Logo

আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্র-চীন সমঝোতা

বিশ্ব বাণিজ্যযুদ্ধে ৯০ দিনের বিরতি, শেয়ারবাজারে উল্লম্ফন

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৫, ০৯:৪১

অ
বিশ্ব বাণিজ্যযুদ্ধে ৯০ দিনের বিরতি, শেয়ারবাজারে উল্লম্ফন

বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে চলমান বাণিজ্যযুদ্ধ আপাতত ৯০ দিনের জন্য স্থগিত /ছবি : সংগৃহীত

বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে চলমান বাণিজ্যযুদ্ধ আপাতত ৯০ দিনের জন্য স্থগিত হওয়ায় সোমবার বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে বড় উল্লম্ফন দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বিপুল হারে আরোপিত শুল্ক হ্রাস করতে সম্মত হওয়ায়, দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বমন্দার আশঙ্কায় থাকা বাজারে স্বস্তি ফিরেছে।

তবে এই সাময়িক বিরতি মূল সমস্যাগুলোর সমাধান দেয়নি—যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি বা চীন থেকে আসা ফেন্টানিল সমস্যার সমাধানে আরও পদক্ষেপের দাবিতে ট্রাম্প প্রশাসনের চাপ।

চুক্তি অনুযায়ী, আগামী তিন মাসের জন্য যুক্তরাষ্ট্র গত মাসে চীনা পণ্যের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত শুল্ক ১৪৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩০ শতাংশ করবে। চীনও যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে তাদের ১২৫ শতাংশ শুল্ক কমিয়ে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনবে।

এছাড়া চীন ২ এপ্রিলের পর যেসব পাল্টা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল—যার মধ্যে রয়েছে বিরল খনিজ ও প্রযুক্তি শিল্পে ব্যবহৃত চুম্বক পদার্থ—সেগুলোও প্রত্যাহার করবে বলে জানিয়েছে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার।

দুই দেশের মধ্যে প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য এই বিরোধে স্থবির হয়ে পড়েছিল, যার প্রভাব পড়েছে সরবরাহ ব্যবস্থায়। এতে বহু মানুষের কর্মসংস্থান হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এ অবস্থায় সোমবার শেয়ারবাজারে ব্যাপক উত্থান দেখা যায়। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ৩ মার্চের পর সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছায়, আর প্রযুক্তি খাতনির্ভর নাসডাক ফেব্রুয়ারির পর সর্বোচ্চ অবস্থানে দিন শেষ করে।

ডলার শক্তিশালী হলেও নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত স্বর্ণের দাম কমেছে। যদিও পুরোপুরি নয়, তবে বাণিজ্যযুদ্ধ থেকে অর্থনৈতিক ধসের আশঙ্কা কিছুটা প্রশমিত হয়েছে।

হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ‘তারা চীনকে পুরোপুরি উন্মুক্ত করতে রাজি হয়েছে। এটি চীনের জন্য ভালো হবে, আমাদের জন্য ভালো হবে এবং শান্তির জন্যও দারুণ হবে।’

তবে এখনো স্পষ্ট নয়, যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন খাতকে ধ্বংস করে দেওয়া দীর্ঘদিনের বাণিজ্য বৈষম্যগুলোর সমাধান আদৌ হবে কিনা। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট নিজেই স্বীকার করেছেন, এই সম্পর্ক পুনর্গঠনে বহু বছর সময় লাগবে।

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম তাদের আগের প্রতিরোধমূলক অবস্থান থেকে সরে এসে বলছে, চীন তাদের মূলনীতি বজায় রেখেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও সহযোগিতার পথ খুলেছে। চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত টিভি সিসিটিভির ভাষায়, ‘চীন-যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তি গভীর ও সম্ভাবনা বিশাল।’

২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প তার প্রচারণায় অন্যায্য বাণিজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশীলতা পুনরুজ্জীবনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যা শিল্পোৎপাদন হারানো রাজ্যগুলোর শ্রমজীবী মানুষকে আকৃষ্ট করেছিল। তবে চীনের ওপর শুল্ক চাপানোর কারণে ছোট ব্যবসা, পরিবহন খাত ও ভোক্তাদের মধ্যে ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কায় অনেকেই উদ্বিগ্ন ছিলেন।

ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের চীন বিশেষজ্ঞ স্কট কেনেডি বলেন, ‘এটা চীনের নয়, বরং পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পিছু হটা। যুক্তরাষ্ট্রই বাণিজ্যযুদ্ধের সূচনা ও উত্তেজনা বাড়িয়েছে।’

তবে সাবেক ট্রাম্প উপদেষ্টা ও আইনজীবী কেলি অ্যান শ এবং বলেন, প্রেসিডেন্ট তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করছেন। এটি বাণিজ্য সম্পর্কের বৈষম্য সমাধানেরই অংশ।’ যদিও তিনি স্বীকার করেন, ৯০ দিন খুব অল্প সময় এমন জটিল বিষয়ে কার্যকর অগ্রগতির জন্য।

অনিয়মিত কৌশলে উদ্বিগ্ন বিশ্ববাজার
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে ট্রাম্প সারা বিশ্বের দেশগুলোর ওপর বিভিন্ন ধরনের শুল্ক চাপান, বিশেষ করে চীনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। তবে এই পদক্ষেপ বাজারে উদ্বেগ সৃষ্টি করে এবং গত মাসে ট্রাম্প বেশিরভাগ দেশের ওপর আরোপিত শুল্ক স্থগিত করলেও চীনের ক্ষেত্রে তা বজায় রাখেন।

ট্রাম্পের এমন অনিয়মিত নীতি বিনিয়োগকারীদের দ্বিধায় ফেলেছে এবং দেশজুড়ে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কায় তার জনসমর্থনও কমেছে। চীনা পণ্যের ওপর আগের মেয়াদে আরোপিত ২৫ শতাংশ শুল্ক বহালই থাকছে। একইসঙ্গে, সাবেক প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সময় দেয়া বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর ১০০ শতাংশ ও সৌর পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্কও বহাল থাকবে।

মার্কিন খুচরা ব্যবসায়ীরা ৩০ শতাংশ শুল্ককে মূল্যবৃদ্ধির জন্য হুমকি হিসেবে দেখলেও আপাতত ‘অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ’ নীতি গ্রহণ করছে বলে জানান লস অ্যাঞ্জেলেস বন্দরের নির্বাহী পরিচালক জিন সিরোকা।

তবে চুক্তিতে ‘ডি মিনিমিস’ (কমমূল্যের ই-কমার্স পণ্য) শুল্কমুক্ত সুবিধা পুনর্বহাল হয়নি, যা ট্রাম্প প্রশাসন ২ মে বাতিল করেছিল।

এরপরও অনেক বিশ্লেষকের চেয়ে বড় হারে শুল্ক হ্রাস করা হয়েছে। গত সপ্তাহেই ট্রাম্প ৮০ শতাংশ শুল্কের প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

শিপিং খাতের নেতারা বলছেন, এই সাময়িক শুল্ক হ্রাসে অনেক প্রতিষ্ঠান আবার পণ্য চালান শুরু করতে পারে। তবে অনিশ্চয়তার কারণে অনেকেই পুরোপুরি অর্ডার বাড়াতে চাইবে না।

শিকাগোর পারিবারিক মালিকানাধীন অ্যাবট ইলেকট্রনিক্সের সহ-সভাপতি মাইক অ্যাবট বলেন, ‘সবারই একটাই চাওয়া—স্থিতিশীলতা। কিন্তু এটি এতটাই পরিবর্তনশীল যে বোঝা মুশকিল ঠিক কী করতে হবে। যেন বোর্ড গেমের মতো—‘রিস্ক’ খেলছেন, কিন্তু নিশ্চিত উত্তর নেই।’

এই সাময়িক চুক্তি মার্কিন প্রশাসনের মধ্যেও বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে অর্থমন্ত্রী বেসেন্টের জন্য। তিনি আগে থেকেই ৯০ দিনের বিরতির পক্ষে ছিলেন। জেনেভায় চুক্তির পর তিনি বলেন, ‘উভয়পক্ষ একমত যে বিচ্ছিন্নতা কেউ চায় না। আমরা ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্য চাই, এবং সেটিই অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করছি।’

ওএফ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন