দিল্লিতে প্রথমবারের মতো প্রেস কনফারেন্সে যুক্ত হলেন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:২৩
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয়ে বাংলাদেশ ত্যাগের পর নির্বাসনে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্য প্রেস কনফারেন্সে বক্তব্য দিয়েছেন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংগঠিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে গেল বছরের ১৭ নভেম্বর তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তার বিরুদ্ধে আনা পাঁচটি অভিযোগের দুইটিতে মৃত্যুদণ্ড ও অপরটিতে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এই দণ্ড নিয়েই তিনি বিদেশে বসে দেশকে অস্থিতিশীল করতে অনলাইনে নানা বক্তব্য দিয়ে আসছিলেন। সবশেষ শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়েও একই ধরনের বক্তব্য দিলেন।
ভারতে অনুষ্ঠিত ওই প্রেস কনফারেন্সে দেওয়া বক্তব্যে তিনি নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণাত্মক ভাষায় ‘খুনি ফ্যাসিস্ট’, ‘অবৈধ ও সহিংস শাসক’, ‘সুদখোর’, ‘অর্থ পাচারকারী’ এবং ‘ক্ষমতার লোভী বিশ্বাসঘাতক’ বলে আখ্যা দেন। ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এই প্রেস কনফারেন্স বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্র রক্ষা করুন’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে অডিও বার্তার মাধ্যমে বক্তব্য দেন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা। একটি হলরুমে সম্প্রচারিত ওই বক্তব্যে তিনি বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংকটকে দেশের সার্বভৌমত্ব ও সংবিধানের জন্য একটি ‘অস্তিত্বগত লড়াই’ হিসেবে তুলে ধরেন এবং তার সমর্থকদের তথাকথিত ‘বিদেশি-দাস পুতুল শাসন’ উৎখাতের আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের একাধিক সাবেক মন্ত্রী এবং বাংলাদেশি প্রবাসী সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। শেখ হাসিনা সশরীরে উপস্থিত না থাকলেও তার বক্তব্যে ভাষা ছিল অত্যন্ত আক্রমণাত্মক।
গেল সপ্তাহে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘ভারতে অবস্থান করে শেখ হাসিনার কোনো ধরনের রাজনৈতিক বিবৃতি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার প্রত্যাশা করে না। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভারতে বসে শেখ হাসিনার বিবৃতি দেওয়া বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের জন্য কোনো ভালো উদাহরণ সৃষ্টি করবে না। অন্তর্বর্তী সরকার এমন কোনো তৎপরতা সমর্থন বা প্রত্যাশা করে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এছাড়াও সম্প্রতি নিরাপত্তাশঙ্কায় ভারতে টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত জানায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এ নিয়ে উত্তেজনা চলাকালেই শেখ হাসিনা ভারতে বসে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে নিজের মতামত তুলে ধরলেন।
বক্তব্যের শুরুতে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধ ও তার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের উত্তরাধিকার স্মরণ করে বলেন, ‘বাংলাদেশ আজ এক অতল গহ্বরের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে।’
তিনি বিষোদগার করেন, দেশটি এখন ‘একটি বিশাল কারাগার, একটি ফাঁসির ক্ষেত্র ও একটি মৃত্যু উপত্যকায়’ পরিণত হয়েছে। তার ভাষ্যে, চরমপন্থী শক্তি ও বিদেশি স্বার্থ বাংলাদেশের ধ্বংস ডেকে আনছে।
প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী এই বক্তব্যে ঢাকার বর্তমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযোগ তোলেন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা। তিনি দাবি করেন, তাকে ‘সূক্ষ্মভাবে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের’ মাধ্যমে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জোরপূর্বক ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
ওই সময়ের পর থেকে, তার ভাষায়, ‘জাতি সন্ত্রাসের যুগে নিমজ্জিত হয়েছে, গণতন্ত্র এখন নির্বাসনে।’
তিনি অভিযোগ করেন, মানবাধিকার ‘ধুলোয় পদদলিত’, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ধ্বংস হয়েছে এবং নারী ও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়ছে।
‘জীবন ও সম্পত্তির কোনো নিরাপত্তা নেই। আইন-শৃঙ্খলা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে,’ বলে অভিযোগ করেন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা।
তিনি বাংলাদেশে ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে তীব্র আক্রমণ করেন। ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন, ইউনূস বাংলাদেশকে রক্তাক্ত করছেন এবং বিদেশি স্বার্থের বিনিময়ে দেশের ভূখণ্ড ও সম্পদ তুলে দিয়ে দেশকে ‘বহুজাতিক সংঘাতের আগুনে’ ঠেলে দিচ্ছেন।
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়ে প্রায় ১৪০০ হত্যার ঘটনায় সরকার পরিচালনা করা ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা বলেন, ‘জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে খুনি ফ্যাসিস্ট ইউনূস আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।’
তিনি একে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে একটি ‘বিশ্বাসঘাতক চক্রান্ত’ বলে উল্লেখ করেন।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেন। এর মধ্যে একটি ছিল ধর্মীয় সংখ্যালঘু, নারী এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তায় ‘আয়রনক্ল্যাড গ্যারান্টি’ নিশ্চিত করা এবং লক্ষ্যভিত্তিক হামলা বন্ধ করা।
আরেক দফায় তিনি সাংবাদিক, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও বিরোধী মতের মানুষদের দমনে ব্যবহৃত ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আইন’ বন্ধের আহ্বান জানান এবং বিচার বিভাগকে ‘নিরপেক্ষ ও মহৎ প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে পুনর্গঠনের কথা বলেন।
সবশেষে তিনি জাতিসংঘের কাছে গত বছরের ঘটনাবলীর ‘নতুন ও সত্যিকার অর্থে নিরপেক্ষ তদন্ত” দাবি করেন। তার মতে, কেবল ‘সত্যের শুদ্ধিকরণ’ই দেশকে ঐক্যবদ্ধ পথে এগিয়ে নিতে পারে।
সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আপনাদের পাশে আছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জনগণের কণ্ঠস্বর শুনতে ব্যর্থ হয়েছে।’
তিনি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘একসঙ্গে আমরা শক্তিশালী, একসঙ্গে আমরা আমাদের দাবি জানাতে পারি।’
ভারতে যাওয়ার পর এটিই ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার প্রথম প্রকাশ্য বক্তব্য, যা ইঙ্গিত দেয়- তিনি বিদেশে অবস্থান করেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভূমিকা রাখতে চান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ভারতে পালিয়ে যান তিনি।
ভারতে নির্বাসিত অবস্থান থেকেই ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা রাজনৈতিক বৈধতা পুনরুদ্ধার এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
‘এখনই হাল ছেড়ে দেবেন না,’-বাংলাদেশের জনগণের উদ্দেশে আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন তিনি।
‘যারা আমাদের দেশ ধ্বংস করতে চায়, তাদের হাত থেকে জাতিকে ফিরিয়ে আনার সংগ্রামে আমাদের সঙ্গে যোগ দিন। বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনর্গঠনে সহায়তা করুন।’

