যুক্তরাষ্ট্রে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৫, ০৯:১৪
যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ক্যারোলাইনায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ব্র্যাড সিগমনের সাজা ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে কার্যকর করা হয়েছে। ওই ব্যক্তি তার সাবেক প্রেমিকার বাবা-মাকে পিটিয়ে হত্যা করার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। গত ১৫ বছরে মধ্যে এই প্রথম মার্কিন নাগরিকের সাজা ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে কার্যকর হলো।
শুক্রবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টার কিছু পরে কারাগারের তিন স্বেচ্ছাসেবক কর্মকর্তার গুলিতে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। বিশেষভাবে ডিজাইন করা বুলেট দিয়ে তার বুকে গুলি করেন।
৬৭ বছর বয়সী সিগমন ২০০১ সালে অস্ত্রের মুখে তার সাবেক প্রেমিকাকে অপহরণের আগে প্রেমিকার বাবা-মা ডেভিড ও গ্ল্যাডিস লার্কেকে বেসবল ব্যাট দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেন। ওই সময় তার প্রেমিকা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় এবং সিগমন তাকে লক্ষ্য করে গুলিও চালান।
তিনি মৃত্যুর জন্য ইলেকট্রিক চেয়ার ও প্রাণঘাতী ইনজেকশনের পরিবর্তে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যু বেছে নেন।
দক্ষিণ ক্যারোলাইনা কারাগার বিভাগের মুখপাত্র ক্রিস্টি শেইন জানান, সিগমনকে স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৮ মিনিটে একজন চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। লার্ক পরিবারের তিন সদস্য তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সাক্ষী ছিলেন।
সাক্ষীরা জানান, সিগমনকে একটি চেয়ারে বেঁধে রাখা হয়েছিল, যার নিচে রক্ত ধরার জন্য একটি বেসিন রাখা ছিল।
শেষ বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আমি ভালোবাসার বার্তা দিতে চাই। খ্রিস্টানদের আহ্বান জানাই তারা যেন মৃত্যুদণ্ডের অবসান ঘটাতে সাহায্য করে।
তিনি আরও বলেন, ‘চোখের বদলে চোখ’ নীতিটি জুরি বোর্ডের কাছে মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। তখন আমি এতটাই অজ্ঞ ছিলাম যে বুঝতে পারিনি এটি কতটা ভুল। কারণ, আমরা তো ওল্ড টেস্টমেন্ট অনুযায়ী চলি না, বরং এখন নিউ টেস্টমেন্ট অনুযায়ী হওয়ার কথা।
তার বক্তব্য শেষ হওয়ার পর তার মাথায় একটি হুড পরানো হয়। তিনজন স্বেচ্ছাসেবকের পরিচয় গোপন রাখতে তাদের সামনে একটি পর্দা টানানো ছিল। সন্ধ্যা ৬টা ১ মিনিটে পর্দা সরানো হয়। আর ৬টা ৫ মিনিটে, কোনো কাউন্টডাউন ছাড়াই তারা ১৫ ফুট দূর থেকে গুলি করা হয়।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদক জেফরি কলিন্স জানান, সিগমনের বুকে একটি লাল রঙের নিশানা আঁকা ছিল, যেখানে গুলি করা হয়।
তিনি আরও জানান, গুলির আঘাতে সিগমনের বুক কয়েকবার উঠানামা করে। এরপর একজন চিকিৎসক প্রায় ৯০ সেকেন্ড ধরে পরীক্ষা শেষে তাকে ৬টা ৮ মিনিটে মৃত ঘোষণা করেন।
ফায়ারিং স্কোয়াডে ব্যবহৃত .৩০৮ উইনচেস্টার ট্যাপ আরবান বুলেট বিশেষভাবে ডিজাইন করা, যা শরীরে প্রবেশের পর ভেঙে গিয়ে মারাত্মক ক্ষতি করে। তবে এটা কী পরিমাণ যন্ত্রণাদায়ক সেটা নিয়ে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছেন।
ডব্লিউএইচএফএফ-টিভির প্রতিবেদক আনা ডবিন্স জানান, সিগমন কালো রংয়ের জাম্প স্যুট পরিহিত ছিলেন। আর তার হাত খোলা ছিল। গুলি লাগার পর বাহু সঙ্কুচিত হয়ে যায়।
তিনি বলেন, তার শরীরে গুলি আঘাত করতেই শরীর থেকে রক্তের ছিটা বেরিয়ে আসতে দেখেছি।
তিনটি গুলি একসঙ্গে ছোড়া হয় এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা বন্দুকের দৃশ্য দেখতে পাননি।
কারাগারের কর্মীদের মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হলে তাদের জন্য কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলে ক্রিস্টি শেইন জানান।
দণ্ড কার্যকরের আগে কারাগারের বাইরে মৃত্যুদণ্ডবিরোধী বিক্ষোভকারীরা একটি সমাবেশ করেন। তাদের প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল ‘সব জীবন মূল্যবান’ ও ‘তোমরা হত্যা করো না’ ইত্যাদি।
দক্ষিণ ক্যারোলাইনা ২০২৩ সালে একটি আইন পাশ করে, যাতে ফায়ারিং স্কোয়াডে অংশ নেওয়া সদস্যদের পরিচয় গোপন রাখা হয়।
শেষ মুহূর্তের আবেদন ও শেষ খাবার
সিগমনের আইনজীবী বো কিং আশা করেছিলেন শেষ মুহূর্তে দক্ষিণ ক্যারোলাইনার গভর্নর দণ্ড স্থগিত করবেন। তিনি রাজ্যের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী ইনজেকশনের বিষয়ে তথ্য গোপন করার অভিযোগ তুলেছিলেন।
মৃত্যুর পর দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘ব্র্যাড শুধু নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন যে মৃত্যুর জন্য ব্যবহৃত ওষুধগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ, নষ্ট বা দূষিত নয় —এটা জানার অধিকার যে কারও থাকা উচিত। চাইলেই হোক খাবার বা ওষুধের ক্ষেত্রে, আর এটি তো মৃত্যুর মতো গুরুতর ব্যাপার।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটি অকল্পনীয় যে ২০২৫ সালে এসে দক্ষিণ ক্যারোলাইনা এমন এক রক্তাক্ত দৃশ্যের মধ্য দিয়ে নিজের নাগরিককে মৃত্যুদণ্ড দিল।’
কিং বলেন, ব্র্যাড তার শেষ খাবারে তিন বালতি কেন্টাকি ফ্রাইড চিকেন চেয়েছিলেন, যাতে তিনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্যান্য বন্দিদের সঙ্গে ভাগ করে খেতে পারেন। কিন্তু তার সে অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা হয়।
পরে কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেন যে সিগমনের শেষ খাবার ছিল চার টুকরো ভাজা মুরগি, সবুজ শিম, গ্রেভি দেওয়া ম্যাশড পটেটো, বিস্কুট, চিজকেক ও মিষ্টি চা। তাকে বুধবার সন্ধ্যায় এই খাবার পরিবেশন করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭৭ সালের পর থেকে মাত্র তিনজন বন্দির ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে এবং তারা সবাই ছিলেন উটাহ রাজ্যের। সর্বশেষ ২০১০ সালে রনি লি গার্ডনারকে এই পদ্ধতিতে হত্যা করা হয়।
ওএফ

