Logo

আন্তর্জাতিক

ইসলামাবাদ ব্যর্থ, মধ্যস্থতার প্রস্তাব রাশিয়ার

Icon

হাসান রাজীব

প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬, ২১:৪৫

ইসলামাবাদ ব্যর্থ, মধ্যস্থতার প্রস্তাব রাশিয়ার

সারা বিশ্বের দৃষ্টি ছিল ইসলামাবাদে। সবাই তাকিয়ে ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের শান্তি আলোচনা কোন ফলাফল নিয়ে আসে সেদিকে। কিন্তু কোনো সুখবর পেল না বিশ্ববাসী। ব্যর্থতায় শেষ হয়েছে ইসলামাবাদ আলোচনা। দুই পক্ষই যুদ্ধে জয়ী হওয়ার দাবি করে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে সংলাপে বসেছিল। তাই শুরু থেকেই এই সংলাপে কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো বেশ কঠিন বলে ধারণা করা হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতার জন্য একে অপরকে দায়ী করে ইসলামাবাদ ছেড়ে গেল।

আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার কারণ হিসেবে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বন্ধের ব্যাপারে কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে রাজি হয়নি। ইরান সবসময়ই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টার কথা অস্বীকার করে আসছে। এখন এক বছরের মধ্যে দুটি যুদ্ধের ঘটনা হয়তো দেশটিতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি সংক্রান্ত দাবিকে আরও জোরালো করবে।

আর পাকিস্তান সফররত ইরানের প্রতিনিধি দলের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের বরাত দিয়ে দেশটির ফার্স নিউজ এজেন্সি বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় এমন কিছু বিষয় দাবি করেছে, যা তারা যুদ্ধের মাধ্যমেও অর্জন করতে পারেনি।

সংশ্লিষ্ট ওই সূত্র জানায়, হরমুজ প্রণালি, ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক জ্বালানি কর্মসূচি ও আরও বেশ কিছু বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চাভিলাষী শর্তগুলো তেহরান মেনে নেয়নি।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- এরপর কী হবে? বিবিসির আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা জো ইনউড লিখেছেন, সংলাপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল হরমুজ প্রণালি। যা ইরান প্রায় বন্ধ করে রেখেছে। এখন আলোচনার মাধ্যমে সেটি খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা কার্যত শেষ হয়ে গেল। উপসাগরে দুটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র এবার ভিন্ন পথে এগোতে চাইছে।

২১ ঘণ্টায়ও সমঝোতা হয়নি: মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স বলেছেন, ২১ ঘণ্টা আলোচনার পরও ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। সমঝোতা ছাড়াই পাকিস্তান ছাড়ার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এটি দুঃসংবাদ বলেন ভ্যান্স। ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনার পর পাকিস্তানের ইসলামাবাদে রোববার সকালে সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান ভ্যান্স।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও ফিল্ড মার্শালের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। পাকিস্তান অসাধারণ ভূমিকা রেখেছেন বলে জানান ভ্যান্স। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো স্পষ্টভাবে ইরানকে জানিয়েছে। তবে ইরান তাতে রাজি হয়নি।

ইরানের পরমাণু সক্ষমতা নিয়ে কিছু প্রশ্নের উত্তর দেন ভ্যান্স। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে বলে জানান ভ্যান্স। তবে ভবিষ্যতে ইরান যাতে পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করে সে জন্য দৃঢ় অঙ্গীকার প্রয়োজন। তবে সেটা এখনো প্রতীয়মান হয়নি। এমনটা হবে বলে যুক্তরাষ্ট্র আশা করছে।

আল-জাজিরার খবর বলছে, এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান আলোচনা নিয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই। ওই বিবৃতিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অতিরিক্ত ও বেআইনি । ইরানের বৈধ অধিকার ও স্বার্থকে মেনে নেওয়ার ওপরও আলোচনার সাফল্য নির্ভরশীল বলে জানান বাগাই।

