গাজামুখী সুমুদ ফ্লোটিলায় ইসরায়েলের বাধায় দেশে দেশে প্রতিক্রিয়া
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৫, ১২:৩১
সুমুদ ফ্লোটিলায় বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে ইসরায়েলের কনস্যুলেট জেনারেলের অফিসের বাইরে বিক্ষোভ। ছবি : সংগৃহীত
গাজায় ত্রাণ বহনকারী নৌবহর আটকের পর সুইডিশ জলবায়ু কর্মী গ্রেটা থানবার্গসহ শত শত কর্মীকে আটক করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। ওই বহরে প্রায় ৪০টি জাহাজ ছিল, যার প্রায় সবকটিকে আটক করা হয়েছে।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার (জিএসএফ) সদস্যদের একটি ইসরায়েলি বন্দরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং সেখান থেকে তাদের নিজ দেশে ফেরানো হবে।
প্রথম নৌকাটি গাজার উপকূল থেকে প্রায় ৭০ নটিক্যাল মাইল দূরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় থামানো হয়, অন্যগুলোকে আরও কাছাকাছি স্থানে আটক করা হয়েছে। ইসরায়েল ওই এলাকায় নজরদারি চালাচ্ছে, যদিও সেখানে তাদের আইনগত এখতিয়ার নেই। খবর- বিবিসি নিউজ
ইসরায়েল জানিয়েছে, তাদের নৌবাহিনী নৌযানগুলোকে সতর্ক করেছিল যে তারা ‘সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্রের কাছে প্রবেশ করছে এবং বৈধ নৌ অবরোধ লঙ্ঘন করছে।’ তবে জিএসএফ এটিকে ‘অবৈধ’ বলে উল্লেখ করেছে।
দলটির দাবি, ইসরায়েলের এই পদক্ষেপ ‘প্রতিরক্ষামূলক নয়, বরং মরিয়া হয়ে নেওয়া আগ্রাসী পদক্ষেপ।’ তাদের মতে, মোট ৪৪৩ জনকে আটক করা হয়েছে এবং অনেকের ওপর জলকামান দিয়ে আক্রমণ করা হয়েছে। ইসরায়েল দাবি করেছে, সবাই ‘নিরাপদ ও সুস্থ’ আছেন।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
গাজায় ত্রাণ বহনকারী নৌবহরে হামলার ঘটনায় বিভিন্ন দেশে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার ভলকার টুর্ক ইসরায়েলকে ‘দ্রুত গাজার অবরোধ তুলে নিতে এবং জীবন রক্ষাকারী উপকরণের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে’ আহ্বান জানিয়েছেন।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, তারা নৌকায় থাকা ব্রিটিশ নাগরিকদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছে, ‘আমরা আশা করি পরিস্থিতি নিরাপদভাবে সমাধান হবে।’
আইরিশ ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী সাইমন হ্যারিস ঘটনাকে ‘উদ্বেগজনক’ উল্লেখ করেছেন এবং আশা প্রকাশ করেছেন যে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলবে। আটক হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত সাতজন আইরিশ নাগরিক রয়েছেন, তাদের মধ্যে সিন ফেইন সেনেটর ক্রিস অ্যান্ড্রুজও আছেন।
কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো দেশ থেকে সব ইসরায়েলি কূটনীতিককে বহিষ্কার করেছেন এবং ইসরায়েলের পদক্ষেপকে ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ’ হিসেবে নিন্দা জানিয়েছেন।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড বলেছেন, গাজার ওপর ইসরায়েলের অবরোধ ‘অবৈধ’ এবং বহু দশক ধরে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের দায়মুক্তি পাওয়ার এই প্রক্রিয়ার অবসান হওয়া উচিত।
সুমুদ ফ্লোটিলার আটকের ঘটনায় ইউরোপের বিভিন্ন শহরে ফিলিস্তিনিপন্থি বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ডাবলিন, প্যারিস, বার্লিন এবং জেনেভার রাস্তায় হাজার হাজার বিক্ষোভকারী সমবেত হয়েছেন।
ইতালিতে সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন শহরে ১০০টির বেশি মিছিল ও গণসমাবেশের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি গাজায় পৌঁছানোর প্রচেষ্টাকে সমালোচনা করেছেন।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ইসরায়েলের পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, তারা অবিলম্বে নৌবহরে থাকা দক্ষিণ আফ্রিকান নাগরিকদের মুক্তি দিক।
গাজাগামী নৌবহরের মধ্যে একটি জাহাজ, ম্যারিনেট, এখনো কিছুটা দূরে আছে। এতে ছয়জন যাত্রী রয়েছেন। ফ্লোটিলা আয়োজকরা বলছেন, এটি গাজায় পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
জিএসএফ-এর আইনজীবী ও পর্যবেক্ষক কাইভা বাটারলি বলেছেন, ‘আগামী দিনে অবরোধ ভাঙার আরও প্রচেষ্টা করা হবে। আশা করা হচ্ছে সর্বোচ্চ ১৩টি নৌযান, জাহাজ ও নৌকা গাজায় পৌঁছানোর জন্য একই পথ অনুসরণ করবে।’
ফ্লোটিলা এক মাস আগে স্পেন থেকে যাত্রা শুরু করে, যেখানে ৪০টিরও বেশি নৌযান এবং প্রায় ৫০০ মানুষ ছিলেন। তাদের মধ্যে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য, আইনজীবী ও কর্মী ছিলেন। তাদের লক্ষ্য ছিল সরাসরি গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া।
ইসরায়েল ইতোমধ্যেই জুন ও জুলাই মাসে সহায়তা পৌঁছানোর দুটি প্রচেষ্টায় বাধা দিয়েছে। জিএসএফ-এর তথ্য অনুযায়ী, একটি নৌকা মিকেনো হয়তো গাজার আঞ্চলিক পানিসীমায় প্রবেশ করেছে, কিন্তু এর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।
গ্রেটা থানবার্গ বলেছেন, ‘আমি মনে করি না কেউ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কেবল প্রচারের জন্য এমন কাজ করবে।’ আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাগুলো গাজায় খাদ্য ও ওষুধ পৌঁছানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু ইসরায়েল সরবরাহ প্রবাহ সীমিত করছে।
আইপিসি (ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন) নিশ্চিত করেছে যে গাজায় দুর্ভিক্ষ চলছে। জাতিসংঘের মানবিক প্রধান বলেছেন, এটি ইসরায়েলের ‘পদ্ধতিগতভাবে সহায়তা বাধাগ্রস্ত করার’ সরাসরি ফলাফল। নেতানিয়াহু এটিকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেছেন।
এমএইচএস

