Logo

আন্তর্জাতিক

দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কমছে, খুশি দুর্নীতিবাজ রাজনীতিকরা

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০:৩৫

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কমছে, খুশি দুর্নীতিবাজ রাজনীতিকরা

ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা দ্রুত কমে যাওয়ায় খুশি দুর্নীতিবাজ রাজনীতিকরা। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ভুলত্রুটি, পক্ষপাত কিংবা অতিরঞ্জনের অভিযোগ থাকলেও গণতন্ত্র ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্বাধীন সাংবাদিকতার ভূমিকা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (আরএসএফ)-এর সূচক অনুযায়ী, ২০১৪ সালের পর থেকে বিশ্বব্যাপী সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার মান উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। একসময় যেসব দেশের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের মতো ছিল, সেগুলোর অনেকটাই এখন সার্বিয়ার মতো অবস্থানে নেমে এসেছে। সেখানে দুর্নীতিবিরোধী বিক্ষোভ কাভার করতে গিয়ে সাংবাদিকদের পুলিশি নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি কেবল বাকস্বাধীনতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর একটি মৌলিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। ক্ষমতাবানরা যখন জানে যে তাদের অপব্যবহার প্রকাশ পাবে না, তখন সেই অপব্যবহার আরও বাড়ে।

সুইডেনভিত্তিক গবেষণা প্রকল্প ভি-ডেমের প্রায় ৮০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্য ইকোনমিস্ট দেখিয়েছে, সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ ও দুর্নীতি বৃদ্ধির মধ্যে একটি ‘ফিডব্যাক লুপ’ কাজ করে। রাজনীতিকরা যখন লুটপাটে আগ্রহী হয়, তখন তারা প্রথমে সংবাদমাধ্যমকে চেপে ধরে। সংবাদমাধ্যম যত বেশি নিয়ন্ত্রিত হয়, দুর্নীতি তত সহজ হয়। আবার দুর্নীতি যত বাড়ে, সমালোচনামূলক প্রতিবেদন ঠেকানোর আগ্রহও তত বাড়ে।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কোনো দেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা যদি কানাডার মতো ভালো অবস্থা থেকে ইন্দোনেশিয়ার মতো খারাপ অবস্থায় নেমে যায়, তাহলে দুর্নীতির মাত্রা আয়ারল্যান্ডের মতো তুলনামূলক স্বচ্ছ অবস্থা থেকে লাটভিয়ার মতো অস্বচ্ছ অবস্থায় পৌঁছানোর আশঙ্কা তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে ঘটে, ফলে ভোটাররা অনেক সময় পরবর্তী নির্বাচনের আগে তা টেরই পান না। বিশেষ করে জনতাবাদী সরকারগুলোর অধীনে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়।

গণতন্ত্রের মোড়কে নিয়ন্ত্রণ

উদ্বেগজনক দিক হলো, নিজেদের গণতান্ত্রিক বলে দাবি করা সরকারগুলোও এখন কর্তৃত্ববাদী শাসনের কৌশল অনুসরণ করছে। তারা সরাসরি সত্য প্রকাশ বন্ধ না করে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করছে, যেখানে ক্ষমতাসীনদের প্রশংসা জোরালোভাবে শোনা যায়, আর ভিন্নমত কেবল ক্ষীণ ফিসফাসে সীমাবদ্ধ থাকে।

এ জন্য সরকারি সম্প্রচারমাধ্যমে অনুগত ব্যক্তিদের নিয়োগ, রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞাপন অনুগত পত্রিকায় দেওয়া কিংবা সরকারি কাজের ওপর নির্ভরশীল ধনকুবেরদের দিয়ে স্বাধীন সংবাদমাধ্যম কিনে নিয়ে কার্যত নিস্ক্রিয় করে দেওয়ার মতো কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় অনড় থাকা গণমাধ্যমগুলোর ওপর বাড়ানো হচ্ছে চাপ। সরকারি বিজ্ঞাপন তো বটেই, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখতে বলা হচ্ছে। নিয়মিত কর নিরীক্ষা ও হয়রানিমূলক মামলা তাদের নিত্যদিনের বাস্তবতা। আরএসএফের জরিপে দেখা গেছে, ১৮০ দেশের মধ্যে ১৬০টিতেই সংবাদমাধ্যম আর্থিকভাবে টিকে থাকার লড়াইয়ে রয়েছে।

ব্যক্তিগত পর্যায়েও সাংবাদিকরা লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন। বিশেষ করে নারী সাংবাদিকরা অনলাইন হয়রানি ও হুমকির শিকার হচ্ছেন বেশি। জাতিসংঘের এক জরিপে দেখা গেছে, ৭৫ শতাংশ নারী সাংবাদিক অনলাইনে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং ৪২ শতাংশ সরাসরি হুমকি বা হয়রানির মুখে পড়েছেন। অনেক দেশে জাতীয় নিরাপত্তা কিংবা ‘ভুয়া খবর’ দমনের আইনের আওতায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে।

প্রযুক্তি ও নতুন চ্যালেঞ্জ

ডিজিটাল প্রযুক্তি একদিকে যেমন নতুন কণ্ঠকে প্রকাশের সুযোগ দিয়েছে, অন্যদিকে সরকারগুলোকেও দিয়েছে নজরদারির নতুন অস্ত্র। কিছু দেশে বিক্ষোভের সময় ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। আবার কোথাও সাংবাদিকদের ফোন হ্যাক করে তথ্যসূত্র শনাক্ত করা হচ্ছে, ব্যক্তিগত ছবি ফাঁস করে ভয় দেখানো হচ্ছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাও এখানে বদলে গেছে। একসময় বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে সক্রিয় থাকা যুক্তরাষ্ট্র এখন সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে। স্বাধীন আন্তর্জাতিক সম্প্রচারমাধ্যমে সহায়তা বন্ধ হওয়ায় বিভিন্ন দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসকেরা আরও সাহস পাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবাদমাধ্যমের জবাবদিহি থাকা দরকার—এ কথা সত্য। তবে সাংবাদিকদের কাজ করতে বাধা দিলে সমাজকেই তার মূল্য দিতে হবে। শক্তিশালী সংবাদমাধ্যম কাঠামো একবার ধ্বংস হলে তা পুনর্গঠন করা কঠিন। আর সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কমে গেলে বিশ্ব আরও দুর্নীতিগ্রস্ত এবং আরও খারাপভাবে শাসিত হবে।

এএস/

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

দুর্নীতি

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর