যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার সংকুচিত বাস্তবতা প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের জীবনকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করছে। তেমনই একজন হচ্ছেন ২৮ বছর বয়সী মারওয়া ঈদ, যিনি বর্তমানে চর্মরোগ, অপুষ্টি ও ওষুধের অভাবে নিদারুণ কষ্টের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
২০২৩ সালের ১৩ অক্টোবরের পর থেকে মারওয়া দুইবার জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। পরিবারের সঙ্গে গাজার উত্তরাঞ্চল থেকে সরতে হয়। এই দীর্ঘ বাস্তুচ্যুতির যাত্রা ও অমানবিক পরিবেশ তার শরীরে ও মনে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
দীর্ঘ অবরোধ ও অনিরাপদ জীবনের কারণে মারওয়া এখন মারাত্মক একজিমায় আক্রান্ত। যুদ্ধের কারণে গাজায় মানসম্মত সামগ্রী প্রবেশ নিষিদ্ধ হওয়ায় তাকে স্থানীয়ভাবে তৈরি অনিরাপদ ডিটারজেন্ট ব্যবহার করতে হয়েছে। এতে তার হাতের চামড়ায় তীব্র জ্বালা, চুলকানি ও রক্তক্ষরণ শুরু হয়। পচন ধরেছে চামড়ায়।
২০২৪ সালের মে মাসে রোগের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলে তা সাধারণ অ্যালার্জি বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী দিনগুলোতে হাত ফেটে রক্ত পড়তে থাকে এবং অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে।
ইউএনআডব্লিউএ পরিচালিত একটি চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসক তার হাত দেখে বলেন, ‘এটা গুরুতর একজিমা। এই ওষুধের মজুদ শেষ হয়ে গেছে। আপাতত শুধু ব্যথানাশক দিতে পারি।’
পরে মারওয়া স্থানীয় একটি ফার্মেসিতে যান, কিন্তু ওষুধ থাকলেও তা কেনার মতো সামর্থ তার ছিল না। ফলে তাকে খালি হাতেই ফিরে আসতে হয়।
মারওয়া তার পরিবারের এক সক্রিয় সদস্য ছিলেন। বিশেষ করে গ্যাস সংকটে মাটির চুলায় রান্নার সময় তিনি মাকে সহযোগিতা করতেন। এখন ব্যথায় কাতর শরীর নিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠতেই পারেন না।
তার মানসিক অবস্থারও দ্রুত অবনতি ঘটছে। এক সময়ের কর্মঠ তরুণী এখন অন্যদের সহায়তা ছাড়া চলতেই পারছেন না।
২০২৫ সালের ১০ এপ্রিল গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, ৩৭ শতাংশ জরুরি ওষুধ ও ৫৯ শতাংশ চিকিৎসা সামগ্রী ফুরিয়ে গেছে। হাসপাতালগুলোর অপারেশন থিয়েটার, আইসিইউ ও জরুরি বিভাগে কার্যত অচলাবস্থা চলছে।
মারওয়ার মতো অসংখ্য মানুষ ওষুধের অভাবে কষ্ট পাচ্ছেন, অনেকেই চিরতরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
মারওয়া ঈদ শুধু একজন ব্যক্তি নন—তিনি গাজার লাখো মানুষের দুর্দশার প্রতীক। চিকিৎসার অভাব, মানবিক সহায়তা বন্ধ, খাদ্য ও ওষুধ প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা—সব মিলিয়ে প্রতিদিনই এখানে প্রাণঘাতী সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।
মারওয়ার ভাই বলেন, ‘প্রতিদিন রাতে আমি দেখি, আমার বোন ঘুমাতে পারছে না। হাত ফেটে রক্ত পড়ছে। সে শুধু কাঁদছে। আমি নিজেকে প্রশ্ন করি—শুধু গাজায় জন্মানোর কারণেই কি আমাদের এমন শাস্তি পেতে হবে?’
মারওয়ার কাহিনী গাজার দেয়াল ছাড়িয়ে গোটা বিশ্বের কাছে একটি আর্তনাদ। এটি কেবল ব্যক্তিগত বেদনার গল্প নয়, এটি গাজাবাসীর আহ্বান— মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে দিন, সীমান্ত খুলুন, ওষুধ প্রবেশ করতে দিন, যুদ্ধ থামান।
ওএফ

