এপির অনুসন্ধান
চাকরির প্রলোভনে রাশিয়া, শেষে যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশিরা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ২০:৩৬
ইউক্রেনের সেনাবাহিনী। ছবি: এএফপি (ফাইল)
চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে বাংলাদেশি শ্রমিকদের ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখভাগে পাঠানো হচ্ছে—এমন ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)-এর এক অনুসন্ধানে।
বাংলাদেশের লক্ষ্মীপুরের বাসিন্দা মাকসুদুর রহমানকে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চাকরির আশ্বাস দিয়ে এক দালাল রাশিয়ায় পাঠান। তবে সেখানে পৌঁছানোর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি নিজেকে ইউক্রেন যুদ্ধের সামনের সারিতে দেখতে পান।
এপি জানায়, বাংলাদেশি শ্রমিকদের বেসামরিক চাকরির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাশিয়ায় আনা হয়। পরে তাদের জোরপূর্বক যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়। অনেকে আদেশ না মানলে কারাদণ্ড, মারধর কিংবা মৃত্যুর হুমকির মুখে পড়েন।
মাকসুদুর রহমানসহ তিনজন বাংলাদেশি যুবক জানান, মস্কো পৌঁছানোর পর রুশ ভাষায় লেখা কিছু কাগজে তাঁদের সই করানো হয়। পরে তারা জানতে পারেন, সেগুলো ছিল সামরিক চুক্তি। এরপর তাঁদের সেনা ক্যাম্পে নিয়ে ড্রোন যুদ্ধ, অস্ত্র ব্যবহার ও প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
রহমান আপত্তি জানালে এক রুশ কর্মকর্তা অনুবাদ অ্যাপের মাধ্যমে বলেন, ‘তোমাদের এজেন্টই তোমাদের এখানে পাঠিয়েছে। আমরা তোমাদের কিনেছি।’
ভুক্তভোগীরা জানান, তাঁদের জোর করে যুদ্ধের সামনের সারিতে পাঠানো হতো। পাশাপাশি মালামাল বহন, আহতদের উদ্ধার এবং মৃতদেহ সংগ্রহের কাজেও বাধ্য করা হয়।
রহমান বলেন, কাজ না করলে তাঁদের ১০ বছরের কারাদণ্ডের হুমকি দেওয়া হতো এবং মারধর করা হতো। সাত মাস পর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে সেখান থেকে পালিয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় তিনি দেশে ফিরতে সক্ষম হন।
কতজন বাংলাদেশি এভাবে প্রতারিত হয়েছেন, তার সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। তবে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, তাঁরা শতাধিক বাংলাদেশিকে রুশ বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে দেখেছেন।
এপি জানায়, ভারত ও নেপালসহ আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নাগরিকদেরও একইভাবে নিয়োগ করা হয়েছে।
আরেক ভুক্তভোগী মোহান মিয়াজি বলেন, তাঁকে ইলেকট্রিশিয়ানের কাজের কথা বলে সেনাবাহিনীতে নেওয়া হয়। পরে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। আদেশ অমান্য করলে তাঁকে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।
ভাষা না বোঝার কারণে ভুল করলে নির্মমভাবে মারধর করা হতো বলেও জানান তিনি।
লক্ষ্মীপুরের অনেক পরিবার এখনও নিখোঁজ স্বজনদের পাঠানো কাগজপত্র আঁকড়ে ধরে আছেন—একদিন তাঁরা ফিরে আসবেন, এই আশায়।
সালমা আক্তার বলেন, তাঁর স্বামী আজগর হোসেন ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে লন্ড্রি কর্মীর চাকরির আশায় রাশিয়ায় যান। পরে তিনি জানান, তাঁকে জোর করে যুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে। এরপর থেকে তাঁর আর কোনো খোঁজ নেই।
শেষবার তিনি স্ত্রীকে বলেছিলেন, ‘আমার জন্য দোয়া করো।’
বাংলাদেশি শ্রমিকদের সহায়তাকারী সংস্থা ব্র্যাক ২০২৪ সালের শেষ দিকে বিষয়টি তদন্ত করে অন্তত ১০ জন নিখোঁজ শ্রমিকের তথ্য পায়।
ব্র্যাকের কর্মকর্তা শরীফুল ইসলাম বলেন, এ ক্ষেত্রে দুই থেকে তিন স্তরের দালালচক্র জড়িত রয়েছে।
বাংলাদেশ পুলিশও একটি মানবপাচার চক্রের সন্ধান পেয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণা, এ পর্যন্ত প্রায় ৪০ জন বাংলাদেশি এই যুদ্ধে মারা গিয়ে থাকতে পারেন।
তদন্তে জানা গেছে, স্থানীয় এজেন্টরা কেন্দ্রীয় দালালের মাধ্যমে শ্রমিকদের রাশিয়ায় পাঠাতেন। নিখোঁজদের পরিবার জানায়, তারা এখনো কোনো অর্থ পাননি।
সূত্র: এপি
এএস/