আলোচনা গড়ায় দ্বিতীয় দিনে: পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনা দ্বিতীয় দিনে গড়িয়েছে। আলোচনার সময়সীমা আরও একদিন বাড়ানো হয়েছে। গতকাল রোববারও চলে ঐতিহাসিক আলোচনা। ইরানি সূত্রগুলো জানিয়েছে, টানা ১৪ ঘণ্টা (কোনো কোনো সংবাদমাধ্যম বলছে ১৫ ঘণ্টা) আলোচনার পর দুই পক্ষ এখন বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে খসড়া বিনিময় করছে। এটি সংশ্লিষ্টদের মধ্যে এই আশা জাগাচ্ছে যে, একটি বৃহত্তর কাঠামোর বিষয়ে উভয় পক্ষ ইতিমধ্যে একমত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা এখন পরবর্তী পদক্ষেপের বিস্তারিত বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছেন।

ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রথমে ইরানি প্রতিনিধিদল এবং পরে মার্কিন প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদে পৌঁছায়। এরপর আয়োজক পাকিস্তান দুই পক্ষের সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করে। লেবাননে যুদ্ধবিরতি এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ে মতভেদ থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষ সরাসরি আলোচনায় বসে। ইরান তাদের জব্দ করা সম্পদ ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে আগের অবস্থানেই অনড় ছিল।

আলোচনা কক্ষ থেকে খুব সামান্য তথ্যই বাইরে এসেছে। তবে সূত্রগুলো থেকে পাওয়া তথ্যে বোঝা যাচ্ছে, আলোচনার প্রক্রিয়ায় নানা চড়াই-উতরাই থাকলেও সামগ্রিক পরিবেশ ছিল ইতিবাচক।

আলোচনা চালিয়ে যাবে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র: পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা শেষ হয়েছে। উচ্চপর্যায়ের এ আলোচনার পর প্রক্রিয়াটি এখন কারিগরি পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে উভয় পক্ষ লিখিত প্রস্তাব বিনিময় করছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে ইরান সরকার জানিয়েছে, ইসলামাবাদে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে দুই দেশের কারিগরি দল এখন বিস্তারিত প্রস্তাব ও ‘বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের খসড়া’ বিনিময় করছে।

পোস্টে আরও বলা হয়, কিছু বিষয়ে এখনো মতপার্থক্য থাকলেও আলোচনা অব্যাহত থাকবে। এর মাধ্যমে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর দূরত্ব কমিয়ে আনতে আলোচনা এখন খসড়া তৈরির চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে টেকসই যুদ্ধবিরতি এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে পাকিস্তান এ প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতা করছে।

কয়েক সপ্তাহের পরোক্ষ কূটনীতির পর এ আলোচনা এখন একটি কাঠামোগত রূপ পেয়েছে। বর্তমানে কারিগরি, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রস্তাবগুলোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ইরানকে শেষ করে দেওয়ার হুমকি ট্রাম্পের: ইরানকে ‘শেষ করে দেওয়ার’ হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প নিজের মালাকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ দেওয়া এক পোস্টে বলেছেন, ওয়াশিংটন যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। ‘উপযুক্ত সময়ে’ ইরানকে ‘শেষ করে দেবে’ মার্কিন বাহিনী।

পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার প্রায় ২১ ঘণ্টার আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মাথায় ট্রাম্প এই হুমকি দিলেন।

যুদ্ধবিরতি রক্ষার আহ্বান পাকিস্তানের: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক সরাসরি আলোচনা কোনো ধরনের সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দুই পক্ষকে যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশহাক দার।  মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় দুই দেশ আগামীতেও ‘ইতিবাচক মনোভাব’ বজায় রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। বৈঠক শেষে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইশহাক দার বলেন, 'উভয় পক্ষকে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা এবং তা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।' পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে দেওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

ইশহাক দার আরও জানান যে, আগামী দিনগুলোতেও পাকিস্তান দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন অব্যাহত রাখবে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে সংলাপের পথ প্রশস্ত করতে পাকিস্তান নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ইসহাক দার বলেন, ‘গত ২৪ ঘণ্টা ধরে দুপক্ষের মধ্যে চলা কয়েক দফার নিবিড় ও গঠনমূলক আলোচনায় আমি নিজে এবং চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনির মধ্যস্থতা করেছি।’

ইসহাক দার আরও বলেন, ‘যুদ্ধবিরতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকার প্রশংসা করায় আমি উভয় পক্ষকে ধন্যবাদ জানাই।’

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার আশা প্রকাশ করে বলেন, পুরো অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ও সমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনতে উভয় পক্ষ এ ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রাখবে।

মধ্যস্থতার প্রস্তাব রাশিয়ার: ইসলামাবাদ সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার পর মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিল রাশিয়া। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে গতকাল রোববার ফোনালাপ করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। আলাপে পুতিন বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য মধ্যস্থতার প্রচেষ্টায় সহায়তা করতে তিনি প্রস্তুত। 

দুই নেতার ফোনালাপের একটি বিবরণ গণমাধ্যমে পাঠিয়েছে ক্রেমলিন। এতে বলা হয়েছে, ভ্লাদিমির পুতিন সংঘাতের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে এবং স্থায়ী শান্তি অর্জনে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টায় আরও সহায়তা করতে চান। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সহায়তার জন্য তার প্রস্তুতিও আছে।

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা স্পুটনিক তাদের প্রতিবেদনে লিখেছে, ফোনালাপে মাসুদ পেজেশকিয়ান ইসলামাবাদে হওয়া আলোচনার বিষয়ে পুতিনকে অবহিত করেন। রাশিয়ার নীতিগত অবস্থান ও মানবিক সহায়তার জন্য তিনি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন।

ফোনালাপে দুই নেতা প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। এদিকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতায় পৌঁছানোর প্রচেষ্টায় অবদান রাখার আগ্রহ প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। রোববার সংস্থাটির পররাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র আনুয়ার এল আনুনি ইসলামাবাদ সংলাপের ব্যর্থতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কোনো সমঝোতায় পৌঁছানোর আরও প্রচেষ্টায় ব্রাসেলস অবদান রাখবে।

হরমুজে টোল দিতে হবে রিয়ালে: ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের শান্তি আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছে। আলোচনার অন্যতম প্রধান বাধা ছিল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি। এ জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ ও এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) পরিবহন করা হয়।

ইরানের সংবাদ সংস্থা মেহের নিউজ বলেছে, দেশটির পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার হাজি বাবেয়ি হরমুজ প্রণালিকে তেহরানের জন্য একটি ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, প্রণালিটি পুরোপুরি ইরানের নিয়ন্ত্রণে আছে এবং এখান দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য অবশ্যই ইরানি মুদ্রা ‘রিয়ালে’ টোল পরিশোধ করতে হবে।

অন্যদিকে, গত শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, এ জলপথ ‘শিগগিরই খুলে দেওয়া’ হবে। 

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তাদের দুটি সামরিক জাহাজ ইতিমধ্যে প্রণালিটি অতিক্রম করেছে। সমুদ্র থেকে মাইন অপসারণের একটি ব্যাপক অভিযানের অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে তারা দাবি করে। তবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) যুক্তরাষ্ট্রের এ দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেকোনো সামরিক জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করা হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আইআরআইবির বরাতে বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, বিপ্লবী গার্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সাধারণ বেসামরিক জাহাজগুলোকে সুনির্দিষ্ট শর্তে এখান দিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হতে পারে।

বৈঠক শেষে নীরব ট্রাম্প: ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এর আগের আলোচনাগুলো বছরের পর বছর ধরে চলেছিল। উদাহরণ হিসেবে ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির কথা বলা যায়। তবে এবারের আলোচনার পরিধি ছিল অনেক বড়। বিশেষ করে যুদ্ধের ফলে তৈরি হওয়া নানা সংকট ও হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো এবারের আলোচনার কেন্দ্রে ছিল।

ইসলামাবাদে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের আলোচনা শেষ হলেও প্রশ্ন উঠেছে—কূটনীতি কি তবে এখানেই শেষ? আগামী কয়েক ঘণ্টায় কী হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পুরো প্রক্রিয়ার প্রধান ব্যক্তি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে এখনো কোনো মন্তব্য পাওয়া না যাওয়ায়।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, ইসলামাবাদে কোনো চুক্তি হয়নি। তবে তার বক্তব্যে এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাব এখনো টেবিলে রয়েছে। ইরান চাইলে সেটি বিবেচনা করে আবার আলোচনায় ফিরতে পারে।

সবাই এখন তাকিয়ে আছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দিকে। কিন্তু ট্রাম্পের নীরবতা সবাইকে ভাবিয়ে তুলছে। অথচ মাত্র কয়েক দিন আগেই তিনি এক টুইটে (এক্স) চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘আজ রাতে একটি পুরো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে, যা আর কখনোই ফিরে আসবে না।’

কূটনীতির ব্যর্থতা মানেই যুদ্ধের পথে ফেরা। যদিও এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে এবং এর মেয়াদ আরও প্রায় ১০ দিন বাকি রয়েছে। ইসরায়েল ছাড়া পাকিস্তানসহ আন্তর্জাতিক মহলের সবাই চাইছে এ যুদ্ধবিরতি যেন বজায় থাকে।

ইরানে নিহত বেড়ে ৩,৩৭৫: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের ভয়াবহতায় এখন পর্যন্ত ৩,৩৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে তেহরান। ইরানের ফরেনসিক মেডিসিন সংস্থার প্রধান আব্বাস মাসজেদি আরানি এই তথ্য জানিয়েছেন।

ইরানি গণমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে আরানি বলেন, কর্তৃপক্ষ যুদ্ধে নিহত ৩,৩৭৫ জনের মরদেহ শনাক্ত করেছে। তিনি নিহতের সংখ্যার একটি লিঙ্গভিত্তিক পরিসংখ্যান দিয়ে জানান, নিহতদের মধ্যে ২,৮৭৫ জন পুরুষ এবং প্রায় ৫০০ জন নারী রয়েছেন।

নিহতদের পরিচয় শনাক্তকরণের কাজ শেষে এই দাপ্তরিক তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক এই যুদ্ধের ফলে ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে যে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে, এই পরিসংখ্যান তারই একটি আনুষ্ঠানিক চিত্র তুলে ধরল।

লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ৫: লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর কানায় ইসরায়েলি হামলায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন। দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এনএনএ জানিয়েছে, হামলায় আরও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।

এনএনএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিভিল ডিফেন্সের দলগুলো আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে পাশের টায়ার শহরের হাসপাতালে পাঠানোর কাজ করছে। ইসরায়েল টায়ারের বিভিন্ন এলাকাতেও হামলা চালিয়েছে। এতে মারাকা নামক স্থানে অন্তত তিনজন আহত হয়েছেন।

এর আগেও বিভিন্ন সময় ইসরায়েলি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন কানা শহরের বাসিন্দারা। বিশেষ করে ১৯৯৬ ও ২০০৬ সালে শহরটিতে বড় ধরনের হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল ইসরায়েলি বাহিনী।

পাকিস্তান ছাড়ল মার্কিন ও ইরান প্রতিনিধি দল: ঘণ্টার পর ঘণ্টা শ্বাসরুদ্ধকর আলোচনা এবং কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পরও কোনো ধরনের সমঝোতা ছাড়াই পাকিস্তান ছাড়ছে মার্কিন ও ইরান প্রতিনিধি দল। গতকাল রোববার স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ০৮ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইসলামাবাদের বিমানবন্দর থেকে এয়ার ফোর্স টু প্লেনে চড়ে দেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।

যাওয়ার আগে প্লেনের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে এবং বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন (থাম্বস আপ) করে বিদায় নেন তিনি। এর আগে, সংক্ষিপ্ত এক সংবাদ সম্মেলনে জেডি ভ্যান্স জানান, ২১ ঘণ্টার দীর্ঘ আলোচনার পরও ইরান যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া শর্তগুলো গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

এদিকে, ইরানের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল পাকিস্তান সফর শেষে দেশে ফিরে গেছে বলে জানিয়েছে ইরানের মেহের নিউজ এজেন্সি। প্রতিনিধি দলে ছিলেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।

এর আগে জেডি ভ্যান্স ইসলামাবাদ ত্যাগ করেন। বিদায়ের আগে তিনি জানান, বৈঠকে কোনো সমঝোতা হয়নি এবং ইরান ওয়াশিংটনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।

ইরানের সভ্যতা ধ্বংসের ব্যাপারে মার্কিন প্রেসিডেন্টর হুমকির পর গত বুধবার দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। তখন বলা হয়েছিল, আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের অবসানে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তির চেষ্টা করা হবে। এখন আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় ইরানে নতুন করে হামলা শুরু হবে কি না সে বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো ঘোষণা আসেনি। তবে আগের হুমকিগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, ফের হামলা শুরুর সম্ভাবনা আছে।


বাংলাদেশের খবর/এইচআর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন