Logo

আন্তর্জাতিক

মিডেলইস্ট আই-এর বিশ্লেষণ

মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে আতঙ্কের নাম ইসরায়েলি ‘দাহিয়াহ ডকট্রিন’

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ২০:১১

মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে আতঙ্কের নাম ইসরায়েলি ‘দাহিয়াহ ডকট্রিন’

ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় লেবানন ও গাজা বিধ্বস্ত জনবসতি

লেবানন ও গাজায় চলমান যুদ্ধে ইসরায়েলি বাহিনীর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পেছনে যে সামরিক দর্শনটি কাজ করছে, তা আন্তর্জাতিক মহলে দাহিয়াহ ডকট্রিন নামে পরিচিত। বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলী দাহিয়াহর নামানুসারে এই কৌশলের নামকরণ করা হয়েছে, যা বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে এক আতঙ্কের নাম।

দাহিয়াহ ডকট্রিনের উৎপত্তি: এই কৌশলের সূত্রপাত হয় ২০০৬ সালের দ্বিতীয় লেবানন যুদ্ধের সময়। হিজবুল্লাহর সাথে যুদ্ধের সময় বৈরুতের ঘনবসতিপূর্ণ দাহিয়াহ এলাকায় ইসরায়েল নির্বিচারে বিমান হামলা চালিয়ে হাজার হাজার ঘরবাড়ি মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। ২০০৮ সালে ইসরায়েলের তৎকালীন সামরিক প্রধান (পরবর্তীতে মন্ত্রী) গাদি আইজেনকোট এই কৌশলের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছিলেন, যেসব গ্রাম থেকে ইসরায়েলের দিকে গুলি চালানো হবে, সেগুলোর অবস্থা বৈরুতের দাহিয়াহ কোয়ার্টারের মতো করা হবে। আমরা সেখানে অসম শক্তি প্রয়োগ করব এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করব। আমাদের দৃষ্টিতে ওগুলো কোনো গ্রাম নয়, ওগুলো সামরিক ঘাঁটি।

ডকট্রিনের মূল লক্ষ্য কী: দাহিয়াহ ডকট্রিনের মূল উদ্দেশ্য কেবল শত্রুপক্ষকে (যেমন হিজবুল্লাহ বা হামাস) পরাস্ত করা নয়, বরং বেসামরিক জনগণের ওপর এমন অসহনীয় দুর্ভোগ চাপিয়ে দেওয়া যাতে তারা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো- সাধারণ সামরিক সক্ষমতার চেয়ে বহুগুণ বেশি শক্তিশালী আক্রমণ চালানো, বাড়িঘর, হাসপাতাল, স্কুল, বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং পানির সরবরাহ ব্যবস্থা ধ্বংস করা, এমনভাবে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো যাতে পুনর্গঠন প্রক্রিয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও দীর্ঘস্থায়ী হয়।

গাজা ও বর্তমান লেবানন যুদ্ধে প্রয়োগ: ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া গাজা অভিযানে এই ডকট্রিনের ভয়াবহ প্রয়োগ দেখা গেছে। এখন পর্যন্ত গাজায় ৭২ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ৮০ শতাংশ ভবন ধ্বংস হয়ে গেছে। ইসরায়েলি সামরিক মুখপাত্র ড্যানিয়েল হাগারি যুদ্ধের শুরুতে স্পষ্ট বলেছিলেন, আমরা এখন নিখুঁত নিশানার চেয়ে সর্বোচ্চ ধ্বংসযজ্ঞের দিকে বেশি মনোনিবেশ করছি।

সম্প্রতি লেবাননে হামলার তীব্রতা বাড়ার পর ইসরায়েলি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, খুব শীঘ্রই দাহিয়াহর অবস্থা খান ইউনিসের (গাজার বিধ্বস্ত শহর) মতো হবে। গত কয়েক সপ্তাহে লেবাননে ১,৫০০-এর বেশি মানুষ নিহত এবং ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যা এই ডকট্রিন প্রয়োগের প্রমাণ দেয়।

আন্তর্জাতিক আইন ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ: আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, যুদ্ধে বেসামরিক নাগরিক এবং সামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে পার্থক্য করা বাধ্যতামূলক। জেনেভা কনভেনশন এবং রোম সংবিধি অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক অবকাঠামো বা সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য। জাতিসংঘের গোল্ডস্টোন রিপোর্ট অনুযায়ী, এই কৌশলটি মূলত একটি বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে শাস্তি দেওয়া, অপমান করা এবং আতঙ্কিত করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এই ধ্বংসাত্মক নীতির কারণেই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আবেদন করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল এই কৌশলের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরোধ গড়তে চাইলেও এটি চরম মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনছে। ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে সামরিক বিজয় আসলেও, বেসামরিক মানুষের এই রক্তক্ষরণ দীর্ঘমেয়াদী ঘৃণা ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা আরও বাড়িয়ে তুলছে।

বাংলাদেশের খবর/ এম.আর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন