Logo

আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি, খুলছে হরমুজ প্রণালী

Icon

হাসান রাজীব

প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ২১:৫৩

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি, খুলছে হরমুজ প্রণালী

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে হামলা শুরুর এক মাসের বেশি সময় পর শেষ মুহূর্তে এসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি পালনে সম্মত হয়েছে। যদিও এর পেছনে ছিল দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা নিবিড় এবং পর্দার আড়ালের এক দীর্ঘ কূটনৈতিক তৎপরতা। এ যুদ্ধবিরতি চলাকালে হারমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল করতে পারবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর বোমা হামলা দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করতে সম্মত হন। এর আগে তিনি হুমকি দিয়েছিলেন, তেহরান দাবি না মানলে আজ রাতে ‘একটি গোটা সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে।’

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আলোচনায় মধ্যস্থতা করেছেন। তিনি বুধবার ভোরে ঘোষণা দিয়েছেন যে তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। এদিকে, তেহরানের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল জানিয়েছে, ইরানের দেওয়া ১০ দফা প্রস্তাবের ভিত্তিতে শুক্রবার (আজ) পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা শুরু হবে।

গতকাল মঙ্গলবার ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় যখন হামলা শুরু হতে মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি, তখন ট্রাম্প ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ নতুন সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি এই সমঝোতার মধ্যস্থতা করার জন্য পাকিস্তানকে কৃতিত্ব দিয়েছেন। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন, এই সিদ্ধান্ত কিছু শর্তসাপেক্ষে নেওয়া হয়েছে– যার মধ্যে প্রধান হলো ইরানকে অবশ্যই হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দিতে হবে।

ট্রাম্প লিখেছেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ ও ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে আলোচনায় তারা অনুরোধ করেছেন, আমি যেন আজ রাতে ইরানের দিকে পাঠানো ধ্বংসাত্মক হামলা থামিয়ে দিই।

যুদ্ধবিরতি সম্পর্কে যা জানা গেল: ট্রাম্প বলেছেন, তেহরান হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দিতে সম্মত হলে তিনি দুই সপ্তাহের জন্য ইরানে হামলা করা বন্ধ রাখবেন। হরমুজ প্রণালি হলো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল এবং অন্যান্য পণ্য রপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট। নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে সব সামরিক লক্ষ্য পূরণ করে ফেলায় তিনি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছেন।

এর আগে ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র এক রাতের মধ্যেই ইরানকে ধ্বংস করে দিতে পারে। তিনি রাতের মধ্যে পুরো ইরানি সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। জাতিসংঘের মহাসচিব ও পোপ এ হুমকির সমালোচনা করেন।

ইরান দুই সপ্তাহের জন্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিনা বাধায় নৌযান চলাচল করতে দেওয়ার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে। তবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌযান চলাচলের ক্ষেত্রে ইরানের সামরিক বাহিনী সমন্বয় করবে।

ইরান একটি ১০ দফা পরিকল্পনাও প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরান, ইরাক, লেবানন ও ইয়েমেনে যুদ্ধে সম্পূর্ণ বিরতি টানা; ইরানের ওপর থেকে সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পূর্ণ প্রতিশ্রুতি; যুক্তরাষ্ট্রে আটকে থাকা ইরানি তহবিল ও জব্দ করা সম্পদগুলো ছেড়ে দেওয়া এবং পুনর্গঠনের খরচ বাবদ সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ প্রদানের প্রতিশ্রুতি। ইরান কোনো ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

তেহরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘মাঠের লড়াইয়ে ইরানের যে সাফল্য এসেছে, তা রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করা হবে।’

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেছেন, যুদ্ধবিরতি লেবাননেও কার্যকর হবে। সেখানে ইরান–সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সঙ্গে লড়াই করছে ইসরায়েল। তবে ইসরায়েলের নেতারা বলেছেন, হিজবুল্লাহর হুমকি দূর না হওয়া পর্যন্ত তারা লেবানন ছাড়বে না।

ইসরায়েলের পক্ষ থেকে লেবানন বা অন্য কোনো জায়গায় তাদের অভিযান স্থগিত করার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।

এদিকে, ট্রাম্পের ঘোষণার কিছুক্ষণ পরই ইসরায়েলে সাইরেন বেজে ওঠে। দেশটির সেনাবাহিনী বলেছে, তারা ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করছে। গত মঙ্গলবার গভীর রাতে জেরুজালেমে একাধিক জোরালো বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।

যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, ইরান যদি দ্রুত হরমুজ প্রণালি খুলে দেয় এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও অঞ্চলের দেশগুলোর ওপর সব ধরনের হামলা বন্ধ করে, তাহলে দুই সপ্তাহের জন্য হামলা স্থগিত করার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেওয়া সিদ্ধান্তটিকে সমর্থন করবে ইসরায়েল।

এটি যুদ্ধের সমাপ্তি নয় ‘আঙুল ট্রিগারেই’: মোজতবা খামেনি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি দেশের সব সামরিক ইউনিটকে কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে একই সঙ্গে তেহরান স্পষ্ট করেছে, এর অর্থ এই নয় যে যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। আমাদের ‘আঙুল ট্রিগারেই’ আছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি-তে প্রচারিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছেছে, এটি যুদ্ধের সমাপ্তি নয়, তবে সব সামরিক শাখাকে সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশ মেনে গুলি চালানো বন্ধ রাখতে হবে। এই যুদ্ধবিরতি যুদ্ধের শেষ নয় এবং শত্রুপক্ষ যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল যদি কোনো পদক্ষেপ নেয়, তাহলে তারা পাল্টা জবাব দিতে প্রস্তুত থাকবে। 

এছাড়া যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ বলেছে, এটি যুদ্ধের সমাপ্তি নির্দেশ করে না…আমাদের আঙুল এখনো ট্রিগারের ওপর আছে এবং শত্রুপক্ষের সামান্যতম ভুলের জবাবও পূর্ণ শক্তি দিয়ে দেয়া হবে। 

এর আগে, ইরানের বিরুদ্ধে হামলা বন্ধ করা হলে ইরান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হবে বলে ঘোষণা দেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি ‘দুই সপ্তাহের জন্য হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরাপদ চলাচল (জাহাজ) সম্ভব হবে।’ তার ভাষ্য অনুযায়ী, এটি বাস্তবায়ন করা হবে ‘ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাগুলো বিবেচনায় রেখে।’  

লেবানন যুদ্ধবিরতির অন্তর্ভুক্ত হবে না: ট্রাম্প ঘোষিত যুদ্ধবিরতি লেবাননের ক্ষেত্রেও কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। লেবানন এ যুদ্ধবিরতির অন্তর্ভুক্ত হবে না বলে দাবি করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

লেবানন যুদ্ধবিরতির আওতায় থাকলে ইসরায়েলকে দেশটিতে হামলা বন্ধ করতে হবে। কিন্তু ইসরায়েলের সে ধরনের কোনো ইচ্ছা যে নেই তা নেতানিয়াহুর দাবি থেকে স্পষ্ট হচ্ছে।

গতকাল ইসরায়েলি গণমাধ্যমের বরাতে রয়টার্স জানায়, নেতানিয়াহু বলেছেন যে তার দেশ দুই সপ্তাহের জন্য ইরানের বিরুদ্ধে হামলা স্থগিত রাখার ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে কিন্তু লেবানন এই যুদ্ধবিরতির অন্তর্ভুক্ত না।

এর আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছিলেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র, তাদের মিত্রদের নিয়ে ‘লেবানন ও অন্যান্য অঞ্চলসহ সব জায়গায়’ অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি করতে রাজি হয়েছে।

এমনটি ইসরায়েলি গণমাধ্যম ওয়াইনেটের প্রতিবেদনেও যুদ্ধবিরতিতে লেবানন অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে জানানো হয়েছে।

কিন্তু টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, ট্রাম্পের ঘোষণার চার ঘণ্টা পর নেতানিয়াহু দপ্তর এক বিবৃতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানায়। কিন্তু একই বিবৃতিতে তারা জোর দিয়ে বলে, লেবানন এই যুদ্ধবিরতি আওতায় পড়বে না।

ইংরেজি ভাষায় দেওয়া এই বিবৃতিতে নেতানিয়াহুর দপ্তর বলেছে, ইরান অবিলম্বে প্রণালি খুলে দেবে আর যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও এই অঞ্চলের দেশগুলোতে আক্রমণ বন্ধ করবে, এর ভিত্তিতে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত রাখার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে ইসরায়েল।

যুদ্ধবিরতি সব জায়গায় কার্যকর-শাহবাজ: পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও তাদের মিত্ররা ‘সব জায়গায়’, লেবাননসহ, তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। কয়েক সপ্তাহের সংঘাত থামাতে তার সরকারের মধ্যস্থতায় এ সিদ্ধান্ত হয়েছে।

গতকাল এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র, তাদের মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে সর্বত্র, লেবাননসহ, অবিলম্বে কার্যকর যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে—এ ঘোষণা দিতে পেরে আমি আনন্দিত।’

ইসলামাবাদ থেকে বার্তাসংস্থা এএফপি এ খবর জানায়। তিনি জানান, চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে শুক্রবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দুই দেশের প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানানো হবে। সেখানে আলোচনার আয়োজন করা হবে।

শরিফ বলেন, ‘আমরা আন্তরিকভাবে আশা করি, ‘ইসলামাবাদ আলোচনা’ টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠায় সফল হবে। আগামী দিনগুলোতে আরও সুসংবাদ দিতে পারব বলে আশা করছি।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান ধ্বংসের হুমকির নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার এক ঘণ্টা আগে তেহরান ও ওয়াশিংটন দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মতির কথা জানায়।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় পাকিস্তান তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। প্রতিবেশী ইরানের পরিস্থিতির ওপর নজর রেখে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।

ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে দেওয়া হবে না: ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে দেওয়া হবে না আরও ঘোষণা দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর আগামীকাল শুক্রবার ইসলামাবাদে আলোচনার জন্য বসছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। তার আগেই গতকাল বুধবার ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে নিজের প্রশাসনের অবস্থান স্পষ্ট করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

তিনি বলেছেন, ইরানকে আর ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে দেওয়া হবে না। তবে চুক্তি হলে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে। আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে, সেখানে একটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ সরকার পরিবর্তন’ (রেজিম চেঞ্জ) ঘটেছে!’

ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন বি-২ বোম্বারের হামলার প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আর কোনও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ হবে না। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে মিলে মাটির গভীরে চাপা পড়া সব পারমাণবিক বর্জ্য বা উপাদান খনন করে সরিয়ে ফেলবে।’

যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানাল বিভিন্ন দেশ: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ঘোষিত যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বেইজিংয়ে আয়োজিত নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানান, মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চীন নিজস্ব জায়গা থেকে প্রচেষ্টা চালিয়েছে।

জাপানের চিফ ক্যাবিনেট সেক্রেটারি মিনোরু কিহারা সাংবাদিকদের বলেন, টোকিও এই সাময়িক যুদ্ধবিরতিকে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে গ্রহণ করছে। জাপান এখন একটি স্থায়ী ও চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছেন। এই পদক্ষেপের প্রশংসা করে তিনি বলেন, এটি একটি খুব ভালো বিষয়। তবে মাখোঁ একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেছেন, লেবাননের পরিস্থিতি বর্তমানে অত্যন্ত সংকটজনক। 

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার জানিয়েছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি বজায় রাখতে এবং একে স্থায়ী রূপ দিতে যুক্তরাজ্য সম্ভাব্য সবকিছু করবে।

এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, 'গত রাতে হওয়া এই যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে আমি স্বাগত জানাই। এটি এই অঞ্চল এবং পুরো বিশ্বের জন্য কিছুটা স্বস্তি নিয়ে আসবে।

ওমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ঘোষিত সাময়িক যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় এই পদক্ষেপের প্রশংসা করে।

বিবৃতিতে ওমান এই সংঘাত নিরসনে পাকিস্তান এবং যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানানো সকল পক্ষের প্রচেষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া সাময়িক যুদ্ধবিরতি এবং হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে ইউক্রেন। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে এই প্রতিক্রিয়া জানান। একই সঙ্গে তিনি ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য ওয়াশিংটনের কাছ থেকে একই ধরণের 'দৃঢ় পদক্ষেপ' দাবি করেন।

জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস জানিয়েছেন, তার সরকার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানাচ্ছে।

অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং এক যৌথ বিবৃতিতে এই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা বলেন, ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া এবং বাণিজ্যিক জাহাজ ও জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে নজিরবিহীন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যা তেলের দামের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।

এই সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে পাকিস্তান, মিশর, তুরস্ক এবং সৌদি আরবের ভূমিকার প্রশংসা করে তাদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন আলবানিজ ও ওং। তারা আশা প্রকাশ করেন যে এই যুদ্ধবিরতি বজায় থাকবে এবং আলোচনার মাধ্যমে একটি স্থায়ী সমাধান আসবে।

যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও ইরানে হামলা: যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও ইরানের লাভান তেল শোধনাগারে হামলা হয়েছে। গতকাল ন্যাশনাল ইরানিয়ান অয়েল রিফাইনিং অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আজ (গতকাল) সকাল ৬:৩০ জিএমটি (স্থানীয় সময় সকাল ১০টা) ইরানের লাভান দ্বীপে অবস্থিত একটি তেল শোধনাগারে হামলা হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, 'নিরাপত্তা ও অগ্নিনির্বাপক বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং আগুন নেভানোর কাজ করছে। সৌভাগ্যক্রমে কর্মচারীদের সময়মতো সরিয়ে নেওয়ার কারণে এখনও কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।'

লেবানন অন্তর্ভুক্ত না হলে যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়বে: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে লেবানন অন্তর্ভুক্ত না হলে পুরো চুক্তিই ভেঙে পড়তে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে লেবাননভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ।

হিজবুল্লাহর সংসদ সদস্য ইব্রাহিম মুসাওয়ি জানিয়েছেন, এই চুক্তিতে হিজবুল্লাহ-ইসরায়েলও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এবং যদি ইসরায়েল তা না মানে, তাহলে ইরানসহ পুরো অঞ্চল জবাব দেবে।

ইসরায়েলি সেনারা বুধবার সকালে এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, হিজবুল্লাহর সঙ্গে লড়াই এবং স্থল আক্রমণ অব্যাহত থাকবে।

তাদের এই বক্তব্য ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি। নেতানিয়াহু বলেছেন, যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে লেবানন অন্তর্ভুক্ত নয়।

চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর দক্ষিণ লেবাননের একাধিক স্থানে ইসরায়েলের হামলা বেড়েছে। যুদ্ধের শুরু থেকে ইরান বারবার জানিয়েছে, লেবানন ও ইরান একই ফ্রন্ট হিসেবে কাজ করছে। তাই চুক্তিতে লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ফলে এই মুহূর্তে লেবাননে পরিস্থিতি অত্যন্ত অনিশ্চিত।

ইসলামাবাদে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা আজ: ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। তেহরানের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল জানিয়েছে, ইরানের দেওয়া ১০ দফা প্রস্তাবের ভিত্তিতে আগামী শুক্রবার (১০ এপ্রিল) পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা শুরু হবে। গতকাল এই বিবৃতিটি এমন এক সময়ে এলো যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও সেতুগুলোতে বোমা হামলার হুমকি প্রত্যাহার করেছেন এবং দুই সপ্তাহের জন্য দেশটিতে হামলা ‘স্থগিত’ রাখতে সম্মত হয়েছেন।

ট্রাম্প বলেছেন, এই যুদ্ধবিরতি তখনই কার্যকর থাকবে যদি ইরান হরমুজ প্রণালী ‘সম্পূর্ণ, অবিলম্বে এবং নিরাপদভাবে খুলে দিতে’ রাজি হয়।

এই সরু জলপথটি পারস্য উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে এবং বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ এই পথেই পরিবাহিত হয়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান এই প্রণালীতে আংশিক অবরোধ আরোপ করে। এর ফলে বিশ্ব বাণিজ্য ব্যাহত হয়, তেলের দাম বেড়ে যায়, আর্থিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয় এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট দেখা দেয়। ইরানের পাল্টা হামলাগুলো পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের পক্ষে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যুদ্ধ বন্ধ করার বিষয়ে তেহরানের সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘ইরানের ওপর হামলা বন্ধ করা হলে আমাদের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীও তাদের প্রতিরক্ষামূলক কার্যক্রম বন্ধ রাখবে।’

আরাগচি জানান, ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরাপদ যাতায়াত সম্ভব হবে। তিনি উল্লেখ করেন, ট্রাম্প আলোচনার ভিত্তি হিসেবে ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবের ‘সাধারণ কাঠামো’ গ্রহণ করায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ বলেছেন, যুদ্ধরত সব পক্ষ ‘লেবাননসহ সর্বত্র অবিলম্বে যুদ্ধবিরতিতে’ সম্মত হয়েছে। এক্সে তিনি লিখেছেন, এ পদক্ষেপ অবিলম্বে কার্যকর হবে।

শেহবাজ শরীফ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে ধন্যবাদ জানান এবং শুক্রবার (১০ এপ্রিল) ইসলামাবাদে তাদের প্রতিনিধি দলকে আমন্ত্রণ জানান, যাতে সব বিরোধ মেটাতে একটি চূড়ান্ত চুক্তির বিষয়ে আলোচনা করা যায়।

ইরানের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের মতে, তাদের ১০ দফা প্রস্তাবে হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের আধিপত্য ও তদারকির কথা বলা হয়েছে, যা দেশটিকে একটি ‘অনন্য অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক অবস্থান’ দেবে।

প্রস্তাবটিতে মধ্যপ্রাচ্যের ঘাঁটিগুলো থেকে সব মার্কিন যুদ্ধবাহিনী প্রত্যাহার এবং এই অঞ্চলের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধ করার দাবি জানানো হয়েছে। এছাড়া যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ‘পূর্ণ ক্ষতিপূরণ’ এবং যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবিও এতে রয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করলে যুদ্ধ শুরু হয়। এর জবাবে তেহরান উপসাগরীয় দেশগুলো ও ইসরাইলে পাল্টা হামলা চালায়। ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইসরাইলে হামলা চালানোর পর লেবাননও এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। এর পর থেকে ইসরাইল দেশটির বিভিন্ন স্থানে, রাজধানীসহ, হামলা চালায় ও দক্ষিণাঞ্চলে স্থল অভিযান শুরু করে।


বাংলাদেশের খবর/এইচআর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন