Logo

আন্তর্জাতিক

ইরানে যুদ্ধবিরতি: নেপথ্য কারিগর কি বেইজিং?

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ২১:০১

ইরানে যুদ্ধবিরতি: নেপথ্য কারিগর কি বেইজিং?

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ঘোষিত সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে বিশ্বজুড়ে নানা বিশ্লেষণ চলছে। তবে এই পরিস্থিতির সম্ভাব্য ফলাফল যাই হোক না কেন, কূটনৈতিক অঙ্গনে একটি শক্তি ইতিমধ্যেই নিজেকে 'বিজয়ী' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেআর তা হলো চীন।

এই যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছাতে ইরানকে রাজি করানোর পেছনে বেইজিংয়ের নীতি-নির্ধারকদের বড় ভূমিকা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে বিবাদমান পক্ষগুলোর মধ্যে এক প্রভাবশালী মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজের অবস্থান আরও সুসংহত করল চীন। চীনের অভ্যন্তরীণ সংবাদমাধ্যমগুলোতেও এই কৃতিত্ব বেশ গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করা হচ্ছে।

দেশটির জাতীয়তাবাদী অনলাইন মাধ্যম 'গুয়াঞ্চা' বুধবার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, নিউইয়র্ক টাইমস এবং অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও এই চুক্তিতে চীনের 'যুগান্তকারী' ভূমিকার কথা স্বীকার করেছে। প্রতিবেদনটিতে দাবি করা হয়, চীন ও পাকিস্তানের সক্রিয় মধ্যস্থতা ছাড়া এই যুদ্ধবিরতি সম্ভব হতো না।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এএফপি নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তিনি বিশ্বাস করেন চীনই ইরানকে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত করেছে। ইরানি ও পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকেও একই ধরনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বলা হচ্ছে, ইসলামাবাদের ১১তম ঘণ্টার রুদ্ধদ্বার আলোচনায় বেইজিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে এই মধ্যস্থতায় চীনের প্রভাব ঠিক কতটা ছিল, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। আবু ধাবি ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'ট্রেন্ডস'-এর জ্যেষ্ঠ গবেষক নিকোলাস লিয়াল মনে করেন, তেহরানের জন্য এই চুক্তির শর্তগুলো এতটাই অনুকূল ছিল যে, তাদের রাজি করানো আসলে 'খোলা দরজায় ধাক্কা দেওয়ার' মতোই সহজ ছিল।

লিয়ালের মতে, ইরান যে ১০ দফা যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল, তাতে তাদের পূর্ববর্তী সব দাবিই মানা হয়েছে। ফলে চুক্তিতে আসতে ইরানকে খুব একটা ছাড় দিতে হয়নি। বরং একে তারা নিজেদের রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে প্রচার করতে পারছে। তাই চীনের ভূমিকা এখানে প্রভাবক হিসেবে কাজ করলেও, ইরানের নিজস্ব সুবিধাই ছিল বড় কারণ।

সরকারিভাবে বেইজিং এই আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহণের কথা স্বীকার বা অস্বীকার কোনোটিই করেনি। বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং জানান, বেইজিং কেবল পরিস্থিতির উত্তেজনা প্রশমনে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের এই মধ্যস্থতা যতটা না সংকট সমাধানের জন্য, তার চেয়ে বেশি আন্তর্জাতিকভাবে নিজেদের 'দায়িত্বশীল শক্তি' হিসেবে তুলে ধরার কৌশল। এর আগে ২০২৩ সালে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন এবং ২০২৪ সালে ফিলিস্তিনি উপদলগুলোর মধ্যে 'বেইজিং ঘোষণা' সই করিয়ে চীন বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছিল।

এই যুদ্ধবিরতি চীনের জন্য কেবল কূটনৈতিক নয়, বরং অর্থনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হিসেবে চীন জ্বালানির বাজারে স্থিতিশীলতা চায়। বৈশ্বিক মন্দার ঝুঁকি এবং তেলের আকাশচুম্বী দাম চীনের রপ্তানি-নির্ভর অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি। তাই মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা বেইজিংয়ের অন্যতম প্রধান স্বার্থ। তবে তসিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সং বো-এর মতে, চীন কোনো পক্ষের হয়ে সরাসরি গ্যারান্টার বা জামিনদার হওয়ার ঝুঁকি নেবে না। কারণ চুক্তি বাস্তবায়নে সামরিক বা কূটনৈতিক যে ধরনের চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা প্রয়োজন, তা বেইজিংয়ের বর্তমানে নেই।

সব মিলিয়ে, ইরানের যুদ্ধবিরতি যদি কার্যকর হয়, তবে মাঠ পর্যায়ে শান্তি আসুক বা না আসুক, বিশ্বমঞ্চে চীন যে এক ধাপ এগিয়ে গেলতা নিয়ে অন্তত কূটনীতিক মহলে কোনো সন্দেহ নেই।

বাংলাদেশের খবর/এম.আর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন