এপস্টেইন নথিতে নাম, লেবার পার্টি ছাড়লেন লর্ড ম্যান্ডেলসন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:০৯
যৌন অপরাধী এপস্টেইন সম্পর্কিত নথিতে নাম আসার পর যুক্তরাজ্যে লেবার পার্টি থেকে পদত্যাগ করেছেন সাবেক মন্ত্রী লর্ড ম্যান্ডেলসন। ছবি : সংগৃহীত
যৌন অপরাধী এপস্টেইন সম্পর্কিত নথিতে নাম আসার পর যুক্তরাজ্যে লেবার পার্টি থেকে পদত্যাগ করেছেন সাবেক মন্ত্রী লর্ড ম্যান্ডেলসন। স্থানীয় সময় রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) দেওয়া এক চিঠিতে লেবার পার্টির মহাসচিবকে তিনি বলেন, নতুন করে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরির কারণ তিনি হতে চান না। খবর বিবিসি’র।
এপস্টেইনের সাথে অতীতে যোগসূত্র থাকার কারণে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূতের পদ থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ নতুন করে যেসব নথি প্রকাশ করেছে সেখানেও তার নাম এসেছে। এসব নথি অনুযায়ী, ২০০৩ ও ২০০৪ সালে এপস্টেইন পঁচিশ হাজার ডলার করে তিন দফায় লর্ড ম্যান্ডেলসনকে মোট পঁচাত্তর হাজার ডলার দিয়েছিলেন।
লেবার পার্টির জেনারেল সেক্রেটারিকে দেওয়া চিঠিতে লর্ড ম্যান্ডেলসন বলেন, ‘এ সপ্তাহান্তে জেফরি এপস্টেইনকে নিয়ে তৈরি হওয়া ক্ষোভের সঙ্গে আমি আবারও যুক্ত হয়ে পড়েছি এবং এতে আমি অনুতপ্ত বোধ করছি এবং এ বিষয়ে দু:খিত’।
তিনি আরও বলেন, ‘কুড়ি বছর আগে আমাকে অর্থ দেওয়ার অভিযোগ মিথ্যা বলেই আমি বিশ্বাস করি। এর কোনো প্রমাণ নেই এবং আমি মনে করতে পারছি না। এগুলো আমাদের যাচাই করে দেখতে হবে।’
‘এটি করার সময় আমি লেবার পার্টির জন্য নতুন করে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করতে চাই না এবং সেজন্য আমি দলের সদস্যপদ থেকে সরে যাচ্ছি।’
তিনি বলেন, ‘আমি আবারও সেই নারী ও মেয়েদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ নিতে চাই, যাদের কথা অনেক আগেই শোনা উচিত ছিল। আমি সারা জীবন লেবার পার্টির আদর্শ ও সাফল্যের জন্য নিবেদিত ছিলাম, আর এই সিদ্ধান্ত নিয়ে দলের স্বার্থেই কাজ করছি বলে মনে করছি।’
এর আগে রোববার লর্ড ম্যান্ডেলসন বলেছিলেন নতুন প্রকাশিত নথিগুলো বস্তুনিষ্ঠ কি-না সেটি তিনি জানেন না।
এপস্টেইনের সাথে কখনো পরিচিত হবার জন্যই আবারো দু:খ প্রকাশ করেছেন তিনি। এপেস্টেইন দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরও তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন তিনি। পাশাপাশি তিনি স্পষ্টভাবে ভুক্তভোগী নারী ও মেয়েদের কাছে ক্ষমা চান।
লেবার দলের এমপি গর্ডন ম্যাকি বিবিসি রেডিও ৪–কে বলেন, এপস্টেইন–সংক্রান্ত সাম্প্রতিক তথ্য প্রকাশ পাওয়ায় তার ভুক্তভোগীরা ‘ন্যায্যভাবেই ক্ষুব্ধ’ হবেন। তিনি আরও বলেন, লর্ড ম্যান্ডেলসন লেবার পার্টি থেকে পদত্যাগ করে ‘সঠিক কাজটাই’ করেছেন।
কনজারভেটিভ পার্টির এক মুখপাত্র প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের সমালোচনা করে বলেন, ম্যান্ডেলসনকে বহিষ্কার না করে তাকে নিজে থেকে পদত্যাগ করতে দেওয়াটা ভুল ছিল।
এর আগে রোববার কনজারভেটিভ নেতা কেমি ব্যাডেনক দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রী যেন লর্ড ম্যান্ডেলসনের পার্টি সদস্যপদ স্থগিত করেন এবং এপস্টেইনের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে তদন্ত শুরু করেন।
এদিকে, হাউজিং সেক্রেটারি স্টিভ রিড বলেন, লর্ড ম্যান্ডেলসনের সঙ্গে এপস্টেইনের কথিত আর্থিক সম্পর্কের বিষয়ে সরকার আগে কিছু জানত না। বিবিসির লরা কুনসবার্গ এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি এ কথা বলেন।
লর্ড ম্যান্ডেলসনের দীর্ঘকাল ধরেই লেবার পার্টির সাথে যুক্ত থাকার ইতিহাস আছে। তার দাদা হার্বার্ট মরিসন১৯৪৫ সালে ক্লেমেন্ট অ্যাটলির সরকারের একজন মন্ত্রী ছিলেন। লর্ড ম্যান্ডেলসন ১৯৮০–এর দশক থেকেই লেবার পার্টির হয়ে কাজ শুরু করেন।
স্যার কিয়ের স্টারমার তাকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তাকে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত হিসেবে ওয়াশিংটনে পাঠিয়েছিলেন। যদিও পরের বছরের সেপ্টেম্বরে এপস্টিনের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব নিয়ে নতুন তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর তাকে ওই পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে তিনি হাউস অব লর্ডস থেকে ছুটিতে ছিলেন।
ইমেইল থেকে জানা যায়, ২০০৮ সালে এপস্টেইন দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরও লর্ড ম্যান্ডেলসন তার সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন এবং তাকে সমর্থনমূলক বেশ কয়েকটি বার্তাও পাঠান।
এপস্টেইন ২০০৮ সালে সমঝোতার মাধ্যমে দোষ স্বীকার করেছিলেন। তিনি সে সময় কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন।
পরে ২০১৯ সালে যৌন পাচারের মামলা বিচার শুরুর অপেক্ষায় থাকাকালে নিউইয়র্কের একটি কারাগারে এপস্টিনের মৃত্যু হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ সবশেষ যেসব নথি প্রকাশ করেছে সেগুলো এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত প্রকাশিত সবচেয়ে বড় সংখ্যক নথি।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে প্রকাশিত একটি রিপোর্টে প্রথম উঠে আসে যে, এসব নথির মধ্যে থাকা ব্যাংক স্টেটমেন্টে এপেস্টেইনের জেপি মরগান ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে লর্ড ম্যান্ডেলসনের নামে তিনটি আলাদা অর্থপ্রদানের তথ্য আছে।
লর্ড ম্যান্ডেলসন সে সময় হার্টলপুলের লেবার এমপি ছিলেন। তবে এ তিনটি পেমেন্টের অর্থ আদৌ সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলোতে জমা হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত নয়।
সর্বশেষ নথিতে যুক্তরাষ্ট্রে সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত লর্ড ম্যান্ডেলসনের কিছু ছবিও পাওয়া গেছে, যেখানে তাকে অন্তর্বাস পরা অবস্থায় দেখা যায়। যদিও এটি পরিষ্কার নয় যে কোথায় এগুলো তোলা হয়েছে।
লর্ড ম্যান্ডেলসন বলেন, তিনি ছবিটির স্থান বা ওই নারীকে চিনতে পারছেন না এবং ছবিটি কোন পরিস্থিতিতে তোলা হয়েছিল, তাও তার মনে নেই।
নথিতে কারও নাম বা ছবি থাকা মানেই কোনো অপরাধ প্রমাণ হয় না।
শুক্রবার প্রকাশিত ইমেইলগুলোতে দেখা যায়, এপস্টেইনের অনুরোধে লর্ড ম্যান্ডেলসন ব্যাংকারদের বোনাসের ওপর প্রস্তাবিত কর নীতিতে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছিলেন।
২০০৯ সালের ডিসেম্বরে তিনি এপস্টেইনকে লিখেছেন, ‘পরিবর্তনের জন্য জোর চেষ্টা করছি। ট্রেজারি শক্ত অবস্থানে আছে, তবে আমি বিষয়টি দেখছি।’
সে সময় লর্ড ম্যান্ডেলসন গর্ডন ব্রাউনের সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন। বিবিসিকে তিনি বলেন যে, সেসময় যুক্তরাজ্য ও আন্তর্জাতিক সব ব্যাংক একই দাবি করছিল। তিনি বলেন, তিনি আর্থিক খাতের মতামতই তুলে ধরেছিলেন, কোনো ব্যক্তির নয়।
এমবি

