Logo

আন্তর্জাতিক

তেহরানের রাজপথে উচ্ছ্বাস

ইরানের ওপর হামলা দুই সপ্তাহ স্থগিত করলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৫১

ইরানের ওপর হামলা দুই সপ্তাহ স্থগিত করলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প

ছবি: সংগৃহীত

ইরানের ওপর পরিকল্পিত ভয়াবহ হামলা ও বোমা বর্ষণ দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার (৮ এপ্রিল) নিজের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এই সিদ্ধান্তের কথা জানান।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের অনুরোধ এবং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি এই নমনীয়তা প্রদর্শন করেছেন বলে উল্লেখ করেন।

ট্রাম্পের এই ঘোষণা অনুযায়ী, পরবর্তী ১৪ দিন উভয় পক্ষ একটি দ্বিপাক্ষিক যুদ্ধবিরতি পালন করবে। তবে এই স্থগিতাদেশের প্রধান শর্ত হলো— ইরানকে অবিলম্বে এবং সম্পূর্ণ নিরাপদভাবে ‘হরমুজ প্রণালি’ উন্মুক্ত করে দিতে হবে। ট্রাম্প বলেন, ‘আজ রাতে ইরানের ওপর যে বিধ্বংসী শক্তি প্রয়োগ করার কথা ছিল, পাকিস্তান সরকারের অনুরোধে তা আপাতত স্থগিত রাখা হচ্ছে।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই তাদের অধিকাংশ সামরিক লক্ষ্য অর্জন করেছে এবং ইরানের সঙ্গে একটি দীর্ঘমেয়াদী শান্তি চুক্তির পথে অনেক দূর এগিয়েছে। তিনি আরো জানান, ইরানের পক্ষ থেকে একটি ১০ দফার প্রস্তাব পাওয়া গিয়েছে, যেটিকে আলোচনার জন্য একটি কার্যকর ভিত্তি বলে মনে করছে ওয়াশিংটন। দুই দেশের মধ্যে অতীতে অমিল থাকা প্রায় সব পয়েন্টে সমঝোতা হয়েছে উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, ‘পরবর্তী দুই সপ্তাহ এই চুক্তি চূড়ান্ত ও কার্যকর করার জন্য সময় দেবে।’

ট্রাম্প এই অর্জনকে নিজের দেশের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর প্রতিনিধি হিসেবেও বড় একটি সাফল্য বলে অভিহিত করেছেন। তিনি মনে করেন, এই পদক্ষেপের ফলে কয়েক দশকের পুরনো এক সমস্যার দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে বিশ্ব।

ট্রাম্পের ঘোষণার বিষয়ে ইরানি কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে এই যুদ্ধবিরতি নিয়ে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়া যদি সফল হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে গত ৩৮ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটতে পারে।

এদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র— দুপক্ষই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে। এ খবরে রাজপথে নেমে উল্লাস করেছেন ইরানের রাজধানী তেহরানের বাসিন্দারা। স্থানীয় সময় বুধবার (ভোরে তেহরানের পথে পথে মিছিল হয়েছে, স্লোগান হয়েছে। যুদ্ধ আপাতত থেমে যাবে, এমন সম্ভাবনায় উচ্ছ্বাস দেখা গেছে তেহরানের বাসিন্দাদের মধ্যে। 

এদিকে ইসরায়েলের চ্যানেল ১২ জানিয়েছে, বুধবার ভোরে ইরানের ওপর নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর এই হামলা চালানো হলো।

টেলিভিশন চ্যানেলটির দাবি, ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া অব্যাহত রেখেছে ইরান। তাই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ-সংক্রান্ত স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ইসরায়েল নতুন হামলা চালিয়েছে।

অন্যদিকে বুধবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এই সমঝোতাকে স্বাগত জানিয়ে দুই দেশের নেতৃত্বের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘উভয় দেশ যে বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতা প্রদর্শন করেছে, আমি তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাই। এই উচ্চপর্যায়ের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষই অত্যন্ত গঠনমূলকভাবে শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে কাজ করেছে।’

শাহবাজ শরিফ ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলকে আনুষ্ঠানিকভাবে আগামী শুক্রবার ১০ এপ্রিল ইসলামাবাদে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। সেখানে সব বিরোধের একটি চূড়ান্ত এবং মীমাংসিত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য আলোচনা শুরু হবে।

ইসলামাবাদে শুরু হতে যাওয়া শান্তি আলোচনার ভিত্তি হিসেবে ইরান ১০ দফা প্রস্তাব দিয়েছে। তার বিস্তারিত সামনে এসেছে। এই প্রস্তাবগুলোতে ইরান কেবল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি সম্পূর্ণ বন্ধের দাবি জানিয়েছে।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাদের ১০ দফা পরিকল্পনার প্রধান দিকগুলো হলো—

হরমুজ প্রণালিতে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ: ইরান তার সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ‘নিয়ন্ত্রিত যাতায়াতের’ প্রস্তাব দিয়েছে। এটি কার্যকর হলে এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথে ইরানের অপ্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি হবে। এ ছাড়া তারা একটি ‘নিরাপদ ট্রানজিট প্রোটোকল’ তৈরির দাবি করেছে যা এই প্রণালিতে ইরানের আধিপত্য নিশ্চিত করবে।

মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার: পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সকল যুদ্ধকালীন ঘাঁটি এবং সেনা মোতায়েন কেন্দ্র থেকে মার্কিন সৈন্য সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে তেহরান।

মিত্র শক্তির নিরাপত্তা: ইরান স্পষ্ট করেছে যে, তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে হবে। এটি মূলত হিজবুল্লাহ, হামাস ও হুতিদের ওপর হামলা বন্ধের দাবি।

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও সম্পদ মুক্তি: ইরানের বিরুদ্ধে থাকা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক সব নিষেধাজ্ঞা বাতিল এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিচালনা পর্ষদের সব নেতিবাচক প্রস্তাবনা প্রত্যাহারের শর্ত দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সব সম্পদ ও সম্পত্তি অবিলম্বে ফেরত দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দাবি: বিগত বছরগুলোতে ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বিভিন্ন সামরিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির ‘পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণ’ দাবি করা হয়েছে তেহরানের পক্ষ থেকে।

আন্তর্জাতিক আইনি নিশ্চয়তা: ইরান দাবি করেছে যে, ইসলামাবাদে সমঝোতা হওয়া প্রতিটি বিষয়কে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি ‘বাধ্যতামূলক রেজুলেশন’ হিসেবে পাস করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো পক্ষ এর থেকে সরে যেতে না পারে।

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন