বিবিসির অনুসন্ধান
তালেবানের শীর্ষ নেতৃত্বে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব উন্মোচন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৩০
সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা (মাঝখানে) ‘নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী’, দাবি করেন তার মুখপাত্র। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিরাজউদ্দিন হাক্কানি (বাঁয়ে) ও ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোহাম্মদ ইয়াকুব (ডানে)-সহ কয়েকজন মন্ত্রী তার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ছবি : বিবিসি
আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন তালেবান নেতৃত্বের একেবারে শীর্ষ পর্যায়ে গভীর বিভাজন ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের ইঙ্গিত মিলেছে। দেশটিতে হঠাৎ ইন্টারনেট ও টেলিফোন পরিষেবা বন্ধের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়, তা শেষ পর্যন্ত তালেবানের অভ্যন্তরীণ সংঘাতকে প্রকাশ্যে এনে দেয়। এক বছরব্যাপী বিবিসির অনুসন্ধানে এ তথ্য উঠে এসেছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে কান্দাহারের একটি মাদ্রাসায় দেওয়া এক গোপন বক্তৃতায় তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা সতর্ক করে বলেন, ‘সরকারের ভেতরের লোকজন’ যদি একে অপরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তবে ইসলামি আমিরাত ভেঙে পড়তে পারে। ফাঁস হওয়া ওই অডিও বার্তায় তিনি বলেন, এই বিভাজনই একদিন তাদের সবাইকে ডুবিয়ে দেবে।
এই বক্তব্য তালেবানের শীর্ষ পর্যায়ে বিভক্তির গুঞ্জনকে আরও জোরালো করে তোলে। যদিও নেতৃত্ব বরাবরই এ ধরনের বিভক্তির কথা অস্বীকার করে আসছে। তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়— বাস্তবে তালেবানের ভেতরে অন্তত দুটি শক্তিশালী ও ভিন্নমুখী গোষ্ঠী সক্রিয়।
একটি গোষ্ঠী পুরোপুরি আখুন্দজাদার অনুগত, যাদের ঘাঁটি দক্ষিণাঞ্চলের কান্দাহার। এই গোষ্ঠী আফগানিস্তানকে একটি কঠোর, বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন ইসলামি আমিরাত হিসেবে পরিচালনা করতে চায়, যেখানে ধর্মীয় আলেমরা সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রায় সব ক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করবেন।
অন্যদিকে রয়েছে কাবুলকেন্দ্রিক গোষ্ঠী। এই দলে আছেন তালেবানের প্রভাবশালী মন্ত্রী, যোদ্ধা ও রাজনৈতিক নেতারা। তারা ইসলামি শাসন বজায় রাখার পক্ষে থাকলেও, একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগ, অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং সীমিত পরিসরে হলেও নারীদের শিক্ষা ও কাজের সুযোগ দেওয়ার কথা ভাবছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে এই দ্বন্দ্বকে বলা হয়— ‘কান্দাহারের ঘর বনাম কাবুল’।
এই বিভাজন সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের শেষে। তখন আখুন্দজাদা সারাদেশে ইন্টারনেট ও টেলিফোন পরিষেবা বন্ধের নির্দেশ দেন। এর ফলে আফগানিস্তান কার্যত কয়েক দিনের জন্য বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কিন্তু তিন দিনের মাথায় কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই ইন্টারনেট আবার চালু হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই সিদ্ধান্ত বাতিলের পেছনে ছিল কাবুল গোষ্ঠীর সরাসরি হস্তক্ষেপ। আখুন্দজাদার আদেশ অমান্য করে তারা প্রধানমন্ত্রী মোল্লা হাসান আখুন্দকে ইন্টারনেট পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত নিতে রাজি করান। তালেবানের ইতিহাসে এটিকে নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তালেবান আন্দোলনের ভিত্তিই হলো ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য। সে জায়গা থেকে সর্বোচ্চ নেতার স্পষ্ট নির্দেশ অমান্য করা প্রায় বিদ্রোহের শামিল। এক অভ্যন্তরীণ সূত্রের ভাষায়, এটি ‘বিদ্রোহের চেয়ে কম কিছু ছিল না’।
ক্ষমতায় ফেরার পর ধীরে ধীরে আখুন্দজাদা কান্দাহারকে কেন্দ্র করে ক্ষমতা সংহত করেছেন। সাবেক দুই ডেপুটি—সিরাজউদ্দিন হাক্কানি ও মোল্লা ইয়াকুব মুজাহিদকে মন্ত্রিসভায় নামিয়ে আনা হয়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দোহা চুক্তির নেতৃত্ব দেওয়া আবদুল গনি বারাদারও উপ-প্রধানমন্ত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেন।
কাবুলভিত্তিক মন্ত্রীদের সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই কান্দাহার থেকে ফরমান জারি, নারীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ওপর কড়াকড়ি এবং নৈতিকতা সংক্রান্ত কঠোর বিধিনিষেধ— এসব বিষয় দুই গোষ্ঠীর মধ্যে উত্তেজনার প্রধান উৎস হয়ে ওঠে।
বিশ্লেষকদের মতে, কাবুল গোষ্ঠীর নেতারা ‘পৃথিবী দেখেছে’। তারা বুঝতে পারছেন, আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা ও অর্থনৈতিক অচলাবস্থায় বর্তমান কাঠামো দীর্ঘদিন টিকবে না। তবে তারা নিজেদের মধ্যপন্থী নয়, বরং ‘বাস্তববাদী’ হিসেবে দেখেন।
ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্ত তাদের স্বার্থে সরাসরি আঘাত হানে। কারণ শাসনব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং ক্ষমতার সুবিধা—সবই কোনো না কোনোভাবে ডিজিটাল যোগাযোগের ওপর নির্ভরশীল। এ কারণেই তারা এবার ঝুঁকি নিতে বাধ্য হন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ইন্টারনেট পুনরায় চালু হলেও এই ঘটনার মধ্য দিয়ে তালেবানের অভ্যন্তরীণ ঐক্য যে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, তা স্পষ্ট। যদিও তালেবান মুখপাত্ররা এখনো প্রকাশ্য বিভাজনের কথা অস্বীকার করছেন এবং একে ‘পরিবারের ভেতরের মতভেদ’ বলে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন।
তবুও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে— এই মতভেদ কি শুধু কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এক সময় তা বাস্তব পরিবর্তনের দিকে যাবে? বিশেষ করে আফগানিস্তানের নারী ও সাধারণ জনগণের জন্য এর কোনো অর্থবহ প্রভাব পড়বে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
সূত্র : বিবিসি

