৩ থেকে ৫ কোটি ব্যারেল তেল ভেনেজুয়েলা থেকে কেনার ঘোষণা ট্রাম্পের
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৩১
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রকে বাজারদরে ৩ কোটি থেকে ৫ কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ করবে। এ তেল বিক্রি থেকে প্রাপ্ত অর্থ দুই দেশের জনগণের কল্যাণে ব্যবহার করা হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) এক বক্তব্যে ট্রাম্প এই ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে হোয়াইট হাউস শুক্রবার ভেনেজুয়েলা পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ তেল কোম্পানিগুলোর নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠকের আয়োজন করেছে।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক সূত্র জানায়, বৈঠকে এক্সন, শেভরন ও কনোকোফিলিপসের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। সংকটাপন্ন অবস্থায় থাকলেও ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদকে মার্কিন বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির জন্য খুলে দিতে দীর্ঘদিন ধরেই চাপ দিয়ে আসছে ট্রাম্প প্রশাসন।
এর আগে মঙ্গলবার ভোররাতে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে দেশটির নেতা নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার করে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়ার ঘটনায় অন্তত ২৪ জন ভেনেজুয়েলান নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছেন বলে কারাকাস কর্তৃপক্ষ জানায়। এ অভিযানের পর ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ ট্রাম্পের হুমকির জবাব দেন। ট্রাম্প সম্প্রতি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশ পরিচালনায় পরিবর্তন না আনলে রদ্রিগেজকে মাদুরোর চেয়েও ভয়াবহ পরিণতির মুখে পড়তে হবে।
সরকারি এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে রদ্রিগেজ বলেন, ‘যারা আমাকে হুমকি দিচ্ছেন, তাদের বলছি— আমার ভাগ্য তারা নির্ধারণ করেন না, ঈশ্বর করেন।’
ভেনেজুয়েলার অ্যাটর্নি জেনারেল তারেক উইলিয়াম সাব জানান, সপ্তাহান্তের ওই অভিযানে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও বেসামরিক নাগরিকসহ ‘ডজনখানেক’ মানুষ নিহত হয়েছেন। তিনি ঘটনাটিকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ আখ্যা দিয়ে তদন্তের ঘোষণা দেন।
এর পাশাপাশি কিউবা সরকার নিশ্চিত করেছে, ভেনেজুয়েলায় কর্মরত তাদের ৩২ জন সামরিক ও পুলিশ সদস্য ওই অভিযানে নিহত হয়েছেন। তারা কিউবার বিপ্লবী সশস্ত্র বাহিনী ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সদস্য ছিলেন।
পেন্টাগনের তথ্যমতে, অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের সাতজন সেনা আহত হন। এর মধ্যে পাঁচজন ইতোমধ্যে দায়িত্বে ফিরেছেন, দুজন চিকিৎসাধীন। আহতদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ ও শার্পনেলের আঘাত পাওয়া সদস্য রয়েছেন।
এদিকে ভেনেজুয়েলার সামরিক বাহিনীর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে নিহত সদস্যদের স্মরণে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে ধ্বংসপ্রাপ্ত সাঁজোয়া যান ও কারাকাসের আকাশে উড়তে থাকা মার্কিন বিমানের দৃশ্য দেখা যায়। মাদুরো গ্রেপ্তারের পর কয়েক দিন ফাঁকা থাকা কারাকাসের রাস্তায় পরে সরকার সমর্থনে মানুষকে ভেনেজুয়েলার পতাকা হাতে সমবেত হতে দেখা যায়।
তেলের বাজার ও অর্থনৈতিক দিক
বর্তমানে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম প্রায় ৫৬ ডলার। সে হিসাবে ট্রাম্প ঘোষিত তেল সরবরাহ চুক্তির মূল্য দাঁড়াতে পারে সর্বোচ্চ ২৮০ কোটি ডলার। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল ও তেলজাত পণ্য ব্যবহার করে। ফলে ভেনেজুয়েলা থেকে আসা তেল যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় আড়াই দিনের চাহিদার সমান।
বিশ্বের সর্ববৃহৎ প্রমাণিত তেল মজুত থাকা সত্ত্বেও ভেনেজুয়েলা বর্তমানে দৈনিক গড়ে মাত্র ১০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দৈনিক উৎপাদন প্রায় ১ কোটি ৩৯ লাখ ব্যারেল।
ট্রাম্পের ঘোষণার বিষয়ে ভেনেজুয়েলা সরকারের প্রেস অফিস তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
আঞ্চলিক উত্তেজনা
এদিকে ভেনেজুয়েলার প্রতিবেশী গায়ানার উপকূলে এক বিশাল তেলক্ষেত্র উন্নয়ন করছে এক্সনমোবিল। ২০১৫ সালের ওই তেল আবিষ্কারের পর ভেনেজুয়েলা গায়ানার সঙ্গে পুরোনো সীমান্ত বিরোধ আবার জোরালো করে এবং এসেকুইবো অঞ্চল দখলের পদক্ষেপ নেয়। এ নিয়ে ভেনেজুয়েলা সরকার ও এক্সনমোবিলের বিরুদ্ধে গায়ানার পক্ষ থেকে একাধিক অভিযোগ উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও মাদুরো গ্রেপ্তার ইস্যুতে বিতর্ক চলছে। ট্রাম্প ডেমোক্র্যাটদের সমালোচনার জবাবে বলেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তারের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
ওয়াশিংটন পোস্ট ও এসএসআরএসের এক জরিপে দেখা গেছে, মাদুরোকে গ্রেপ্তারে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের পক্ষে ও বিপক্ষে মত প্রায় সমান। তবে প্রায় ৪৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ভেনেজুয়েলার সরকার পরিবর্তনে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন।
এ ঘটনার প্রভাব লাতিন আমেরিকা ছাড়িয়ে ইউরোপেও পড়েছে। ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ড, স্পেন ও যুক্তরাজ্য ডেনমার্কের সঙ্গে যৌথ বিবৃতিতে গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
সূত্র : এপি
এমএইচএস

