কাশ্মীর নিয়ে ট্রাম্পের ঘোষণায় বিপাকে নয়াদিল্লি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৫, ১২:৩৪
কাশ্মীর নিয়ে ট্রাম্পের ঘোষণায় বিপাকে নয়াদিল্লি /ছবি : সংগৃহীত
দীর্ঘ দশক ধরে ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতির একটি অঘোষিত নিয়ম ছিল— কাশ্মীর ইস্যুতে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অথচ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই নিষিদ্ধ অঞ্চলে হঠাৎ হস্তক্ষেপ করে দিল্লিকে চাপে ফেলেছেন।
শনিবার এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, চার দিন ধরে চলা সীমান্ত সংঘর্ষের পর ভারত ও পাকিস্তান পূর্ণ ও তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সম্ভব হয়েছে।
পরবর্তী এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, আমি দুই দেশের সঙ্গে কাজ করব, যদি হাজার বছরের বিরোধের অবসান ঘটিয়ে কাশ্মীর ইস্যুর সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হয়।
কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তান বিরোধের সূচনা ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতা লাভের সময়। উভয় দেশই কাশ্মীরকে নিজেদের অংশ দাবি করে, কিন্তু আংশিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। বহুবার দ্বিপক্ষীয় আলোচনার চেষ্টা হলেও কোনো স্থায়ী সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
ভারতের অবস্থান সবসময়ই স্পষ্ট— কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং এতে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে ২০১৯ সালে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর এই অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে।
ট্রাম্পের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে কূটনৈতিক মহলে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও-ও এক বিবৃতিতে জানান, দুই দেশ একটি নিরপেক্ষ স্থানে আলোচনা শুরু করতেও সম্মত হয়েছে।
এই ঘোষণায় বিস্মিত হয়েছে দিল্লি। কারণ, ভারত এখন পর্যন্ত পাকিস্তানের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা পুনরায় শুরুর আগ্রহ দেখায়নি। বরং ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ তুলে আলোচনা বন্ধ রেখেছে।
ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শ্যাম শ্যারন বিবিসিকে বলেন, এটি ভারতের বহুদিনের অবস্থানের পরিপন্থী। তাই স্বাভাবিকভাবেই এই ঘোষণা ভারত স্বাগত জানাবে না।
ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস ট্রাম্পের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সরকারের ব্যাখ্যা দাবি করেছে। দলটির মুখপাত্র জয়রাম রমেশ বলেন, আমরা জানতে চাই, ভারত কি তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায় রাজি হয়েছে? আমরা কি আবার পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সংলাপ চালু করছি?
এদিকে ইসলামাবাদ থেকে ভিন্ন সুরে প্রতিক্রিয়া এসেছে। পাকিস্তানের গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ-এর নির্বাহী পরিচালক ইমতিয়াজ গুল বলেন, দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার অভাবে পাকিস্তান বরাবরই তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা চায়। এখন যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে এসেছে, এটি পাকিস্তানের জন্য নৈতিক বিজয়।
পাকিস্তানের কৌশলগত বিশ্লেষক সৈয়দ মুহাম্মদ আলী বলেন, ভারতের অনড় অবস্থানের কারণেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এগিয়ে আসা জরুরি হয়ে পড়েছে। কাশ্মীর একটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ইস্যু। সাম্প্রতিক উত্তেজনাই প্রমাণ করে, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
নরেন্দ্র মোদির সরকার এখন কঠিন কূটনৈতিক সমীকরণে পড়েছে। একদিকে তারা ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে চাইবে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারের দিকেও নজর রাখতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। ২০২৪ সালে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩০ বিলিয়ন ডলার। সেইসঙ্গে ভারতের সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনাও চলছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দিল্লির উচিত হবে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপকে একটি সীমিত যুদ্ধবিরতির ‘বুঝাপড়া’ হিসেবে চিহ্নিত করা, যাতে এটি আলোচনার দ্বার উন্মুক্ত না করে।
ওএফ

