Logo

আন্তর্জাতিক

এবার জেন-জি ঢেউয়ে উত্তাল আফ্রিকার মরক্কো, দমন-পীড়নে গ্রেপ্তার শতাধিক

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৫, ১৫:৩৯

এবার জেন-জি ঢেউয়ে উত্তাল আফ্রিকার মরক্কো, দমন-পীড়নে গ্রেপ্তার শতাধিক

ছবি : সংগৃহীত

দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের পর এবার আফ্রিকার উত্তরাঞ্চলীয় দেশ মরক্কোয় জেন-জির সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। যা কয়েক বছরের মধ্যে দেশটির সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ। ‘জনগণের চাই স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জবাবদিহিতা’ এই স্লোগানে রাস্তায় নেমে আসেন মরক্কোর জেনারেশন জেড বা জেন জি প্রজন্মের হাজারো তরুণ-তরুণী। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দমন-পীড়নে গ্রেপ্তার হয়েছেন শতাধিক।

এর আগে দেশটির একটি সরকারি হাসপাতালে ৮ গর্ভবতী নারীর মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে সাধারণ জনগণসহ জেন-জি। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত শনিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) থেকে অন্তত ১১টি শহরে এ বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ‘জেন-জি ২১২’ নামের অজ্ঞাতপরিচয় এক যুব সমাজভিত্তিক সংগঠনের ডাকে আন্দোলন শুরু হলেও তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে দেশটির সর্বত্র। 

পরে সোমবার (২৯ সেপ্টেম্বর) মরক্কোর রাজধানী রাবাতসহ বিভিন্ন শহরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে ডজনখানেক তরুণকে আটক করে নিরাপত্তা বাহিনী। সোমবার রাজধানী রাবাত থেকেই অন্তত ৬০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া কাসাব্লাঙ্কা, আগাদির, ওজদা ও মেকনেস থেকেও গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া গেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রোববার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাতে কাসাব্লাঙ্কায় বিক্ষোভকারীরা প্রধান মহাসড়ক অবরোধ করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের কাছ থেকে শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করছে।

এদিকে মরক্কো মানবাধিকার সমিতি অভিযোগ করেছে, আটক করা বিক্ষোভকারীদের অনেককে নির্যাতন করা হয়েছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তরুণদের দাবিগুলো শোনার জন্য সংলাপে বসার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এ আন্দোলন বিকেন্দ্রীভূত, নেতা-বিহীন ও পরিবর্তনশীল। এটি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, তবে সমাধান খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে।

এদিকে ‘জেন জি ২১২’ জানিয়েছে, অধিকার আদায়ের একমাত্র পথ হলো প্রতিবাদ। দাবি পূরণ না হলে আন্দোলন আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে

আন্দোলন নেপালের সাম্প্রতিক তরুণ নেতৃত্বাধীন দুর্নীতিবিরোধী বিক্ষোভ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছে। এতে বৈশ্বিক পর্যায়ে জেনারেশন জেড প্রজন্মের প্রভাবও ফুটে উঠছে।

এক্স-এর (সাবেক টুইটার) একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘হাজারো জেনারেশন জেড মৌলিক অধিকার— শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ন্যায়বিচার ও মর্যাদার জন্য রাস্তায় নেমেছে।’ তার মতে, দমন-পীড়ন কেবল আরও ক্ষোভ উস্কে দিচ্ছে।

মরক্কোয় তরুণ প্রজন্মের সংখ্যা বেশি। এর মধ্যে জেনারেশন জেড সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠী। অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও বৈষম্যের প্রভাব তাদের ওপর বেশি পড়ছে।

মরোক্কান ইনস্টিটিউট ফর পলিসি অ্যানালাইসিস এর বিশ্লেষক মোহাম্মদ মাসবাহ বলেন, আন্দোলন ‘বিকেন্দ্রীভূত, নেতা-বিহীন ও পরিবর্তনশীল।’ এতে আন্দোলন টিকে থাকার ক্ষমতা বেশি, তবে সমাধান খোঁজা কঠিন।

অনেকে একে ২০১১ সালের আরব বসন্তের সঙ্গে তুলনা করছেন। তবে কেউ কেউ মনে করেন, এটি মূলত সংস্কারের দাবি, সরকার পরিবর্তনের আন্দোলন নয়।

জেন জি ২১২ ফেসবুকে লিখেছে, ‘অধিকার পাওয়ার একমাত্র পথ প্রতিবাদ।’ তারা নতুন সমাবেশের ডাক দিয়েছে। দাবি পূরণ না হলে আন্দোলন আরও বড় আকার নিতে পারে। এতে ২০১১ সালের মতো সরকারের ওপর ছাড় দেওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে।

মরোক্কোয় তরুণ প্রজন্মের সংখ্যা বেশি। এর মধ্যে জেনারেশন জেড সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠী। অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও বৈষম্যের প্রভাব তাদের ওপর বেশি পড়ছে। এছাড়া অনেকে একে ২০১১ সালের আরব বসন্তের সঙ্গে তুলনা করছেন। তবে কেউ কেউ মনে করেন, এটি মূলত সংস্কারের দাবি, সরকার পরিবর্তনের আন্দোলন নয়।

আবার মরোক্কোড় অনেকে বিশেষজ্ঞ মনে করছেন নেপালের সাম্প্রতিক তরুণ নেতৃত্বাধীন দুর্নীতিবিরোধী বিক্ষোভ থেকে এটি অনুপ্রেরণা নিয়েছে। এতে বৈশ্বিক পর্যায়ে জেনারেশন জেড প্রজন্মের প্রভাবও ফুটে উঠছে।

অন্যদিকে এর আগের বছর, ২০২৪ সালে, বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়।

তবে পুলিশের দমন-পীড়ন ও শত শত মানুষের মৃত্যু আন্দোলনকে রূপ দেয় সরকারের পতনের দাবিতে। ছাত্রনেতারা আল্টিমেটাম দিলেও আন্দোলন ছিল ছড়িয়ে থাকা একাধিক নেতৃত্ব কাঠামোয়।

সরকারের ইন্টারনেট বন্ধ করা, দমননীতি কিংবা ভয়ভীতি কোনো কিছুই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ঘনিষ্ঠ মিত্র ভারতের উদ্দেশে দেশত্যাগ করেন।

বাংলাদেশেরও আগে, ২০২২ সালে, শ্রীলঙ্কা ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে। বৈদেশিক ঋণ খেলাপি হয়ে পড়া দেশটিতে দিনে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভ্রাট, জ্বালানি ও গ্যাসের দীর্ঘ সারি এবং মুদ্রাস্ফীতি ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।

তখন জন্ম নেয় ‘আরাগালায়া’ আন্দোলন, যার অর্থ ‘সংগ্রাম’। রাজধানী কলম্বোয় ‘গোটাগোগামা’ নামের প্রতীকী গ্রাম গড়ে তরুণেরা প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলন শুরু করে। জুলাই মাসে প্রেসিডেন্টের বাসভবন দখল করার পর রাজাপক্ষ দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এসব আন্দোলনের মূল ভিত্তি একই—সামাজিক বৈষম্য, দুর্নীতি ও প্রজন্মের অচলাবস্থা।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী ২৮ বছরের নিচে। তুলনামূলক কম মাথাপিছু আয়ের দেশ হলেও সাক্ষরতার হার ৭০ শতাংশের বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই শিক্ষা ও তরুণ জনসংখ্যার মিশ্রণই আন্দোলনগুলোকে ব্যাপক ভিত্তি দিয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিভাগের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেছেন, ‘যুবসমাজ তাদের রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে কোনো সংযোগ খুঁজে পাচ্ছে না। তাদের জীবনের বাস্তবতা ও রাজনীতিকদের বিলাসবহুল জীবনের ব্যবধান খুব বেশি।’

এএ

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

বিক্ষোভ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন