Logo

আন্তর্জাতিক

ভারতে রান্নার গ্যাসের তীব্র সংকট, সহজে মিলছে না সিলিন্ডার

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২৬, ২০:৪০

ভারতে রান্নার গ্যাসের তীব্র সংকট, সহজে মিলছে না সিলিন্ডার

চেন্নাইয়ের একটি এজেন্সি অফিসে গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডার কিনতে মানুষের লাইন। বুধবার (১১ মার্চ) তোলা/ ছবি: এএফপি

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ভারতে এলপিজি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কায় দেশজুড়ে বহু পরিবারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে গৃহস্থালি গ্যাস সিলিন্ডারের বুকিং হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় ডিস্ট্রিবিউশন এজেন্সিগুলোর সামনে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে।

হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ডিজিটাল বুকিং ব্যবস্থাও চাপ সামলাতে পারছে না। অনেক গ্রাহক জানিয়েছেন, আইভিআরএস নম্বর, হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল এবং অনলাইন বুকিং পোর্টালে বারবার ‘সার্ভার ডাউন’ বার্তা দেখাচ্ছে। এতে বাধ্য হয়ে অনেককে সরাসরি ডিলারদের অফিসে গিয়ে বুকিং করতে হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় সরকার গৃহস্থালি এলপিজি সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দিলেও ভোক্তারা বলছেন, বাস্তবে ডেলিভারি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

ডিলারদের মতে, বাণিজ্যিক এলপিজি সরবরাহ প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। আর গৃহস্থালির গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ না হলেও উল্লেখযোগ্যভাবে ধীর হয়ে গেছে।

সরকারি কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, গৃহস্থালি রান্নার গ্যাসের কোনো ঘাটতি নেই। তবে হঠাৎ বুকিং বেড়ে যাওয়ায় পুরো ব্যবস্থাই চাপের মুখে পড়েছে।

ফেডারেশন অব এলপিজি ডিস্ট্রিবিউটরস অব ইন্ডিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট শশী কান্ত শর্মা বলেন, বুকিং প্রায় দশগুণ বেড়ে গেছে, যা এই ব্যবস্থার সক্ষমতার অনেক বেশি।

এই পরিস্থিতিতে সরকার সাময়িকভাবে কেরোসিন ও কয়লাকে বিকল্প রান্নার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। এছাড়া তেল বিপণনকারী কোম্পানিগুলোর একটি কমিটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জন্য মাসিক গড় এলপিজি ব্যবহারের মাত্র ২০ শতাংশ ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে।

গ্রামাঞ্চলে দুটি সিলিন্ডার বুকিংয়ের মধ্যবর্তী সময় ২৫ দিন থেকে বাড়িয়ে ৪৫ দিন করা হয়েছে। দিল্লি, গুরগাঁও, মুম্বাই, কলকাতা, লখনউ ও চেন্নাইসহ বিভিন্ন শহরে এলপিজি ডিস্ট্রিবিউশন সেন্টারের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে দেখা গেছে ভোক্তাদের।

৪ হাজার রুপিতেও সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না

হায়দরাবাদের একজন টিফিন কর্মী বলেন, আমরা এখন বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছি। এলপিজি নিয়ে বড় সমস্যা চলছে। আগে আমরা ১৮০০ থেকে ১৯০০ রুপিতে সিলিন্ডার কিনতাম। কিন্তু এখন ৩০০০ থেকে ৪০০০ রুপিতেও পাওয়া যাচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে এই ইলেকট্রিক চুলা কিনেছি। এখন ইলেকট্রিক চুলাও বাজারে কমে গেছে।

বিভিন্ন খাতে প্রভাব

এই সংকটে ভারতের বিভিন্ন খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দক্ষিণের রাজ্য কেরালায় হোটেল মালিকদের সংগঠন জানিয়েছে, এলপিজি মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় প্রায় ৪০ শতাংশ রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠান, হোস্টেল ও মেসগুলোও বিকল্প জ্বালানি খুঁজতে হিমশিম খাচ্ছে।

কিছু সরবরাহকারী সিলিন্ডারের জন্য প্রায় দ্বিগুণ দাম নিচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

এদিকে বিকল্প হিসেবে ইলেকট্রিক চুলার চাহিদা দ্রুত বেড়েছে। ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলো জানিয়েছে, গত দুই দিনে ইনডাকশন কুকার ও রাইস কুকারের বিক্রি ২৫ থেকে ৩০ গুণ পর্যন্ত বেড়েছে।

স্কুলেও পড়ছে প্রভাব

হরিয়ানা রাজ্যের গুরগাঁও জেলার কয়েকটি স্কুল অভিভাবকদের জানিয়েছে, ক্যাম্পাসের রান্নাঘর বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় শিক্ষার্থীদের বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে আসতে হবে।

বাণিজ্যিক এলপিজির তীব্র ঘাটতির কারণে স্কুলের রান্নাঘর চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে কর্মজীবী অভিভাবকদের বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজতে হচ্ছে। আর যারা স্কুলের খাবারের ওপর নির্ভরশীল, সেই শিশুদের নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

একটি নামকরা স্কুল বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) অভিভাবকদের চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, তাদের ক্যাটারারের কাছে মাত্র দুই দিনের গ্যাস মজুত আছে এবং সোমবার থেকে খাবার সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাতের কারণে তৈরি হওয়া সংকটে পর্যাপ্ত সিলিন্ডার সংগ্রহ করা যাচ্ছে না।

এদিকে ‘স্টুডেন্টস হেল্পিং হ্যান্ডস’ নামের একটি এনজিওর প্রতিষ্ঠাতা কুলদীপ আম্বেকার বলেন, তাদের সহায়তাপ্রাপ্ত ৬০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ১৫০ জন বুধবার থেকে সীমিত খাবারে দিন কাটাচ্ছে। কারণ তারা যে মেসে খায় সেখানে দিনে দুইবার পূর্ণ খাবার রান্নার মতো সিলিন্ডার নেই।

তিনি বলেন, টাকার অভাবে তারা সকালের নাশতা খেতে পারে না। এখন মেসেও খাবারের পরিমাণ ও সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। দরিদ্র শিক্ষার্থীরা এখন প্রায় অনাহারে দিন কাটাচ্ছে।

পুনের সাভিত্রীবাই ফুলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী তেজশ্রী গালান্দে বলেন, তাদের মেসেও খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। আগে সেখানে রুটি, ভাত, ডাল ও সবজি দেওয়া হতো। এখন দিনে দুইবার শুধু খিচুড়ি দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, আমি বাইরে খাওয়ার সামর্থ্য না থাকায় সকালের নাশতা করি না। প্রতিদিন খিচুড়ি আর আচার খেতে ভালো লাগে না, কিন্তু সংকটের কারণে কোনো বিকল্প নেই। রাত জেগে পড়াশোনা করলে ক্ষুধা লাগে, তখন আমরা শুধু পানি খাই। এলপিজি সংকটে চায়ের দাম ৮ রুপি থেকে ১২ রুপি হওয়ায় রাতে চা খাওয়াও বন্ধ করে দিয়েছি।

মুম্বাইয়ের রাস্তার দোকানগুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম

বাণিজ্যিক এলপিজির সংকটে মুম্বাইয়ের স্ট্রিট ফুড ব্যবসাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বড়া পাওয়ের মতো জনপ্রিয় খাবার এখন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। আর সমুচা ও ভুজিয়ার মতো সাধারণ খাবারও অনেক দোকানে আর পাওয়া যাচ্ছে না।

কিছু রাস্তার বিক্রেতা কালোবাজার থেকে ১৩০০ থেকে ১৮০০ রুপিতে গৃহস্থালি সিলিন্ডার কিনছেন। ধরা পড়া এড়াতে অনেকেই সেগুলো বস্তার নিচে লুকিয়ে রাখছেন।

লালবাগের জনপ্রিয় দোকান লাডু সম্রাটের মালিক কামলাকার রাক্ষে বলেন, বাণিজ্যিক সিলিন্ডার পাওয়া যাবে কি না, তার ওপরই বড়া পাও বিক্রি নির্ভর করছে।

তিনি আরও বলেন, গতকাল আমাদের দোকান বন্ধ ছিল। আজ চারটি সিলিন্ডার পেয়েছি, তাই খুলেছি। কিন্তু কাল কী হবে বলতে পারছি না।

কেরালায় ৪০ শতাংশ রেস্তোরাঁ বন্ধের আশঙ্কা

সংবাদ সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, এলপিজি সংকটের কারণে কেরালায় প্রায় ৪০ শতাংশ রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

