Logo

আন্তর্জাতিক

উজবেকিস্তানের গড়ে উঠেছে ইসলামি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র; কী আছে এতে, দেখুন ছবিসহ

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ৩০ নভেম্বর ২০২৫, ১৫:৫৯

উজবেকিস্তানের গড়ে উঠেছে ইসলামি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র; কী আছে এতে, দেখুন ছবিসহ

উজবেকিস্তানের নতুন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি এতটাই বিশাল যে এটি হলিউড সাইন-এর চেয়ে চার গুণ উঁচু এবং হোয়াইট হাউসের চেয়ে প্রায় সাত গুণ বড়।

উজবেকিস্তানের তাসখন্দে তিন তলাবিশিষ্ট আংশিক জাদুঘর ও আংশিক শিক্ষা গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠা এ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটির নাম সেন্টার ফর ইসলামিক সিভিলাইজেশন (সিআইএসসি)। এটি নির্মাণে খরচ হয়েছে ১৫ কোটি মার্কিন ডলার।

২০২৬ সালের মার্চ থেকে জনসাধারণের জন্য এ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি খুলে দেওয়া হবে। আশা করা হচ্ছে, এ সাংকৃতিক কেন্দ্রটি ইসলামি জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে উজবেকিস্তানের ঐতিহাসিক ভূমিকাকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসবে।

সিআইএসসি-এর পরিচালক ফিরদাভস আবদুখালিকভ বলেন, ‘এ অঞ্চলটি বিশ্বসভ্যতায় অবদান রাখা বহু পূর্বসূরির আবাসভূমি ছিল। তাঁদের সে অবদানের কথা কীভাবে বিশ্বের সামনে বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে আকর্ষণীয় ও আধুনিক কায়দায় উপস্থাপন করা যাবে, সেটাই বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছিল।’

৮ বছর ধরে ভবনটির নির্মাণকাজ চলেছে। ৪০টির বেশি দেশের ১ হাজার ৫০০ বিশেষজ্ঞ সিআইএসসি-এ বৈজ্ঞানিক, স্থাপত্যগত ও সাংস্কৃতিক কাজের সঙ্গে ছিলেন।

ভবনের শীর্ষে ৬৫ মিটার লম্বা একটি নীল রঙের গম্বুজ বসানো আছে।

সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে ‘পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়াভিত্তিক শিক্ষাচর্চার’ একটি জোন থাকবে। সেখানে ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। প্রযুক্তির বদৌলতে দর্শনার্থীরা সেখানে ঐতিহাসিক পণ্ডিত ও চিন্তাবিদদের কথিত ‘জীবন্ত প্রতিকৃতির’ সঙ্গে কথোপকথনের অভিজ্ঞতাও পাবেন। এই প্রযুক্তিনির্ভর আয়োজনের লক্ষ্য হলো—শিশুদের জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসা, সাহিত্য এবং শিল্পকলার জগতের প্রতি আগ্রহী করে তোলা।

সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটির দ্বিতীয় তলা গবেষণার জন্য নির্ধারিত। সেখানে আন্তর্জাতিক গবেষকেরা আধুনিক গ্রন্থাগার ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। সেখানে থাকছে ২ লাখের বেশি বই।

আবদুখালিকভ বলেন, ‘এটি শুধু জাদুঘর নয়। এটি একটি সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম। এখানে নিদর্শনের সঙ্গে সঙ্গে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের জীবন ও ভাবনাকে তুলে ধরা হয়েছে।

সেপ্টেম্বর মাসে একটি নির্মাণাধীন স্থাপনার আগুন কেন্দ্রটির মূল উদ্বোধন পিছিয়ে দেয়, তবে মূল নির্মাণ কাজ এখন সম্পন্ন হয়েছে এবং এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ২০২৬ সালের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

উজবেকিস্তান ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হলেও ইসলাম ধর্ম সেখানকার ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।

আরবদের আগমনের মাধ্যমে সপ্তম শতকে মধ্য এশিয়া অঞ্চলে ইসলামের প্রচার ও প্রসার ঘটে। এতে অঞ্চলটিতে আগে থেকে প্রচলন থাকা জরথুস্ত্র ও বৌদ্ধ ঐতিহ্যের জায়গায় নতুন ধর্মীয় ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়। নবম থেকে ১২ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত মধ্য এশিয়া—বিশেষ করে বর্তমান উজবেকিস্তান বিজ্ঞান, সাহিত্য ও স্থাপত্যকলায় এক উজ্জ্বল স্বর্ণযুগ পার করেছে।

কেন্দ্রটিতে ৬৫ মিটার (২১৩ ফুট) উচ্চতার নীল গম্বুজ রয়েছে, যা পাশের হাজরতি ইমাম কমপ্লেক্সের ছাদের গম্বুজের মতো দেখতে। জাদুঘরের প্রদর্শনীর পাশাপাশি, কেন্দ্রে রয়েছে ২ লাখ বইয়ের একটি গবেষণা গ্রন্থাগার, পুনর্নির্মাণ ল্যাব, এবং আন্তর্জাতিক ফোরামের জন্য ৪৬০ আসনের কনফারেন্স হল।

ইতিহাসবিদ ফারহান আহমদ নিজামি বলেন, ‘বিশ্বায়ন’ ধারণাটি প্রচলিত হওয়ার বহু আগেই উজবেকিস্তান ও বিস্তৃত মধ্য এশিয়া অঞ্চলটি বিশ্বায়নের নমুনা হয়ে উঠেছিল।

প্রাক-ইসলামিক যুগের হলে এই প্রদর্শনী রেশমপথ বাণিজ্যিক পথের একটি ব্যস্ত বাজার পুনর্নির্মাণ করেছে।

আন্তমহাদেশীয় বাণিজ্যপথ সিল্ক রোড ব্যবহার করে উজবেকিস্তানের বুখারা ও সমরখন্দের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে যাওয়া যেত। ভেনিস থেকে জিয়ান পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল সিল্ক রোড। এটি ১ হাজার ৫০০ বছর ধরে (খ্রিষ্টপূর্ব ১৩০ থেকে খ্রিষ্টাব্দ ১৪৫৩ পর্যন্ত) গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই দীর্ঘ পথে পূর্ব ও পশ্চিমের সংস্কৃতি, জ্ঞান ও শিল্পের মেলবন্ধন হতো। আর উজবেকিস্তান ছিল তার কেন্দ্রস্থল।

CISC-এ একটি জাদুঘর থাকবে, যেখানে প্রাক-ইসলামিক সভ্যতা, ইসলামী স্বর্ণযুগ, এবং উজবেকিস্তানের আধুনিক পুনর্জাগরণের উপর থিমভিত্তিক বিভাগগুলো থাকবে। কেন্দ্রে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি, অগমেন্টেড রিয়েলিটি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি বিভিন্ন প্রদর্শনীতে ব্যবহার করা হয়, যেমন প্রাক-ইসলামিক যুগের হলে প্রদর্শিত এই একটিতে।

পরে ১৫ ও ১৬ শতকে তিমুরিদ সাম্রাজ্য শিল্প, বিজ্ঞান ও কূটনীতির ক্ষেত্রে দ্বিতীয় রেনেসাঁ যুগের সাক্ষী হয়, যার কেন্দ্র ছিল সমরখন্দ। আর সে যুগের অনুপ্রেরণাতেই সিআইএসসি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি গড়ে তোলা হয়েছে।

ইসলামিক শিল্পে প্রাণী ও মানুষের মতো জীবন্ত সত্তার চিত্রায়ণ নিষিদ্ধ। এর পরিবর্তে নকশার বিবরণ জ্যামিতিক আকার এবং ফুলের নকশার উপর কেন্দ্রীভূত হয়, যেমন এই রেশমের কার্পেটগুলোতে দেখা যায়, অথবা জটিল ক্যালিগ্রাফি ব্যবহৃত হয়, যার মধ্যে রয়েছে কোরআনের আয়াত।

১৯ শতকে রাশিয়ার বিস্তারের কারণে মধ্য এশিয়ার অনেক অঞ্চল রুশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। পরে তা সোভিয়েত ইউনিয়নের অধীনে আসে। ওই সময় সেখানে ধর্মনিরপেক্ষ শাসন চালু হয় এবং ইসলামি চর্চা সীমিত করা হয়।

দেয়ালের মোজাইকগুলো বিভিন্ন যুগের বিখ্যাত চিন্তাবিদ ও দার্শনিকদের চিত্র প্রদর্শন করে।

আবদুখালিকভ বলেন, ‘সোভিয়েত যুগে আমাদের সাংস্কৃতিক সম্পদের একটি বড় অংশ দেশ থেকে চলে গিয়েছিল।’

কেন্দ্রটি বিদেশের ব্যক্তিগত সংগ্রহ ও নিলাম থেকে প্রায় ২,০০০টি বস্তু সংগ্রহ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে প্রাচীন পাণ্ডুলিপি।

১৯৯১ সালে উজবেকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করে। তখন থেকে দেশটির ইসলামি ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয় পুনরুজ্জীবিত হতে শুরু করে। এ লক্ষ্যেই সিআইএসসিকে তার ঐতিহাসিক জিনিসপত্র পুনরুদ্ধারের নির্দেশনা দেওয়া হয়।

সূত্র : সিএনএন 

আইএইচ/  
Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর