ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ হামলার পর পারস্য উপসাগরে যাওয়ার একমাত্র সামুদ্রিক প্রবেশপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার কঠোর প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। গত শনিবার রাতে ইরানের আধা সরকারি তাসনিম নিউজ এজেন্সির খবরে এ তথ্য জানানো হয়।
ইরানি নৌবাহিনীর এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের ফলে বর্তমানে এই সরু জলপথ দিয়ে সব ধরনের জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ৭০ শতাংশের বেশি কমে গেছে বলে জানা গেছে।
হরমুজ প্রণালি কী: হরমুজ প্রণালি মধ্যপ্রাচ্যের ওমান উপসাগর এবং পারস্য উপসাগরের মধ্যে একটি সরু জলপথ। এটি প্রায় ৫৬ কিলোমিটার চওড়া এবং বিশ্বের প্রধান তেল রপ্তানির পথ হিসেবে পরিচিত। প্রণালির একপাশে ইরান, অন্যপাশে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। এই প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে এবং ইরানকে আরব উপদ্বীপ থেকে আলাদা করেছে। হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে বৈশ্বিক বাণিজ্যপথ নিয়ন্ত্রণে সুযোগ রয়েছে ইরানের। বিশ্বে সমুদ্রপথে যে পরিমাণ জ্বালানি উপকরণ পরিবহন করা হয়, এর বড় অংশই সম্পন্ন হয় এই প্রণালির মধ্য দিয়ে। এই প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি রুট, যা সৌদি আরব, ইরান, ইরাক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বৃহত্তম উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে।
পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগস্থল এই হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি বাজারের প্রাণকেন্দ্র। বৈশ্বিক তেলের বাজারের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত এই পথ বন্ধ হওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে ভয়াবহ ধসের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। রুশ সংবাদমাধ্যমের বরাতে ক্যাস্পিয়ান পোস্ট জানিয়েছে, বর্তমানে তেলের দাম ৮০ ডলারের আশেপাশে থাকলেও, এই অচলাবস্থার কারণে তা লাফিয়ে ২৫০ ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে।
তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনের শিল্প বিশেষজ্ঞ ও মেরিন ট্র্যাফিকের তথ্য বিশ্লেষণ করে উল্লেখ করা হয়, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল গত শুক্রবার রাতে থেকে হঠাৎ কমে গেছে। এদিকে রিস্ক ও কমপ্লায়েন্স বিশ্লেষক ডিমিত্রিস অ্যাম্পাটজিডিস জানান, বেশির ভাগ জাহাজ ইউ-টার্ন নিয়েছে, বিকল্প রুটে মোড় নিয়েছে বা ওমান উপসাগরে অপেক্ষা করছে। তিনি আরও জানান, সৌদি আরব, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, কারণ তাদের অধিকাংশ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস হরমুজের মধ্য দিয়ে গিয়ে থাকে।
প্রতিবেদনে হরমুজ প্রণালি বন্ধের প্রসঙ্গে বলা হয়, ইরানি ইসলামি বিপ্লবী গার্ডস (আইআরজিসি) গত শনিবার জাহাজগুলোকে সতর্ক করে ও পরে বন্ধ করে ঘোষণা দেয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কোনো সামরিক অবরোধের প্রমাণ নেই।
হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব: হরমুজ প্রণালি কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসে বহুবার শক্তিশালী দেশগুলো এই প্রণালি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছে। কারণ এটি সামরিক ও বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণে থাকলে বিশ্বের অর্থনীতি এবং জ্বালানি সরবরাহ সরাসরি প্রভাবিত হতে পারে। ভারত মহাসাগরের এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটির একপাশে ইরান এবং অন্যপাশে ওমান অবস্থিত। ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন ও কাতারের মতো দেশগুলো তাদের উৎপাদিত জ্বালানি তেল এই পথ দিয়েই বিশ্ববাজারে পাঠায়। পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের প্রায় ১৫-২০ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ৩০ শতাংশেরও বেশি এই সরু পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
হরমুজ প্রণালি বন্ধের যে প্রভাব পড়তে পারে: এই পথ দিয়ে যাতায়াতকারী জ্বালানির প্রায় ৮২ শতাংশই যায় এশিয়ার দেশগুলোতে। বিশেষ করে চীনের মোট এলএনজি আমদানির ২৪ শতাংশ এই রুটের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ৩০০টি জাহাজ এই পথে যাতায়াত করে, যা ব্যস্ততম সময়ে প্রতি ছয় মিনিটে একটির সমান।
তেলের দাম বৃদ্ধি: কয়েক দিন ধরেই তেলের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। রোববার (১ মার্চ) সকালে ব্রেন্ট ক্রুডের দর বেড়ে দাঁড়িয়েছে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭৩ ডলার। বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকস আগেই সতর্ক করে বলেছিল, ইরান হরমুজ প্রণালি অবরোধ করলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়াতে পারে। অন্যদিকে ভারতের ইকুইরাস সিকিউরিটিজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সরবরাহ পথ বন্ধ হলে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৫ থেকে ১১০ ডলারে উঠে যেতে পারে। ইরানি সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রুট বন্ধ হওয়ার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ এক ধাক্কায় তলানিতে ঠেকবে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে এর চেইন রিঅ্যাকশন হিসেবে বিশ্বজুড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও পরিবহন খরচ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে।
আর্থিক ও বাণিজ্যিক প্রভাব: বিশেষ করে এশিয়া, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি সংক্রান্ত শিল্প ও পরিবহন খাতে বড় প্রভাব পড়তে পারে।
সামরিক উত্তেজনা: এই প্রণালি বন্ধ থাকলে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে পারে।
বাংলাদেশে প্রভাব: জ্বালানি উপকরণ আমদানি-রপ্তানির অন্যতম পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। তখন বৈশ্বিক অর্থনীতির পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ শুরুর কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর প্রভাবে বৈশ্বিকভাবে পণ্য পরিবহণব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে সব ধরনের জ্বালানি উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে গেছে। এসবের নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ গড়ে প্রায় ৮০ শতাংশ জ্বালানি তেল ও রূপান্তরিত প্রকৃতিক গ্যাস আমদানি করে এই প্রণালি দিয়ে। ইরান কৌশলগত কারণে এই প্রণালি বন্ধ বা এর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে। এতে বিশ্ব বাণিজ্যে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এর প্রভাবে জ্বালানি তেলসহ অন্যান্য জ্বালানি উপকরণের দাম বেড়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত প্রতি ব্যারেল জ্বালনি তেলের দাম বেড়ে ৭৪ ডলারে উঠেছে। গত সপ্তাহের শেষদিকে ছিল ৬৬ ডলার। এর দাম আরও বাড়তে পারে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে অন্যান্য জ্বালানি উপকরণের দামও বাড়তে পারে। এর পাশাপাশি বাড়তে পারে জাহাজ ভাড়াও। ফলে বাজারে বাড়বে পণ্যের দাম। এতে মূল্যস্ফীতির হার ফের বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিকেপি/এমবি