কেরালা হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জি জয়পাল বলেন, বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) পর্যন্ত প্রায় ২০ শতাংশ রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়েছে এবং শুক্রবারের মধ্যে তা ৪০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

তিনি বলেন, শহরের রেস্তোরাঁগুলোতে বিকল্প জ্বালানিতে রান্না করা সম্ভব নয়। কারণ খাদ্য নিরাপত্তা মান বজায় রাখতে অধিকাংশ রেস্তোরাঁ আধুনিক রান্নাঘর ব্যবহার করে এবং সেখানে জ্বালানি কাঠ বা অন্য জ্বালানিতে রান্নার ব্যবস্থা নেই।

জয়পাল অভিযোগ করেন, কিছু বেসরকারি এলপিজি সরবরাহকারী প্রায় দ্বিগুণ দাম নিচ্ছে। গত দুই দিনে জ্বালানি কাঠের দামও বেড়ে গেছে।

পশ্চিমবঙ্গে লম্বা লাইন

পশ্চিমবঙ্গেও এলপিজি সিলিন্ডার সংকটের আশঙ্কায় শুক্রবার ডিস্ট্রিবিউশন সেন্টারের সামনে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। রাজ্যের দক্ষিণের কাকদ্বীপ থেকে উত্তরের শিলিগুড়ি পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় মানুষ খালি সিলিন্ডার নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

অনেকে জানান, অনলাইনে বুকিং করা যাচ্ছে না।

বৃহস্পতিবার পশ্চিমবঙ্গ সরকার এলপিজি সরবরাহ ও বিতরণ পর্যবেক্ষণের জন্য একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) জারি করেছে।

সরকার সচিবালয়ে ২৪ ঘণ্টা খোলা একটি কন্ট্রোল রুমও চালু করেছে। এসওপিতে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য সরবরাহ বিঘ্নের মধ্যে এলপিজির প্রাপ্যতা স্থিতিশীল রাখা এবং জনসাধারণের অভিযোগ দ্রুত সমাধানের জন্য এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এছাড়া রাজ্য পর্যায়ে একটি এলপিজি সংকট পর্যবেক্ষণ কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

এদিকে কলকাতা ও সল্টলেক এলাকায় অনেক রাস্তার খাবারের দোকান এলপিজি সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে। যেগুলো খোলা আছে, সেগুলো সীমিত মেনু ও বেশি দামে খাবার বিক্রি করছে।

অন্যদিকে এলপিজি চালিত অনেক অটোরিকশাও রাস্তায় নামছে না। কারণ ফিলিং স্টেশনে গ্যাস সরবরাহ অনিয়মিত। ফলে কিছু রুটে অটোচালকেরা ১০ থেকে ২৫ শতাংশ বেশি ভাড়া নিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।

৭–১০ দিনের মধ্যে সমাধানের আশ্বাস

ভারতের খাদ্য ও নাগরিক সরবরাহমন্ত্রী কে এইচ মুনিয়াপ্পা বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) আইন পরিষদে বলেন, রাজ্যে বাণিজ্যিক এলপিজি সিলিন্ডারের ঘাটতি ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে সমাধান হবে।

তিনি জানান, শুক্রবার (১৩ মার্চ) সকালে তেল কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করবেন এবং পরে হোটেল মালিকদের সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করবেন।

মন্ত্রী বলেন, সরকার ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে এবং কর্ণাটকে গৃহস্থালি ব্যবহারের জন্য পর্যাপ্ত গ্যাস মজুত রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, কর্ণাটকে অন্তত ১০ দিনের গৃহস্থালি সিলিন্ডারের বাফার স্টক আছে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে হাসপাতাল, হোস্টেল ও স্কুলে বাণিজ্যিক এলপিজি সরবরাহ করা হবে। পরিবারগুলোকে আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই।

তবে তিনি স্বীকার করেন, বাণিজ্যিক এলপিজি রেশনিংয়ের কারণে হোটেল, বিয়ের হল ও কনভেনশন সেন্টারগুলো এক সপ্তাহের মতো সমস্যায় পড়তে পারে। আবার তিনি এও বলেন, ইরান সরকার দুটি তেলবাহী জাহাজকে চলাচলের অনুমতি দেওয়ায় ১০ দিনের মধ্যে এই সমস্যাও কেটে যাবে।

সূত্র: দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া

এএস/

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ভারত

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর