Logo

আন্তর্জাতিক

সিন্ধুর পানি পাকিস্তান যাবে না! ভারত কি আদৌ এতো ক্ষমতা রাখে?

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৫, ১৭:৪৭

অ
সিন্ধুর পানি পাকিস্তান যাবে না! ভারত কি আদৌ এতো ক্ষমতা রাখে?

কাশ্মীরের ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর পাকিস্তানকে দায়ী করে সিন্ধু পানিবণ্টন চুক্তি স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে ভারত। দুই দেশের মধ্যে ছয়টি নদীর পানি ভাগাভাগি নিয়ে হওয়া এই গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সাময়িকভাবে স্থগিতের ঘোষণায় এই প্রশ্ন এখন অনেকের মনেই ঘুরপাক খাচ্ছে যে ভারত কি সত্যি সিন্ধু অববাহিকার পানি পাকিস্তানে বন্ধ করতে পারবে?

১৯৬০ সালের সিন্ধু পানিবণ্টন চুক্তি পারমাণবিক শক্তিধর দুই দেশের মধ্যে তিনটি যুদ্ধের পরেও বহাল ছিল। যা সীমান্তবর্তী নদীর পানি ভাগাভাগির ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে এক বিরল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতো।

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের নেওয়া একাধিক পাল্টা পদক্ষেপের অংশ হিসেবে এই চুক্তি স্থগিত করা হলো। দিল্লির অভিযোগ—  সীমান্তে সন্ত্রাসবাদে মদত দিচ্ছে পাকিস্তান। যদিও ইসলামাবাদ এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে।

পাকিস্তানও পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে। দেশটি হুঁশিয়ারি দিয়েছে, পানি বন্ধ করে দেওয়া হলে সেটিকে ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

চুক্তি অনুযায়ী, সিন্ধু অববাহিকার তিনটি পূর্বাঞ্চলীয় নদী — রবি, বিয়াস ও শতদ্রু ভারতের জন্য বরাদ্দ। আর তিনটি পশ্চিমাঞ্চলীয় নদী— সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাব এর প্রায় ৮০ শতাংশ পানি পাকিস্তান পাবে।

এর আগে, বিভিন্ন সময়ে ভারতের কিছু পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প ও পানিসংক্রান্ত অবকাঠামোর বিরোধিতা করে পাকিস্তান দাবি করেছে, এসব প্রকল্প নদীর প্রবাহ কমাবে এবং চুক্তির লঙ্ঘন ঘটাবে। 

উল্লেখ্য, পাকিস্তানের ৮০ শতাংশ কৃষিকাজ এবং প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জলবিদ্যুৎ উৎপাদন সিন্ধু অববাহিকার পানির ওপর নির্ভরশীল।

ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা চরমে
মঙ্গলবারের হামলার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক নতুন করে তীব্র উত্তেজনায় পৌঁছেছে। ভারত বহু বছর ধরে এই চুক্তির পর্যালোচনা ও সংশোধনের চেষ্টা করে আসছে। দেশের সেচ, পানি ও জলবিদ্যুতের মতো ক্ষেত্রে—আর জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলোও চাপে ফেলেছে।

এই চুক্তি, যা বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষর হয়েছিল, এর আওতায় দুই দেশই বিভিন্ন আইনি পথে একে অপরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে।

তবে এই প্রথমবার কোনো পক্ষ সরাসরি চুক্তি ‘স্থগিত’ করার ঘোষণা দিল। এটি করেছে ভারত, যে কিনা ভৌগোলিকভাবে ‘উজানে’ অবস্থান করছে, যার ফলে একটি প্রাকৃতিক সুবিধা রয়েছে।

চুক্তি স্থগিতের প্রকৃত অর্থ কী?
ভারত কি সত্যিই সিন্ধু অববাহিকার পানি আটকে রাখতে পারবে? পাকিস্তান কি তার জীবনরেখা হারাবে? ভারত কি আদৌ এতো ক্ষমতা রাখে?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষাকালে পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোর বিপুল পানিপ্রবাহের সময় ভারত বাস্তবিক অর্থেই সেই পানি আটকে রাখতে পারবে না। ভারতের বিশাল জলাধার কিংবা বিশাল নালা ব্যবস্থা নেই; যা দিয়ে এত পানি মোড় ঘুরিয়ে অন্য দিক দিকে নেওয়া যাবে।

দক্ষিণ এশীয় বাঁধ, নদী ও পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ হিমাংশু ঠাক্কার বিবিসিকে বলেন, ভারতের কাছে যে অবকাঠামো আছে, সেগুলো মূলত ‘রান-অফ-দ্য-রিভার’ ধরনের জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, যেগুলোতে বড় জলাধার প্রয়োজন হয় না। 

তিনি বলেন, এ ধরনের জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র শুধু প্রবাহমান পানির গতি কাজে লাগিয়ে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি করে, ফলে বিশাল পানি জমিয়ে রাখার প্রয়োজন পড়ে না।

ভারতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমনকি ভারতের জন্য বরাদ্দ থাকা ২০ শতাংশ ঝিলম, চেনাব ও সিন্ধু নদীর পানিও পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারেনি ভারত। যার অন্যতম কারণ হলো পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব। তাই ভারতীয়রা বরাবরই যুক্তি দিয়ে এসেছে—জলাধার বানানোর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। যদিও পাকিস্তান সেটা চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগে বিরোধিতা করে।

এখন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত চাইলে তার বিদ্যমান অবকাঠামো সংশোধন করে কিংবা নতুন কাঠামো নির্মাণ করে আরও পানি আটকে রাখতে বা মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। এখন আর সে তথ্য পাকিস্তানকে জানাতে হবে না।

হিমাংশু বলেন, আগে ভারতের কোনো প্রকল্প থাকলে তার নথিপত্র পাকিস্তানকে দিতে হতো। এখন সেটা আর বাধ্যতামূলক নয়।

তবে সমস্যাও রয়েছে
ভারতের জলাধারগুলো পাকিস্তান সীমান্ত থেকে অনেক দূরে। এছাড়া দুর্গম পার্বত্য এলাকা ও দেশের মধ্যেই বিভিন্ন আন্দোলনের কারণে সিন্ধু অববাহিকায় কাঠামো নির্মাণ তেমন গতি পায়নি।

২০১৬ সালে কাশ্মীরে এক জঙ্গি হামলার পর, ভারতীয় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বিবিসিকে বলেছিলেন যে তারা দ্রুত কয়েকটি বাঁধ ও জলাধার প্রকল্পের নির্মাণ সম্পন্ন করবে।

তবে এসব প্রকল্পের অগ্রগতির বিষয়ে সরকারি তথ্য পাওয়া যায়নি। সূত্র বলছে, কাজের গতি খুবই ধীর।

কিছু বিশেষজ্ঞ বলছেন, ভারতে যদি বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে ভবিষ্যতের জন্য পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ শুরু করে, তাহলে শুষ্ক মৌসুমে পাকিস্তানে এর প্রভাব পড়তে পারে।

টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও পরিবেশনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. হাসান এফ খান পাকিস্তানের ডন পত্রিকায় লিখেছেন, শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে যায়, তখন জলাধারের গুরুত্ব বাড়ে। আর সময়মতো পানি ছাড়ার বিষয়টি হয়ে ওঠে সংকটময়। সেই সময়ই এই চুক্তি না থাকার বাস্তব ক্ষতির চেহারা প্রকট হয়ে উঠবে।

চুক্তি নিয়ে ভারতের বাধ্যবাধকতা
এই চুক্তি অনুযায়ী, ভারতকে পাকিস্তানের সঙ্গে হাইড্রোলজিক্যাল (জলপ্রবাহ সম্পর্কিত) তথ্য জানাতে হতো — যা বন্যার পূর্বাভাস, সেচ, জলবিদ্যুৎ ও পানীয় জলের ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতের প্রাক্তন আডব্লিউটি কমিশনার প্রদীপ কুমার সাক্সেনা প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়াকে বলেছেন, এখন ভারত চাইলে পাকিস্তানের সঙ্গে এসব তথ্য না দেওয়ার করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

এলাকায় বর্ষাকালে প্রায়ই বিধ্বংসী বন্যা দেখা যায়, যা জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। তবে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ বলছে, ভারত আগে থেকেই অপ্রতুল তথ্য দিয়ে আসছিল।

পাকিস্তানের সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার সিরাজ মেমন বিবিসি উর্দুকে বলেন, এই ঘোষণা দেওয়ার আগে থেকেই ভারত বেশি তথ্য দিত না। আগে মোটামুটি ৪০ শতাংশ তথ্য দিত।

প্রতিবার যখন এ অঞ্চলে পানি নিয়ে উত্তেজনা বাড়ে, তখনই প্রশ্ন ওঠে—উজান দেশের পক্ষে কি পানিকে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব?

এটিকে অনেক সময় ‘ওয়াটার বোম্ব’ বলা হয়। যেখানে উজান দেশ হঠাৎ করে পানি আটকে রেখে পরে একসাথে ছেড়ে দেয়, যাতে নিচের দিকে ভয়াবহ বন্যা হয়। ভারত কি তা করতে পারবে?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত যদি এটা করে তবে প্রথমেই তার নিজস্ব এলাকা প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। কারণ বাঁধগুলো পাকিস্তান সীমান্ত থেকে অনেক দূরে।

তবে ভারত এখন স্রোতের সঙ্গেই জমা হওয়া পলি হঠাৎ করে ছেড়ে দিতে পারবে— যা পাকিস্তানে ক্ষতি করতে পারে।

হিমালয় থেকে উৎপন্ন নদীগুলোতে পলির পরিমাণ অনেক বেশি থাকে যা বাঁধে ও ব্যারাজে জমা হয়। হঠাৎ করে এগুলো ছেড়ে দিলে নিচের এলাকায় বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে।

আরও বড় চিত্রটি কী বলছে
ভারত যেমন পাকিস্তানের উজানে অবস্থান করে, তেমনি ভারত নিজেও চীনের নিচে পড়ে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায়। সিন্ধু নদীর উৎসও আবার তিব্বতে।

২০১৬ সালে কাশ্মীরে জঙ্গি হামলার পর ভারত বলেছিল, ‘রক্ত ও পানি একসঙ্গে প্রবাহিত হতে পারে না।’ এরপর চীন ব্রহ্মপুত্র নদীর একটি উপনদী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের আওতায় বন্ধ করে দেয়।

তিব্বতে একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের পর চীন এখন ইয়ারলুং সাংপো নদীতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। যা ভারত ও বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্র নদী নামে পরিচিত।

বেইজিং বলছে, এতে পরিবেশগত ক্ষতি হবে না। তবে ভারত আশঙ্কা করছে, এতে চীন নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের অতিরিক্ত ক্ষমতা পেয়ে যাবে।

ওএফ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন