গাজায় ইসরায়েলি বর্বরতা, চোখ খুলছে পশ্চিমা গণমাধ্যমের
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ মে ২০২৫, ০৯:০৮
বিগত কয়েক দশক ধরে পশ্চিমা গণমাধ্যমে ইসরায়েলকে ঘিরে মোটামুটি একটি অভিন্ন বয়ান প্রচলিত ছিল। সেখানে ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও আত্মরক্ষার অধিকারের ওপর জোর দেওয়া হতো। আর ফিলিস্তিনিদের উপর চালানো বর্বরতা সেই বয়ানের একপ্রান্তে পড়ে থাকত।
কিন্তু ৭ অক্টোবরের পর ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে ৭৭ হাজার থেকে ১ লাখ ৯ হাজার পর্যন্ত ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার বিভিন্ন রিপোর্ট সামনে এসেছে। দীর্ঘ সময় ধরে ইসরায়েলের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকা বহু প্রভাবশালী গণমাধ্যম এখন সেই অবস্থান পুনর্বিবেচনা করছে।
গত সপ্তাহে ফিনান্সিয়াল টাইমস, দ্য ইকোনমিস্ট, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ও দ্য আটলান্টিক-এর মতো গণমাধ্যমগুলো ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর যুদ্ধনীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের নীরবতার কড়া সমালোচনা করেছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের বর্ষীয়ান কলাম লেখক থমাস ফ্রিডম্যান, যিনি একসময় ইসরায়েলের প্রবল সমর্থক ছিলেন। তিনিও এবার বলেন, ‘এই ইসরায়েলি সরকার আমাদের মিত্র নয়।’ তিনি ইসরায়েলের বর্তমান নীতিকে আমেরিকার স্বার্থের পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেন।
ফিনান্সিয়াল টাইমসের একটি সম্পাদকীয়তে লিখেছে, ‘গাজা নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের লজ্জাজনক নীরবতা’ আর দ্য আটলান্টিক বলেছে, নেতানিয়াহুর ঘোষিত ‘সম্পূর্ণ বিজয়ের’ অর্থ হতে পারে ‘ফিলিস্তিনিদের জাতিগত নির্মূল’।
দ্য ইকোনমিস্ট একধাপ এগিয়ে যুদ্ধের অবসান দাবি করেছে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে একটি যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য করার আহ্বান জানিয়েছে।
নেতানিয়াহু আমাদের বন্ধু নন
পশ্চিমা গণমাধ্যমে ইসরায়েল-সংক্রান্ত সাম্প্রতিক অবস্থান পরিবর্তন আকস্মিক নয়, বরং সুপরিকল্পিত ও সময়োপযোগী বলেই মনে হচ্ছে।
এটি এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন গাজা যুদ্ধ ও ইরান প্রসঙ্গে হোয়াইট হাউজ ও নেতানিয়াহুর মধ্যে স্পষ্ট দ্বন্দ্ব দেখা দিচ্ছে। পাশাপাশি সামরিকভাবে ইসরায়েলি অভিযান থমকে গেছে এবং রাজনৈতিকভাবে তা উল্টো ফল বয়ে আনছে। সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, ৬০ শতাংশের বেশি ইসরায়েলি নতুন করে স্থল হামলার বিপক্ষে, এমনকি রিজার্ভ সেনা ডাকলেও তারা সাড়া দিচ্ছে না।
The west’s shameful silence on Gaza https://t.co/u0FcxQ881W | opinion
বেসামরিক মৃত্যুর সংখ্যা যখন ক্রমেই বাড়ছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বড় বড় সম্পাদকীয়তে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হচ্ছে যে, গাজায় ইসরায়েলের চলমান হামলা ‘গণহত্যার’ রূপ নিচ্ছে।
বিবিসির এক জরিপ অনুসারে, বর্তমানে মাত্র ৪৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইসরায়েলকে সমর্থন করছে—এটি গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সময়ে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন বেড়ে ৩৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যা নজিরবিহীন।
গণমাধ্যমের এই বয়ান পরিবর্তন এমন এক সময় এসেছে, যখন নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে সম্পর্কও টানাপড়েনের দিকে যাচ্ছে। ফরেন পলিসি–তে শালোম লিপনারের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের মধ্যে ‘সংঘর্ষের পথ’ তৈরি হচ্ছে।
ওই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ওয়াশিংটনে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক কৌশল এখন আর আগের মতো কার্যকর নয়। কারণ, রিপাবলিকান দলের সমর্থন এখন অনেকটাই ট্রাম্পের একক প্রভাবাধীন হয়ে পড়েছে।
এ বাস্তবতাকে আরো জোরালো করেছে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সফরে ইসরায়েলকে উপেক্ষা করা। হোয়াইট হাউসের ভাষ্য, ‘এই মুহূর্তে ইসরায়েল সফর করে লাভবান হওয়ার কিছু নেই।’
নিউইয়র্ক টাইমসে থমাস ফ্রিডম্যান একই দিনে এক মন্তব্যে সরাসরি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে লিখেছেন, ‘এই ইসরায়েলি সরকার এমনভাবে আচরণ করছে, যা এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মৌলিক স্বার্থের হুমকি। নেতানিয়াহু আমাদের বন্ধু নন।’
তিনি বলেন, নেতানিয়াহু সরকারের লক্ষ্য শান্তি নয়, বরং পশ্চিম তীর দখল, গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের উৎখাত এবং সেখানে আবার ইহুদি বসতি স্থাপন।
তবে এই পরিবর্তন শুধু রাজনৈতিক নয়, সামরিক বাস্তবতাও এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে।
চলতি মাসের শুরুতে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের একটি ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন নির্মিত থাড প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে আঘাত হানে এবং সব ফ্লাইট বন্ধ করতে বাধ্য করে। এর ফলে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার একটি অপ্রত্যাশিত দুর্বলতা সামনে আসে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তিনটি যুদ্ধবিমান ও সাতটি রিপার ড্রোন হারানোর ঘটনা।
এই সামরিক ধাক্কাগুলো এখন ওয়াশিংটনের স্বার্থকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সম্ভবত এ কারণেই পশ্চিমা গণমাধ্যম তাদের পূর্বের ইসরায়েলপন্থী অবস্থান পুনর্বিবেচনা করছে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষতি নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে এসেছে এবং সম্প্রতি সানা–ভিত্তিক হুথি প্রশাসনের সঙ্গে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। এর ফলে হুথিদের মার্কিন জাহাজে হামলা বন্ধ হলেও ইসরায়েল এই চুক্তির আওতায় পড়েনি। এমনকি ইসরায়েলকে বাইরে রেখেই চুক্তি করা হয়েছে।
পুরনো সেই গল্পই ফিরে এল
সিএনএনের সাবেক আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা এবং ইন্টারন্যাশনাল নেটওয়ার্ক ফর এইড রিলিফ অ্যান্ড অ্যাসিসট্যান্সের (আইএনএআরএ) প্রতিষ্ঠাতা আরওয়া ডেমন মনে করেন, ইসরায়েল নিয়ে পশ্চিমা গণমাধ্যমের বর্তমান অবস্থান বদল আসলে এক পুরনো চক্রেরই পুনরাবৃত্তি। যা ২০০৩ সালের পর ইরাক যুদ্ধ কাভারেজে দেখেছিলাম।
তিনি বলেন, ‘৯/১১–এর পর যেভাবে পশ্চিমা গণমাধ্যম তৎকালীন বুশ প্রশাসনের যুদ্ধ-উদ্দীপনায় সায় দিয়েছিল এবং পরে সেই একই গণমাধ্যম যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ইরাক আগ্রাসন নিয়ে সমালোচনায় মুখর হয়েছিল। ঠিক তেমনি একটি চিত্র আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি। মিডিয়ার সামনে তুলে ধরা গল্প বাস্তবতার সঙ্গে মেলেনি, তাই মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে তারা প্রশাসনের বয়ানকে প্রশ্নবিদ্ধ করা শুরু করে।’
