিপূরণ ওয়াজিব না হওয়া। তবে, হত্যাকাণ্ডে যদি প্রথমে কিসাস ওয়াজিব হয়, কিন্তু পরে পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে তা দিয়াতে রূপান্তরিত হয়, তাহলে তা শহাদাতের মর্যাদায় বাধা সৃষ্টি করে না। (বিনায়া শরহে হিদায়া-৩/২৬৬)
শহীদের প্রকারভেদ
ফিকহে ইসলামিতে শহীদ দুই ভাগে বিভক্ত: (১) হাকিকি শহীদ (প্রকৃত শহীদ), (২) হুকমি শহীদ (বিধানগত শহীদ)। এই বিভাজনটি হয়েছে, শহীদদের উপর দুনিয়াবি কিছু বিধান প্রয়োগকে কেন্দ্র করে।
১. হাকিকি শহীদ (প্রকৃত শহীদ): হাকিকি শহীদ তাকে বলা হয়, যার ওপর শহীদের দুনিয়াবি বিধানসমূহ প্রযোজ্য হয়। অর্থাৎ, তাকে গোসল দেওয়া হবে না, কাফন দেওয়া হবে না, বরং যে কাপড়ে সে শহীদ হয়েছে, সেই কাপড়েই জানাযা পড়ে দাফন করা হবে। যেমন, যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে গিয়ে শহীদ হয়েছে, অথবা যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারও হাতে নিহত হয়েছে, এই শর্তে যে, সে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেছে, সে চিকিৎসা গ্রহণ করেনি, কোনো ওসিয়ত করেনি, আহত হওয়ার পর মৃত্যু পর্যন্ত এক ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের সময় অতিবাহিত হয়নি। ইত্যাদি।
২. হুকমি শহীদ (বিধানগত শহীদ): হুকমি শহীদ তাকে বলা হয়, যার ব্যাপারে হাদিসে শহীদ হওয়ার সুসংবাদ এসেছে।
এ ধরনের ব্যক্তি আখিরাতে শহীদদের অন্তর্ভুক্ত হবেন, কিন্তু দুনিয়াতে তার ওপর সাধারণ মৃতের বিধানই প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ, তাকে গোসল দেওয়া হবে, কাফন দেওয়া হবে।
বিভিন্ন হাদিসে এ ধরনের শহিদের চল্লিশেরও বেশি প্রকার উল্লেখ পাওয়া যায়। এখানে সবগুলোর বিবরণ দেওয়া সম্ভব নয়। তার মধ্যে কয়েকটি হলো, পানিতে ডুবে মৃত্যু হওয়া। কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে মারা যাওয়া। কলেরা, মাহামারি, পেটের রোগ ইত্যাদিতে মৃত্যুবরণ করা। সফররত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা ইত্যাদি।
সওয়াব ও মর্যাদার দিক থেকে বিভাজন
সওয়াব ও প্রতিদানের বিবেচনায় শহীদকে হাকিকি ও হুকমি, এই দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়নি। বরং বাস্তবতা হলো, কোনো কোনো ক্ষেত্রে হুকমি শহীদ সওয়াব ও মর্যাদায় হাকিকি শহিদের সমপর্যায়ে পৌঁছে যান। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে হুকমি শহিদের মর্যাদা হাকিকি শহিদের তুলনায় কমও হতে পারে। অর্থাৎ, শহীদ হওয়ার প্রকারভেদ দুনিয়াবি বিধানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও, আখিরাতের সওয়াব ও মর্যাদা নির্ভর করে আল্লাহ তাআলার ফয়সালা ও বান্দার অবস্থার ওপর।
যেমন, যে ব্যক্তি জিহাদের ময়দানে কাফিরদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে গুরুতরভাবে আহত হন, কিন্তু মৃত্যুর আগে চিকিৎসার সুযোগ পান, তবুও তিনি সওয়াব ও মর্যাদার দিক থেকে হাকিকি শহিদের স্তরেই গণ্য হবেন। একইভাবে, কোনো ব্যক্তি যদি নিজ এলাকায় অন্যায়ভাবে হত্যার শিকার হন, আহত অবস্থায় চিকিৎসা ও খাদ্য গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে মৃত্যুবরণ করেন, তাতেও তাঁর প্রকৃত শহিদের উচ্চ মর্যাদা নষ্ট হয় না। এ ধরনের শহিদের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলেন হযরত উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও হযরত আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু), যাঁদের শাহাদাত ইতিহাসে প্রকৃত শহীদের অনন্য উদাহরণ হিসেবে স্বীকৃত।
অন্যদিকে, হুকমি শহিদের কিছু রূপ এমন রয়েছে, যেখানে সাধারণ মুসলমানদের মৃত্যুর তুলনায় বিশেষ ফজিলত থাকার কারণে তাদের শহীদ বলা হয়েছে। যেমন, প্লেগ বা মহামারিতে মৃত্যুবরণকারী, পেটের রোগে মারা যাওয়া ব্যক্তি কিংবা সন্তান প্রসবকালে প্রাণ বিসর্জন দেওয়া নারী। এসব ক্ষেত্রে শহীদ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে তাঁদের বিশেষ মর্যাদা ও ফজিলত বোঝানোর জন্য; তবে জিহাদের ময়দানে আল্লাহর দ্বীনের জন্য জীবন উৎসর্গকারী শহিদের মর্যাদার সঙ্গে সব ক্ষেত্রে একে সমান করা যায় না। শেষ পর্যন্ত আখিরাতের প্রতিদান ও মর্যাদার চূড়ান্ত ফয়সালা আল্লাহ তাআলাই করবেন।
সন্দেহ দূরিকরণ
এ কথা সুস্পষ্ট যে, কোরআন ও হাদিসে শহীদদের যে সব ফজিলত বর্ণিত হয়েছে, তার প্রেক্ষাপট ও ধারাবাহিকতা স্পষ্ট করে দেয়, এই উচ্চ মর্যাদা মূলত আল্লাহর পথে শহীদ হওয়া শহীদদের জন্য।
আর যেখানে হুকমি শহীদদের কথা এসেছে, সেখানে তাঁদের নিজ নিজ বিশেষ ফজিলতই বর্ণিত হয়েছে। অতএব, যে শহিদের ব্যাপারে যে ধরণের সওয়াব ও মর্যাদার কথা শরিয়তে এসেছে, আল্লাহর অনুগ্রহের আশায় তা তাঁর জন্য প্রত্যাশা করা হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা উল্লেখও করা যাবে।
তবে, এটিও এক বাস্তব সত্য, আল্লাহর দ্বীন রক্ষা, প্রতিরক্ষা ও সাহায্যের উদ্দেশ্যে যে ব্যক্তি নিজের জান ও মাল কুরবানি দিয়ে জিহাদের ময়দানে শহীদ হন, তাঁর মর্যাদা নিঃসন্দেহে অধিক উচ্চতর ও শ্রেষ্ঠ। তার তুলনায় প্লেগ, মহামারি বা পেটের রোগ কিংবা দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণকারীর মর্যাদা কম হতে পারে। কিন্তু প্রত্যেক শহিদের জন্য প্রত্যেক ফজিলত প্রযোজ্য হবে- এমন দাবি করা যেমন প্রয়োজন নেই, তেমনি তা প্রমাণযোগ্যও নয়। আখিরাতের চূড়ান্ত ফায়সালা ও প্রতিদান আল্লাহ তাআলার ওপরই ন্যস্ত করে দেওয়া উচিত।
উপরের আলোচনার আলোকে একটি বিষয় বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, আমাদের সমাজে ‘শহীদ’ শব্দটি বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে তা অনেক সময় শরিয়তের নির্ধারিত সীমারেখা উপেক্ষা করে প্রায় সকলের জন্যই ব্যবহার করা হচ্ছে। রাজনৈতিক আবেগ, সামাজিক সহানুভূতি কিংবা জাতিগত অনুভূতির বশবর্তী হয়ে যাঁদের মৃত্যু হয়েছে, তাঁদের সকলকেই নির্বিচারে ‘শহীদ’ আখ্যা দেওয়া হচ্ছে, যদিও শরঈ দৃষ্টিতে শহাদাতের জন্য নির্দিষ্ট শর্ত ও বিধান বিদ্যমান।
এ কথা অস্বীকার করা যায় না যে, অন্যায়ভাবে নিহত ব্যক্তি, নির্যাতনের শিকার মানুষ কিংবা জাতির জন্য আত্মত্যাগকারী অনেকেই আমাদের শ্রদ্ধা, দোয়া ও সম্মানের সর্বোচ্চ দাবিদার। কিন্তু সম্মান প্রদর্শন আর শরঈ পরিভাষা নির্ধারণ, এই দুইয়ের মাঝে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ‘শহীদ’ কোনো সাধারণ সম্মানসূচক শব্দ নয়; বরং এটি কোরআন-সুন্নাহ ও ফিকহ দ্বারা নির্ধারিত একটি বিশেষ ধর্মীয় মর্যাদা, যার সঙ্গে দুনিয়া ও আখিরাত, উভয় জগতের নির্দিষ্ট বিধান ও প্রতিদান জড়িত।
শরিয়তের সীমা অতিক্রম করে শহীদ শব্দের ব্যাপক ও অসংযত ব্যবহার একদিকে যেমন প্রকৃত শহীদদের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে, অন্যদিকে তেমনি সাধারণ মানুষের আকিদা ও দ্বীনি চিন্তায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে শহাদাতের প্রকৃত অর্থ, শর্ত ও মহত্ত্ব ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। অতএব, আমাদের দায়িত্ব হলো, আবেগ নয়, বরং ইলম ও ইনসাফের আলোকে শহীদ শব্দটি ব্যবহার করা। যেখানে শরিয়ত শহাদাতের স্বীকৃতি দিয়েছে, সেখানে তা স্পষ্টভাবে বলা; আর যেখানে দেয়নি, সেখানে সম্মান, শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি প্রকাশ করলেও শরঈ পরিভাষা প্রয়োগে সংযম অবলম্বন করা। এভাবেই আমরা একদিকে শহীদদের পবিত্র মর্যাদা সংরক্ষণ করতে পারব, অন্যদিকে সমাজকে দ্বীনি ভারসাম্য ও সঠিক বোঝাপড়ার পথে পরিচালিত করতে সক্ষম হব, ইনশাআল্লাহ।
লেখক : মুদাররিস, জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া, কামরাঙ্গিরচর, ঢাকা।

