মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী রূপ দিতে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের মধ্যে নির্ধারিত শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছে। বৈঠকটিতে সভাপতিত্ব করছেন পাকিস্তানের সেনাবাহিনী প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর দুই দেশের মধ্যে এটাই সর্বোচ্চ পর্যায়ের আলোচনা।
পাকিস্তান সরকারের সূত্রে বরাতে বিবিসি উর্দু জানিয়েছে, স্থানীয় সময় শনিবার বিকেল ৪টায় এই আলোচনা শুরু হয়। বৈঠকে ইরানের নেতৃত্ব দেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। বৈঠকে অংশ নেন ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও। আর যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বধীন মার্কিন প্রতিনিধি দলের রয়েছেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার।
মধ্যস্ততায় পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সঙ্গে রয়েছেন দেশটির উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশহাক দার ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, ইসলামাবাদের বিলাসবহুল পাঁচতারা হোটেল সেরেনায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই শান্তি আলোচনা শুরু হয়, যা পাকিস্তানের রাজধানীর অন্যতম সুরক্ষিত ভবন হিসেবে আর্বিভূত হয়েছে।
আলোচনার সঙ্গে জড়িত ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাতে আলজাজিরা জানিয়েছে, পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের উপস্থিতিতে দুটি দল সরাসরি আলোচনায় বসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল দুই দেশ পাকিস্তানের মাধ্যমে কথা বলবে। কিন্তু পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একই কক্ষে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা শুরু হয়েছে। এক্ষেত্রে এটি হবে ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রথমবারের মতো উচ্চপর্যায়ের সরাসরি আলোচনা।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, আলোচনায় লেবাননে যুদ্ধবিরতির প্রয়োজনীয়তাসহ মৌলিক শর্তগুলোর বিষয়ে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। এর মধ্যে ইরানিদের দাবিকৃত সম্পদ অবমুক্ত করার বিষয়ও রয়েছে। তবে এখনও প্রাথমিক পর্যায় এবং এর অনেক কিছুই নিশ্চিত হওয়া বাকি, কিন্তু একটি বড় ধরনের অগ্রগতির সম্ভাবনা নিয়ে পাকিস্তানিরা এখনও খুবই আশাবাদী।
ইরানি প্রতিনিধি দলের প্রধান দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ পাকিস্তান সফরের আগেও বলেছিলেন, আলোচনার শর্ত হিসেবে লেবাননে যুদ্ধবিরতি এবং যুক্তরাষ্ট্রে জব্দ থাকা ইরানি সম্পদ মুক্ত করার শর্ত অবশ্যই পূরণ করতে হবে।
এর আগে শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে আসা ইরানি ও মার্কিন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে পৃথকভাবে বৈঠক করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। এসব বৈঠকের ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি আলোচনার বিস্তারিত বিষয় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
পৃথক বৈঠক নিয়ে পাকিস্তান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ শান্তি আলোচনায় ‘ইরানের সম্পৃক্ততার প্রশংসা করেছেন’ এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে অর্থবহ ফলাফল অর্জনের গতি সঞ্চারে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকা অব্যাহত রাখার ‘আন্তরিক সংকল্পের’ কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
শাহবাজ শরিফ ও মার্কিন-ইরান প্রতিনিধিদলের বৈঠক: পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে জেডি ভ্যান্স বর্তমানে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অবস্থান করছেন। মার্কিন প্রতিনিধিদলের হয়ে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে মূল বৈঠকে বসার আগে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় অংশ নিলেন।
বৈঠকে ভ্যান্সের সঙ্গে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, এ গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে পাকিস্তানের পক্ষে আরও উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি।
এর আগে এক বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আশা প্রকাশ করেন, এই আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে একটি বড় ধাপ হিসেবে কাজ করবে। একইসঙ্গে দুই পক্ষকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা দিতে পাকিস্তানের অঙ্গীকারের কথা তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।
এদিকে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠক করেছে ইরানের প্রতিনিধিদল। দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের নেতৃত্বে এ প্রতিনিধিদলে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও উপস্থিত ছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনার উদ্দেশ্যে ইরানি প্রতিনিধিদল এখন ইসলামাবাদে অবস্থান করছে। গতকাল তারা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ওই বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠকের বিস্তারিত সম্পর্কে এখনো কিছু জানানো হয়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুরু হতে যাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার আগে পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা এবং দ্বিপাক্ষিক নানা বিষয় নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
আলোচনার টেবিলে যা থাকছে: উভয় পক্ষই বড় ধরনের মতপার্থক্য নিয়ে আলোচনায় বসেছে। ইরানের ১০ দফা শান্তি প্রস্তাবের মধ্যে হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ, মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধের দাবি রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে এসব শর্ত মেনে নেয়নি, তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ১০ দফা পরিকল্পনাটিকে ‘কার্যকরযোগ্য’ বলেছেন। হোয়াইট হাউস দাবি করেছে, ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ ছেড়ে দিতে রাজি আছে। মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট বলেছেন, এ বিষয়ে আপসের কোনো সুযোগ নেই। অবশ্য ইরান এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি জানায়নি।
আরেকটি বড় বিরোধের বিষয় লেবানন। বুধবার উত্তর লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় ২০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যা বর্তমান যুদ্ধের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকলে তেহরান যুদ্ধবিরতি থেকে সরে আসতে পারে। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে হয় যুদ্ধবিরতি নয়ত ইসরায়েলের মাধ্যমে যুদ্ধ—এই দুটোর একটি বেছে নিতে হবে।
তিনি পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সেই বক্তব্যের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, যেখানে বলা হয়েছিল, যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবাননসহ পুরো অঞ্চলেই হামলা বন্ধ থাকবে। তবে বুদাপেস্টে দেওয়া বক্তব্যে ভ্যান্স বলেছেন, যুদ্ধবিরতির শর্তে লেবানন অন্তর্ভুক্ত নয়। ট্রাম্প এবং হোয়াইট হাউসের অবস্থানও এক্ষেত্রে একই।
চীনে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাসুদ খালিদ আল জাজিরাকে বলেন, আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই পরিবেশ ‘বিষিয়ে’ উঠেছে।
তিনি বলেন, ‘ইসরায়েল এই প্রক্রিয়াকে ভণ্ডুল করতে বাধা সৃষ্টি করছে। লেবাননে অবিরাম হামলা চালিয়ে তারা এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চায়, যাতে পক্ষগুলো আরও কঠোর অবস্থান নেয় এবং আলোচনা ভেঙে পড়ে। এই পর্যায়ে আমরা কেবল সতর্কভাবে আশাবাদী হতে পারি, কারণ আলোচনা নিশ্চিতভাবেই জটিল ও দীর্ঘ হবে এবং তা ১৫ দিনের সময়সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে।’
ওয়াশিংটনভিত্তিক স্বাধীন বিশ্লেষক সাহার খানও একই মত পোষণ করেছেন। তিনি আল জাজিরাকে বলেছেন, ‘আস্থার সংকটই’ সবচেয়ে বড় বাধা। ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয়ই এখন সর্বোচ্চ দাবি তুলে ধরে নিজেদের ‘বিজয়ী’ হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করছে। তবে এই যুদ্ধবিরতি যদি টিকে থাকে এবং তারা শেষ পর্যন্ত বৈঠকে বসে, সেটাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
সদিচ্ছা নিয়ে আলোচনার আহ্বান জাতিসংঘের: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অনুষ্ঠেয় শান্তি আলোচনাকে স্বাগত জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। একই সঙ্গে তিনি উভয় পক্ষকে ‘সদিচ্ছা’ নিয়ে আলোচনায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
গত শুক্রবার জাতিসংঘের নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে মহাসচিবের মুখপাত্র স্তেফান দ্যুজারিক এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, গুতেরেস দুই পক্ষকে এ কূটনৈতিক সুযোগ কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে একটি স্থায়ী ও পূর্ণাঙ্গ চুক্তির দিকে অগ্রসর হওয়া যায় এবং উত্তেজনা প্রশমন করা সম্ভব হয়।
পুনরায় যুদ্ধাবস্থায় ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি ঠেকাতে সংলাপই একমাত্র কার্যকর পথ বলে গুতেরেস মনে করেন। দ্যুজারিক বলেন, ‘মহাসচিব জোর দিয়ে বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদ মেনে বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের কোনো বিকল্প নেই।’
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় সহায়তা করতে জাতিসংঘ মহাসচিবের একজন ব্যক্তিগত দূত বর্তমানে ওই অঞ্চলে অবস্থান করছেন বলে ব্রিফিংয়ে জানানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাস নিয়েই আলোচনা-আব্বাস আরাগচি: ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সম্পূর্ণ অবিশ্বাস রেখেই তারা আসন্ন আলোচনায় অংশ নিচ্ছে। জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়েডফুলের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি এ মন্তব্য করেন বলে ইরানি বার্তা সংস্থা মেহের নিউজ জানিয়েছে।
আরাগচি বলেন, ইরান তার জনগণের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষায় সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসার আগে তিনি ওয়াশিংটনের অতীত আচরণকে ‘প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ’ এবং ‘কূটনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
বিশ্বের অর্ধশত সাংবাদিক ইসলামাবাদে: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনার খবর সংগ্রহে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অন্তত ৫০ জন সাংবাদিক পাকিস্তানে রয়েছেন।
পাকিস্তানের তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার এ তথ্য দিয়েছেন বলে ডিও পাকিস্তান লিখেছে।
আতাউল্লাহ তারার বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাংবাদিকদের পাশাপাশি চীন, জাপান, জার্মানি, সৌদি আরব ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা ইসলামাবাদে অবস্থান করছেন।
সাংবাদিকদের সুবিধার্থে জিন্নাহ কনভেনশন সেন্টারে একটি মিডিয়া সেন্টার করা হয়েছে। সেখানে উচ্চগতির ইন্টারনেট, বড় পর্দাসহ সংবাদ সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের আধুনিক সরঞ্জাম রাখা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র: ইরানের সাথে যুদ্ধবিরতি চললেও মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র। বিভিন্ন নেভিগেশনাল-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, পণ্যবাহী এবং জ্বালানি সরবরাহকারী (রিফুয়েলিং) বিমানগুলো এখনো মধ্যপ্রাচ্যের দিকে নিয়মিত যাতায়াত করছে।
বিভিন্ন ট্র্যাকিং ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মার্কিন বিমান বাহিনীর লজিস্টিক ও আকাশপথে জ্বালানি সরবরাহের কাজ অব্যাহত রয়েছে। এটি মূলত তাদের কৌশলগত অবস্থান বজায় রাখা এবং যেকোনো অভিযানের জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকারই একটি ইঙ্গিত। এর পাশাপাশি মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) কমান্ডার নিশ্চিত করেছেন, যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী ইরানের ওপর সব ধরণের আক্রমণাত্মক অভিযান সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন সামরিক বাহিনী জোর দিয়ে বলেছে, তাদের সেনারা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত। তারা তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের সহায়তা প্রদান এবং শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বজায় রাখার বিষয়টি অব্যাহত রেখেছেন।
হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নাকচ: আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে লেবাননের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক শান্তি আলোচনা শুরু করতে রাজি হয়েছে ইসরায়েল। তবে দেশটি স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এই আলোচনায় হিজবুল্লাহর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত শুক্রবার এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত মাইকেল লেটার বলেন, ‘ইসরায়েল হিজবুল্লাহর মতো সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছে। এই গোষ্ঠীটি এখনো ইসরায়েলে হামলা চালাচ্ছে এবং দুই দেশের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তারাই প্রধান বাধা।’
জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত লেবানন ও ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত এবং বৈরুতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের মধ্যে এ বিষয়ে একটি ফোনালাপ হয়েছে।
লেবাননের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আগামী মঙ্গলবার যে আলোচনার পরিকল্পনা করা হয়েছে, তা মূলত ইসরায়েল-লেবানন সংঘাত বন্ধে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির ওপর গুরুত্ব দেবে।
শিগগিরই খুলবে হরমুজ প্রণালী-ট্রাম্প: ইরানের সহায়তা থাকুক বা না থাকুক, হরমুজ প্রণালী ‘খুব শিগগিরই’ খুলে দেওয়া হবে, এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আসন্ন শান্তি আলোচনার আগে শুক্রবার তিনি এ মন্তব্য করেন।
ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রণালীটি খুলে দিতে কাজ করবে এবং প্রয়োজনে অন্যান্য দেশও সহায়তা দেবে। তবে তিনি স্বীকার করেন, এটি সহজ প্রক্রিয়া হবে না। একই সঙ্গে হরমুজে জাহাজ চলাচলে ইরানের সম্ভাব্য টোল আরোপের পরিকল্পনাও যুক্তরাষ্ট্র মেনে নেবে না বলে জানান তিনি।
ট্রাম্পের ভাষায়, যেকোনো চুক্তির মূল শর্ত হবে—ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে। এই শর্ত পূরণ হলেই প্রণালীটি ‘স্বয়ংক্রিয়ভাবে’ খুলে যাবে।
যদিও মঙ্গলবার দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হয়েছে, তবুও হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির রয়েছে। বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে যায়, ফলে পরিস্থিতি বৈশ্বিক বাজারে বড় প্রভাব ফেলছে।
তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে যেখানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩৫টি জাহাজ চলাচল করত, সেখানে এখন সংখ্যা নেমে এসেছে হাতে গোনা কয়েকটিতে। বর্তমানে উপসাগরে ৬০০টির বেশি জাহাজ আটকা পড়ে আছে।
লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ১০: দক্ষিণ লেবাননে পৃথক ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি (এনএনএ)। প্রতিবেদনে বলা হয়, নাবাতিয়েহ জেলার কফর সির শহরে এক হামলায় চারজন নিহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে একজন প্যারামেডিক রয়েছেন। এ ঘটনায় আরও চারজন আহত হন।
একই জেলার জেফতা শহরে আরেক হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে লেবাননের সিভিল ডিফেন্সের একজন সদস্য রয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও দুজন। এ ছাড়া তৌল শহরে আরেকটি হামলায় তিনজন নিহত ও তিনজন আহত হয়েছেন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
পাকিস্তানকে বড় সুখবর দিল সৌদি: অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাওয়া পাকিস্তানের জন্য বড় এক আশার আলো নিয়ে এলো সৌদি আরব। দেশটির কঠিন সময়ে পূর্ণ আর্থিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে রিয়াদ। সম্প্রতি সৌদি অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ আল-জাদানের এক উচ্চপর্যায়ের পাকিস্তান সফরের মাধ্যমে এই ঘোষণা আসে। এতে করে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সৌদি অর্থমন্ত্রীর একদিনের এই সংক্ষিপ্ত সফরে মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল পাকিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা। বৈঠকে জানানো হয়, সৌদি আরব কেবল সাময়িক সাহায্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী সহযোগিতার মাধ্যমে পাকিস্তানকে সংকটমুক্ত করতে চায়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র মতে, ঋণের পরিমাণ বাড়ানো, ক্রেডিট লাইনের প্রসার এবং তেল আমদানিতে বিশেষ আর্থিক সুবিধা প্রদানের বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তান সৌদি আরবের কাছে ৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন ঋণ এবং তেল আমদানিতে আর্থিক সুবিধার মেয়াদ আরও ৫ বছর বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। উল্লেখ্য যে, এই মাসেই পাকিস্তানকে প্রায় ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হবে, যার মধ্যে ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের ইউরোবন্ড ইতিমধ্যেই পরিশোধ করা হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখতে এখন সৌদি আরবের এই সহযোগিতা পাকিস্তানের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে সমন্বিত হামলা চালায়। এতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশটির সামরিক ও বেসামরিক বহু স্থাপনা। পাঁচ সপ্তাহে ইরানে ৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরানও হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেয়। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দেয়।
গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। যুদ্ধবিরতির প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ইসরাইল লেবাননে শতাধিক হামলা চালালে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। ইরান মনে করে, যুদ্ধবিরতি সব ফ্রন্টে প্রযোজ্য হওয়া উচিত, যার মধ্যে হিজবুল্লাহও অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল লেবাননের হামলাকে যুদ্ধবিরতির বাইরে হিসেবে দেখছে—এই মতপার্থক্য বারবার আলোচনাকে অনিশ্চয়তায় ফেলেছে। এ যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হবে আগামী ২২ এপ্রিল।
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