তবে গাজা প্রসঙ্গে এই বয়ান পরিবর্তন অনেক ধীরগতিতে ঘটছে বলে মনে করেন ডেমন। এর অন্যতম কারণ হলো, আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের সেখানে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না এবং গাজায় যেসব স্থানীয় সাংবাদিক নিরবচ্ছিন্নভাবে তথ্য দিচ্ছেন, তাদের রিপোর্টকে অনেক পশ্চিমা সম্পাদকেরা এখনো পূর্ণ আস্থায় গ্রহণ করছেন না।
ডেমন বলেন, ‘ইসরায়েল ও গাজার ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন আসতে অনেক বেশি সময় নিয়েছে। ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবেই বিদেশি সাংবাদিকদের গাজায় ঢুকতে দেয় না। আর দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ফিলিস্তিনি সাংবাদিকরা অসাধারণভাবে কাজ করলেও এখনো অনেকেই তাদের পেশাদারিত্ব নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেন।’
তিনি যোগ করেন, ‘এই সন্দেহই পরিবর্তনকে বিলম্বিত করেছে। তবে বাস্তবতা ও জনগণের চাপের মুখে পশ্চিমা মিডিয়া ধীরে ধীরে তাদের বয়ান বদলাতে বাধ্য হচ্ছে।’
পশ্চিমা গণমাধ্যমে কেন ইসরায়েলের সমালোচনা
প্রথমত, গাজার যুদ্ধ এতটাই ভয়াবহ ও একতরফা হয়ে উঠেছে যে তা আর উপেক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। মৃতের সংখ্যা, শিশু ও নারীর মৃত্যু, অবকাঠামোগত ধ্বংস — সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক জনমতও দ্রুত বদলাচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, পশ্চিমা পাঠক ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ইসরায়েল নিয়ে দীর্ঘকাল গড়ে ওঠা সমর্থন এখন আর ধোপে টিকছে না। সোশ্যাল মিডিয়ায় ফিলিস্তিনপন্থী তথ্যপ্রবাহ ও ভিডিও চিত্র গণমানুষকে সংবেদনশীল করে তুলেছে। মূলধারার গণমাধ্যম এখন সেই পরিবর্তিত পাঠকের মনোভাব বিবেচনায় নিচ্ছে।
তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈতনীতিতে অনেকেই হতাশ। দেশটি একদিকে শান্তির কথা বলে অন্যদিকে ইসরায়েলকে অস্ত্রও সরবরাহ করে— এসব নিয়ে পশ্চিমা বিশ্লেষকদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান হতাশা তৈরি হয়েছে।
চতুর্থত, আন্তর্জাতিক মহলে নেতানিয়াহুকে এখন আর ‘গণতান্ত্রিক মিত্র’ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং একজন জটিল ও উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছেন, যিনি ইসরায়েলকেও আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে করে ফেলছেন।
তাহলে কি এটা আন্তর্জাতিক অবস্থানের বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত? এখনো এটা বলা কঠিন। তবে এটা নিঃসন্দেহে গণমাধ্যমের বয়ানে মোড় পরিবর্তন হয়েছে। যদিও পশ্চিমা সরকারের নীতিতে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। তবে গণমাধ্যমের অবস্থান নীতিনির্ধারকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এই বয়ান যদি দৃঢ়ভাবে স্থায়ী হয়, তাহলে এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অন্তত পশ্চিমা গণমাধ্যম এবং জনমতের স্তরে ইসরায়েলের প্রতি ‘অন্ধ সমর্থনের যুগের’ অবসানের দিকে যেতে পারে।
এই বদল কেবল একটি ‘নৈতিক প্রতিক্রিয়া’ নাকি এর পেছনে নতুন কৌশলগত হিসাবও কাজ করছে? সেটিই এখন দেখার বিষয়। সব মিলিয়ে, ইসরায়েল–মার্কিন সম্পর্ক, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা, সামরিক ব্যর্থতা এবং জনমত পরিবর্তনের যুগপৎ চাপে পশ্চিমা গণমাধ্যম এখন ইসরায়েল নিয়ে নতুনভাবে চিন্তা করতে বাধ্য হচ্ছে। এটা কেবল একবারের বয়ান পরিবর্তন নয়, বরং আন্তর্জাতিক মতপ্রবাহে এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক।
ওএফ

