ইরানে এক মাসের বেশি সময়ের ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে দেশটিতে ৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন। ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় দেশটিতে আহত হন আরও হাজার হাজার মানুষ। অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর ইসরায়েল, ইরান ও মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানও এতে সম্মতি জানিয়েছে। তবে এরই মধ্যে এই শান্তি চুক্তিতে ফাটল দেখা দিয়েছে।
‘একটি পুরো সভ্যতাকে এক রাতে হত্যা’র আলটিমেটাম শেষ হওয়ার মাত্র এক ঘণ্টা আগে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় দুই পক্ষ। ইরান বলেছে, এ দুই সপ্তাহ আইআরজিসির তত্ত্বাবধানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল করবে। ইরানে হামলা বন্ধ হলেও সার্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে। ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির প্রথম দিনে লেবাননে ব্যাপক হামলা চালায়। ১০ মিনিটের ব্যবধানে শতাধিক বিমান হামলায় ২৫৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১ হাজার ৬৫ জন। এ অবস্থায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে বিষয়টি জানান। তিনি এভাবে চলতে থাকলে যুদ্ধবিরতি থেকে বের হওয়ার হুমকিও দেন।
এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইসরায়েলি এই হামলায় লেবানন জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা করেছে। হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্থায়ী শান্তিচুক্তির আলোচনা চালিয়ে যাওয়া ‘অযৌক্তিক’ বলে মন্তব্য করেছে ইরান। ইসরাইলের এই বিধ্বংসী হামলায় কয়েকশ মানুষ নিহত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে তেহরান এখন পাল্টা আঘাতের হুমকি দিয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টার্ক বলেন, লেবাননে হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা সত্যিই ভয়াবহ। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এমন রক্তপাত বিশ্বাস করা কঠিন। এটি শান্তি প্রক্রিয়ার ওপর বিরাট চাপ সৃষ্টি করছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত জরুরি। সমস্ত অভিযোগকৃত লঙ্ঘনের বিষয়ে দ্রুত ও স্বাধীন তদন্ত জরুরি। এর পাশাপাশি দোষীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি। এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এমনকি যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার একদিনের মধ্যেই উত্তেজনা: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়ার পর ২৪ ঘণ্টা পেরিয়েছে মাত্র। পরে ইসরায়েল, ইরান ও মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানও এতে সম্মতি জানিয়েছে। তবে এরই মধ্যে ফাটল দেখা দিয়েছে এই শান্তি চুক্তিতে।
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর লেবাননে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এই যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবানন রয়েছে কি না, তা নিয়ে এখনো মতভেদ রয়েছে। যদিও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতিতে লেবানন অন্তর্ভুক্ত নয়।
এদিকে, লেবাননের ওপর সাম্প্রতিক এই হামলাকে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হিজবুল্লাহর ওপর "সবচেয়ে বড় আঘাত" বলে উল্লেখ করেছেন নেতানিয়াহু। তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে ইসরায়েল আবার ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করবে।
অন্যদিকে, লেবাননে হামলা অবিলম্বে বন্ধ না হলে ‘কঠিন জবাব’ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে ইরান। গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স পাকিস্তানের ইসলামাবাদে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেবেন।
আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল। পারস্য উপসাগরের এই সমুদ্রপথটি বৈশ্বিক তেল ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইরান জানিয়েছে, অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ এ পথে চলাচল করলে তাকে ‘টার্গেট করে ধ্বংস’ করা হবে।
এদিকে, ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার বলেছেন, তাদের ১০ দফা প্রস্তাবের মধ্যে যুদ্ধবিরতির তিনটি শর্ত ইতোমধ্যে ‘স্পষ্টভাবে লঙ্ঘিত’ হয়েছে। তবে জেডি ভ্যান্স বলেছেন, এ ধরনের চুক্তিতে কিছুটা অস্থিরতা থাকাই স্বাভাবিক।
লেবাননে শতাধিক স্থাপনায় হামলা, নিহত ৩৫৪: যুদ্ধবিরতির ঘোষণা হলেও লেবাননজুড়ে বুধবার (৯ এপ্রিল) ব্যাপক হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। সিএনএনের লাইভ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফ জানিয়েছে যে ১০ মিনিটের মধ্যে তারা লেবাননের শতাধিক স্থাপনায় বুধবার হামলা চালিয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর এটি লেবাননে চালানো তাদের সর্ববৃহৎ হামলা বলে আইডিএফ নিশ্চিত করেছে।
গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লেবাননে চালানো ইসরায়েলি বাহিনীর সর্বশেষ হামলায় অন্তত ২৫৪ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ৮৩৭ জন। লেবাননের স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় হতাহতের তথ্য নিশ্চিত করেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম বলেছেন, শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্র নাগরিকদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি হামলায় দেশটির আবাসিক ভবন ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, লেবাননে তাদের সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে।
নেতানিয়াহু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিশেষ বিবৃতিতে স্পষ্ট করে বলেছেন, তার দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে নীতিগত সমর্থন জানালেও লেবাননকে এই চুক্তির বাইরে রাখা হয়েছে।
নেতানিয়াহুর মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য হলো ইরানকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে আসা যাতে দেশটি আর কোনোভাবেই পারমাণবিক, ক্ষেপণাস্ত্র বা সন্ত্রাসী হুমকি তৈরি করতে না পারে।
লেবাননে হামলা তদন্ত চায় জাতিসংঘ: যুদ্ধবিরতি ঘোষণার কিছুক্ষণের মধ্যেই লেবাননে চালানো দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর শতাধিক নৃশংস হামলার বিষয়ে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। বুধবার (৮ এপ্রিল) এসব হামলার জন্য দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার কথা বলেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টার্ক। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরপরই ইসরায়েল ১০ মিনিটে ১০০ বিমান হামলা চালায়।
এদিকে, এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা রেডক্রস সোসাইটি। ঘনবসতিপূর্ণ বৈরুতসহ লেবাননের আবাসিক এলাকাগুলোতে পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই ভারী বিস্ফোরক ব্যবহারের জন্য ইসরায়েলের কড়া সমালোচনা করেছে। সংস্থাটি এসব হামলাকে বেসামরিক জনগণের ওপর ‘গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার শঙ্কা: লেবাননে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলায় যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে উপসাগরীয় দেশগুলো। তারা মনে করছে, এসব লঙ্ঘন পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এসব দেশ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও রকেট হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৭ হাজার প্রজেক্টাইল নিক্ষেপ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর ফলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের হাবশান, সৌদি আরবের রাস তানুরা ও ইয়ানবু, এবং কাতারের বৃহত্তম এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) স্থাপনা রাস লাফফানসহ গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ ছাড়া বিমানবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, লবণমুক্ত পানি উৎপাদন কেন্দ্র এবং আবাসিক এলাকাও হামলার শিকার হয়েছে। এ পরিস্থিতির অবসান চায় উপসাগরীয় দেশগুলো। এ কারণেই তারা বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
যুদ্ধবিরতির ৩ শর্ত লঙ্ঘিত: ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, যুদ্ধবিরতির জন্য দেওয়া তাদের ১০ দফা প্রস্তাবের মধ্যে তিনটি শর্ত স্পষ্টভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দ্বিপাক্ষিক যুদ্ধবিরতি বা আলোচনা অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে গালিবাফ বলেন, প্রস্তাবে লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তবে এ দাবি হোয়াইট হাউস আজ প্রত্যাখ্যান করেছে।
তিনি আরও জানান, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় ফারস প্রদেশে একটি ড্রোন প্রবেশ করেছে। তবে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) বিবিসিকে জানিয়েছে, এ ধরনের কোনো ঘটনার বিষয়ে তারা "অবগত নয়"।
তৃতীয় বিষয় হিসেবে তিনি বলেন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ক্ষেত্রে ইরানের অধিকার প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল। গত রাতে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে উপস্থাপকের মাধ্যমে পাঠ করা ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের (এসএনএসসি) পারস্য ভাষার বিবৃতিতেও বিষয়টি উল্লেখ ছিল।
এদিকে, গণমাধ্যমের কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন গালিবাফকে সম্ভাব্য অংশীদার এমনকি ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব হিসেবেও বিবেচনা করছিল।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের করা যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন। এর ফলে আলোচনাগুলো অর্থহীন হয়ে যাবে। পেজেশকিয়ান আরও বলেন, ইরান লেবাননের জনগণের সঙ্গেই থাকবে।
এদিকে, লেবানন যুদ্ধবিরতির ‘অবিচ্ছেদ্য অংশ’ বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের গালিবাফ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স–এ দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, ‘লেবানন এবং সমগ্র প্রতিরোধ অক্ষ, ইরানের মিত্র হিসেবে যুদ্ধবিরতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।’ তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনাগুলি গুরুতর পরিণতি ডেকে আনবে।
চুক্তি না মানলে আরও ভয়াবহ হামলা-ট্রাম্প: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, আসল যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সব জাহাজ, যুদ্ধবিমান এবং সামরিক সদস্যরা ইরানের আশেপাশে তাদের অবস্থান বজায় রাখবে।
স্থানীয় সময় গত বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক বার্তায় তিনি বলেন, ‘যতক্ষণ না সম্পাদিত প্রকৃত চুক্তিটি সম্পূর্ণরূপে মেনে চলা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সমস্ত মার্কিন জাহাজ, বিমান এবং সামরিক কর্মী, অতিরিক্ত গোলাবারুদ ও অস্ত্রশস্ত্রসহ, ইরানের অভ্যন্তরে ও তার আশেপাশে অবস্থান করবে।’
চুক্তি মানা বা না মানা প্রসঙ্গে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘যদি কোনো কারণে তা না হয় (চুক্তি মানা না হয়)—তেমনটা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম—তাহলে গোলাবর্ষণ শুরু হবে। আরও বড়, আরও ভয়াবহ এবং আরও শক্তিশালীভাবে তা হবে, যা আগে কেউ কখনো দেখেনি।’
হিজবুল্লাহপ্রধানের ভাতিজাকে হত্যার দাবি: ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী গতকাল বৃহস্পতিবার দাবি করেছে, তারা লেবাননের রাজনৈতিক ও সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর প্রধান নাঈম কাসেমের ভাতিজাকে হত্যা করেছে। গতকাল বুধবার রাতে লেবাননের বৈরুতে হামলা চালিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয়।
ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর বিবৃতিতে বলা হয়, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) বৈরুত এলাকায় হামলা চালিয়ে আলি ইউসুফ হারশিকে নির্মূল করে। তিনি হিজবুল্লাহর প্রধান নাঈম কাসেমের ব্যক্তিগত সচিব ও ভাতিজা।
লেবাননে হামলায় জাতিসংঘের নিন্দা: ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির কয়েক ঘণ্টার মাথায় লেবাননজুড়ে ইসরায়েলের চালানো ভয়াবহ বিমান হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘ।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক এক বিবৃতিতে বলেছেন, 'আজ (গতকাল) লেবাননে যে মাত্রায় হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসলীলা চালানো হয়েছে, তা এক কথায় ভয়াবহ।'
তিনি আরও বলেন, 'ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় এ ধরনের ব্যাপক হত্যাকাণ্ড অবিশ্বাস্য। এটি একটি ভঙ্গুর শান্তির ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে।'
ভলকার তুর্ক জানান, টায়ারের কাছে আল-আব্বাসিয়াতে হিরাম হাসপাতালের সামনের একটি ভবনে গত রাতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় চারজন নিহত হয়েছেন এবং হাসপাতালটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া, কলাইলেহ এলাকায় ইসলামিক হেলথ অথরিটির একটি অ্যাম্বুলেন্সে চালানো হামলায় আরও তিনজন নিহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, সকল লঙ্ঘনের অভিযোগের বিষয়ে দ্রুত ও স্বাধীন তদন্ত হতে হবে এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।
জাহাজ চলাচলের নতুন রুট ঘোষণা ইরানের: হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে বিকল্প পথ ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছে ইরান। দেশটির বিপ্লবী গার্ডস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সামুদ্রিক নিরাপত্তার নীতিমালা মেনে চলা এবং সমুদ্রে পেতে রাখা সম্ভাব্য মাইনের ঝুঁকি এড়াতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ওই বিবৃতিতে বিকল্প নৌপথের দিকনির্দেশনাও তুলে ধরা হয়েছে এবং একটি মানচিত্রও দেখানো হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ওমান সাগরের দিক থেকে প্রবেশ করা জাহাজগুলোকে লারাক দ্বীপের উত্তর পাশ দিয়ে চলাচল হবে এবং সেখান থেকে পারস্য উপসাগরের দিকে অগ্রসর হতে হবে।
অন্যদিকে, পারস্য উপসাগর থেকে বের হওয়া জাহাজগুলোকে লারাক দ্বীপের দক্ষিণ দিক দিয়ে অতিক্রম করে ওমান সাগরের দিকে যেতে বলা হয়েছে।
ঘোষিত নতুন রুটগুলো হলো- প্রবেশ পথ: ওমান সাগর থেকে লারাক দ্বীপের উত্তর দিক দিয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করতে হবে। বহির্গমন পথ: পারস্য উপসাগর থেকে লারাক দ্বীপের দক্ষিণ দিক দিয়ে ওমান সাগরের দিকে যাত্রা করতে হবে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মূলত সমুদ্রে মাইন বিস্ফোরণের ঝুঁকি এড়াতেই এই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ইসলামাবাদে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধিদের বৈঠক আজ: পাকিস্তানের ইসলামাবাদে আজ শুক্রবার বৈঠকে বসবেন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা। গত বুধবার সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম এক্সে পোস্ট দিয়ে এমন ঘোষণা দিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ।
শেহবাজ লিখেছেন, ‘আমি উভয় দেশের নেতৃত্বের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আগামী শুক্রবার ইসলামাবাদে তাদের প্রতিনিধি দলকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি, যাতে সমস্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি চূড়ান্ত চুক্তির লক্ষ্যে পরবর্তী আলোচনা এগিয়ে নেওয়া যায়।’
প্রায় ৩৯ দিনের যুদ্ধে অস্ত্রবিরতির ক্ষেত্রে তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনে ভূমিকা রেখেছে পাকিস্তান। শেহবাজ শরিফ লিখেছেন, ‘তিনি আশা করেন ইসলামাবাদ বৈঠক টেকসই শান্তি স্থাপনে সফল হবে।’
নাম না প্রকাশ করার শর্তে পাকিস্তানের দুটি সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন। প্রতিনিধি দলটি ইসলামাবাদে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে বৈঠক করবেন।
অন্যদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা ‘খুব শিগগিরই’ হবে। তবে নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে জে ডি ভ্যান্স তাতে অংশ না-ও নিতে পারেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধে ইরান তাদের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হারিয়েছে। যৌথ আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় পাল্টা হামলা করেছে উপসাগরীয় দেশগুলোতে। পরবর্তীতে লেবাননও এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। ইরান সমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে হামলা চালায়। জবাবে ইসরায়েল লেবাননের রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে হামলা চালায় এবং দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে স্থল অভিযান শুরু করে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে চুক্তি করার জন্য ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা শেষ হওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা আগে তেহরান-ওয়াশিংটন যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

