Logo

আন্তর্জাতিক

দাবি ভারতের

পাহেলগাঁও হামলার পেছনে লস্কর-ই-তৈয়বা

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৫, ১৪:৫৬

অ
পাহেলগাঁও হামলার পেছনে লস্কর-ই-তৈয়বা

ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের পাহেলগাঁওয়ে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ হামলায় ২৬ জনের প্রাণহানির ঘটনায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় একটি জঙ্গি গোষ্ঠীর কার্যক্রম। কাশ্মীরে ২০১৯ সালের ৩৭০ ধারা বাতিলের পর এটিই ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা।

এই হামলার পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা বিষয়ক একাধিক কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে ভারত সরকার। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ— এই জঙ্গি গোষ্ঠীর সংগঠক ও মদতদাতাদের আশ্রয় দিয়েছে তারা।

এই হামলা চালিয়েছে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার সঙ্গে যুক্ত এক সুসংগঠিত চক্র, যার সদস্যদের বেশিরভাগই ভারতের বাইরের। এদের সঙ্গে ছিল স্থানীয় কিছু সন্ত্রাসী যারা এই উপত্যকার বাসিন্দা। আর পুরো দলটি পরিচালিত হচ্ছিল ২৬/১১ মুম্বাই হামলার মাস্টারমাইন্ড ও লস্কর প্রধান হাফিজ সাঈদের নির্দেশনায়।

অতীতে এই চক্রের কার্যকলাপ
সূত্র মতে, কাশ্মীর উপত্যকায় এই বিশেষ জঙ্গি গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর বিশ্বাস, সোনামার্গ, বুটা পাত্থরি ও গান্দেরবালের মতো অঞ্চলে একাধিক বড় হামলার পেছনে এদেরই হাত ছিল।

২০২৪ সালের অক্টোবরে বুটা পাত্থরিতে এক সন্ত্রাসী হামলায় দুই সেনাসহ চারজন নিহত হন। একই মাসে সোনামার্গে টানেল নির্মাণকর্মীদের উপর ভয়াবহ হামলায় ছয়জন শ্রমিক ও একজন চিকিৎসককে গুলি করে হত্যা করা হয়।

পহেলগাঁও হত্যাকাণ্ডের অন্যতম অভিযুক্ত হাশিম মুসাকে এই হামলারও সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করেছে গোয়েন্দারা।

সোনামার্গ হত্যাকাণ্ডের পর ওই চক্রের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য কুলগামের বাসিন্দা জুনাইদ আহমেদ ভাট— একজন ‘A+’ শ্রেণিভুক্ত লস্কর সদস্য ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ডাচিগামে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত হন। দলের অন্যান্য সদস্যরা কাছাকাছি গভীর বনে পালিয়ে যায়।

নিরাপত্তা সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বড় কোনো হামলার পর এই জঙ্গিরা সাধারণত গভীর জঙ্গলে আত্মগোপন করেন। পাকিস্তানে থাকা তাদের সংগঠকদের কাছ থেকে নতুন নির্দেশ না আসা পর্যন্ত এরা প্রকাশ্যে আসে না।

এই চক্রের পুনঃসক্রিয়তা ও পাহেলগাঁওয়ে তাদের নৃশংস হামলা ভারতের জন্য নতুন করে বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

লস্কর নেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ
পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার প্রধান হাফিজ সাঈদ ও তার ডেপুটি সাইফুল্লাহ সরাসরি পাহেলগাঁও হামলার পেছনে থাকা সন্ত্রাসী চক্রটি পরিচালনা করছে বলে দাবি ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর। ভারতের নিরাপত্তা সংস্থার মতে, এই চক্র শুধু মতাদর্শগত নয়, কৌশলগত এবং রসদ-সংক্রান্ত সহায়তাও পাচ্ছে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের কাছ থেকে।

চক্রটির সদস্যদের বড় অংশ বিদেশি হলেও, উপত্যকার বেশ কিছু স্থানীয় বাসিন্দা ও গোপনকর্মী এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হয়ে কাজ করেন। এ ক্ষেত্রে স্থানীয়দের মূল দায়িত্ব— গোপন আশ্রয় দেওয়া, নজরদারি এড়িয়ে চলার পথ দেখানো ও হামলার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তার জোগান দেওয়া।

পহেলগাঁও হামলার ভয়াবহতা
জঙ্গিরা বৈসরন উপত্যকায় তিনটি আলাদা জায়গায় হামলা চালায়। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, একটি জায়গায় একসঙ্গে পাঁচজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়, আরেক জায়গায় একটি খোলা মাঠে দু’জনকে হত্যা করা হয়। বাকিদের টার্গেট করা হয় উপত্যকার চারপাশে থাকা বেড়ার আশপাশে। যারা বেড়া টপকে পালাতে পেরেছিল, তারা প্রাণে বেঁচে যান।

হামলা থেকে বেঁচে ফেরা প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা গুলি চালানোর আগে সংক্ষিপ্ত কথোপকথনও করেছিল। যা এই হামলার পেছনে ঠান্ডা মাথার পরিকল্পনা ও নির্মমতা আরও স্পষ্ট করে দেয়।

বৃহস্পতিবার জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ পাহেলগাঁও হামলার সঙ্গে যুক্ত তিন সন্দেহভাজনের স্কেচ প্রকাশ করেছে। তাদের মধ্যে দুজন পাকিস্তানি নাগরিক— হাশিম মুসা ওরফে সুলেমান ও আলি ভাই ওরফে তালহা ভাই। তৃতীয় ব্যক্তি আব্দুল হুসেন ঠোকার কাশ্মীরের অনন্তনাগ জেলার বাসিন্দা।

তাদের ধরিয়ে দিতে বা গ্রেপ্তারে সাহায্যকারী তথ্যের জন্য পুলিশ ২০ লাখ টাকার পুরস্কার ঘোষণা করেছে।

বৃহস্পতিবার নিরাপত্তা বাহিনী বৈসরন উপত্যকার কাছাকাছি জঙ্গল এলাকা থেকে ওই জঙ্গি চক্রের একটি গোপন আস্তানার খোঁজ পায়। এই আস্তানাটি সম্ভবত হামলার আগে পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছে।

কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সভাপতিত্বে বুধবার জরুরি বৈঠকে বসে ক্যাবিনেট কমিটি অন সিকিউরিটি (সিসিএস)। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল এবং সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা। এই বৈঠকে একাধিক প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের ঘোষণা করা হয়।

ভারত ১৯৬০ সালের সিন্ধু পানিবণ্টন চুক্তি স্থগিত করেছে। ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশ তাদের কূটনৈতিক মিশনের কর্মী সংখ্যা ৫৫ থেকে কমিয়ে ৩০ জনে নামিয়ে আনবে, যা ১ মে থেকে কার্যকর হবে। দিল্লিতে পাকিস্তান হাইকমিশনে নিযুক্ত সব সামরিক, নৌ ও বিমান প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত কর্মীদের ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ (অবাঞ্ছিত ব্যক্তি) ঘোষণা করে এক সপ্তাহের মধ্যে ভারত ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে, ইসলামাবাদে নিযুক্ত ভারতীয় উপদেষ্টাদেরও প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে।

পাকিস্তানি নাগরিকদের জন্য সার্ক ভিসা ছাড় স্কিম স্থগিত করা হয়েছে এবং এর আওতায় আগে দেওয়া সব ভিসা বাতিল করা হয়েছে। এই স্কিমের অধীনে ভারতে অবস্থানরত সব পাকিস্তানিকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আটারি-ওয়াঘা স্থলসীমান্ত চেকপোস্ট অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ভারতে অবস্থানরত পাকিস্তানিদের ১ মের মধ্যে ফিরে যেতে বলা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার দিল্লির চাণক্যপুরীর কূটনৈতিক এলাকায় অবস্থিত পাকিস্তান হাইকমিশনের সামনে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখা দেয়। ভিড় সামাল দিতে বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়। জম্মু-কাশ্মীরসহ দেশের অন্যান্য রাজ্যেও হামলার নিন্দায় প্রতিবাদ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।

ওএফ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন