Logo

আন্তর্জাতিক

গাজায় নতুন অভিযান

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেবে ব্রিটেন-ফ্রান্স-কানাডা

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২০ মে ২০২৫, ১০:২৪

অ
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেবে ব্রিটেন-ফ্রান্স-কানাডা

কয়েক দিনের ব্যবধানে শত শত ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন /ছবি : সংগৃহীত

গাজায় ইসরায়েলের নতুন সামরিক অভিযানে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে শত শত ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এ অবস্থায় ইসরায়েলের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডার নেতারা সোমবার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইসরায়েল যদি হামলা বন্ধ না করে এবং গাজায় ত্রাণ প্রবেশে বাধা দিতে থাকে, তবে তারা লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞাসহ ‘কঠোর পদক্ষেপ’ নিতে প্রস্তুত।

এক যৌথ বিবৃতিতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমার, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ও কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কারনি ইসরায়েলের যুদ্ধ সম্প্রসারণের নিন্দা জানিয়ে গাজার পরিস্থিতিকে ‘অসহনীয়’ আখ্যা দিয়েছেন। তারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন যে, ইসরায়েল যদি তার সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখে, তবে তারা ‘কঠোর পদক্ষেপ’ নিতে বাধ্য হবেন।

তিন নেতা এক বিবৃতিতে বলেন, ‘নেতানিয়াহু সরকার যখন এই চরমপন্থী পদক্ষেপ নিচ্ছে, তখন আমরা চুপ করে বসে থাকতে পারি না। ইসরায়েল যদি তার সামরিক আগ্রাসন বন্ধ না করে এবং মানবিক সহায়তার ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ না তুলে নেয়, তবে আমরা এর পাল্টা ব্যবস্থা নেব।’

তবে তারা এখনো স্পষ্ট করেননি যে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তাদের পদক্ষেপটি কী হতে পারে। বিবৃতিতে তারা জানান, ‘দুই-রাষ্ট্র সমাধানের লক্ষ্যে আমরা ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং অন্য দেশগুলোর সঙ্গে মিলে এই লক্ষ্যে কাজ করতে প্রস্তুত।’

এই বিবৃতির সঙ্গে মিলিয়ে ২২টি দেশ একযোগে আহ্বান জানিয়েছে, যেন ইসরায়েল অবিলম্বে গাজায় পূর্ণমাত্রায় মানবিক সহায়তা প্রবেশ করতে দেয়। বিবৃতিতে বলা হয়, গাজার জনগণ ক্ষুধার জ্বালায় ধুঁকছে।

আরও বলা হয়, বেসামরিক জনগণের জন্য জরুরি মানবিক সহায়তা অস্বীকার করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং তা আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করে। 

একইসঙ্গে, ইসরায়েল সরকারের কিছু সদস্যের সাম্প্রতিক ‘জঘন্য’ বক্তব্যেরও নিন্দা জানানো হয়, যেখানে গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ দেখে হতাশ হয়ে সাধারণ মানুষ ‘পালিয়ে যেতে বাধ্য হবে’ এমন মন্তব্য করা হয়েছে। এই ধরনের জোরপূর্বক স্থানচ্যুতিকে আন্তর্জাতিক আইন স্পষ্টতই লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করে।

নেতানিয়াহুর জবাব

তবে নেতানিয়াহু এই সমালোচনার কড়া জবাব দিয়েছেন। তিনি ব্রিটিশ, ফরাসি ও কানাডীয় নেতাদের যৌথ বিবৃতিকে ‘হামাসের জন্য এক বিশাল পুরস্কার’ বলে অভিহিত করেছেন।

তিনি বলেন, ‘যখন লন্ডন, অটোয়া ও প্যারিসের নেতারা ইসরায়েলকে আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই বন্ধ করতে বলেন এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি তোলেন, তখন তারা আসলে ৭ অক্টোবরের গণহত্যামূলক হামলার জন্য হামাসকে পুরস্কৃত করছেন। ভবিষ্যতে আরও এরকম হামলার চালানো উৎসাহ দিচ্ছেন।’

নেতানিয়াহু দাবি করেন, ‘সব ইউরোপীয় নেতাদের উচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো ইসরায়েলের প্রতি অটল সমর্থন জানানো।’

তিনি বলেন, ‘এই যুদ্ধ আগামীকালই শেষ হতে পারে যদি বাকি জিম্মিদের মুক্তি দেওয়া হয়, হামাস অস্ত্র ফেলে দেয়, তাদের ঘাতক নেতারা নির্বাসনে যায় এবং গাজা নিরস্ত্রীকরণ করা হয়। কোনো রাষ্ট্রই এর কম কিছু মেনে নিতে পারে না, আর ইসরায়েল তো নয়ই।’

নেতানিয়াহু আরও বলেন, ‘এটি সভ্যতার বিরুদ্ধে বর্বরতার যুদ্ধ। ইসরায়েল ন্যায়সঙ্গত পথে আত্মরক্ষা করে যাবে যতক্ষণ না আমরা পূর্ণ বিজয় অর্জন করি।’

এর আগে, এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘গাজায় এখন প্রবল লড়াই চলছে এবং আমরা অগ্রগতি করছি। আমরা গাজার পুরো ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নেব।’

গাজায় ভয়াবহ স্থল অভিযান শুরু

সম্প্রতি ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য সফর শেষ করে ফিরে যাওয়ার পরপরই ইসরায়েল গাজায় নতুন ও ভয়াবহ স্থল অভিযান শুরু করে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানায়, ‘গিডিয়নের রথ’ নামের এই অভিযানে তারা গত ২৪ ঘণ্টায় গাজার উত্তরে ও দক্ষিণে প্রবেশ করেছে। আগেই জানানো হয়েছিল, হামাস নতুন কোনো চুক্তি না মানলে এই অভিযান শুরু হবে।

এই স্থল অভিযান শুরু হওয়ার আগে কয়েক দিন ধরে গাজায় ভয়াবহ বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব হামলায় বহু পরিবার সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

গাজায় চলমান অবরোধে কিছুটা শিথিলতার ইঙ্গিত দিয়েছেন নেতানিয়াহু। তিনি বলেছেন, ‘প্রাথমিকভাবে কিছু খাবার সরবরাহের অনুমতি দেওয়া হবে।’

তবে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা প্রধান টম ফ্লেচার এই উদ্যোগকে ‘অত্যন্ত সীমিত’ এবং ‘ব্যাপক চাহিদার তুলনায় মাত্র এক ফোঁটা’ বলে বর্ণনা করেন। সোমবার ইসরায়েলের অনুমোদনপ্রাপ্ত পাঁচটি ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় প্রবেশ করেছে।

এদিকে শনিবার থেকে কাতারের রাজধানী দোহায় হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনাও শুরু হয়েছে।

গত ৫ মে ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা গাজায় নতুন এই সামরিক অভিযান অনুমোদন দেয়। এরপর ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানায়, এই অভিযানের উদ্দেশ্য হলো গাজার যুদ্ধের সব লক্ষ্য পূরণ করা— যার মধ্যে রয়েছে হামাসকে পরাজিত করা ও বাকি জিম্মিদের মুক্ত করা।

ইসরায়েলি সেনারা গাজা সীমান্তে ট্যাংকের পাশে অবস্থান নিয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, গত এক সপ্তাহে তারা গাজার ভেতরে ৬৭০টির বেশি ‘হামাসের লক্ষ্যবস্তু’তে আঘাত হেনেছে।

সোমবার ভোরে ইসরায়েলি বাহিনী গাজার দক্ষিণাঞ্চলের খান ইউনুসে নাসের মেডিকেল কমপ্লেক্সের ওষুধ সরবরাহ গুদামে হামলা চালায়। এতে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থা মেডিক্যাল এইড ফর প্যালেস্টাইনস (এমএপি) থেকে সরবরাহকৃত ওষুধের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলের এই নতুন অভিযানে কমপক্ষে ১৩৬ জন নিহত হয়েছেন। উত্তর গাজার শেষ কার্যকর হাসপাতালটিও বন্ধ হয়ে গেছে। 

ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, অধিকাংশ নিহতই ঘুমন্ত অবস্থায় বোমার আঘাতে প্রাণ হারান।

বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া হামলায় এখন পর্যন্ত ৪০০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন এবং আরও এক হাজার জন আহত হয়েছেন।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি অভিযানে এখন পর্যন্ত গাজায় ৫৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে অধিকাংশই নারী ও শিশু।

ওএফ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন