সোমালিয়ায় মানবিক বিপর্যয়
৫ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত, না খেয়ে দিন কাটছে লাখো শিশুর
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ২০:৫৩
আফ্রিকার দেশ সোমালিয়ায় খরা ও ক্ষুধার সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশটিতে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় ফসলের মাঠ শুকিয়ে গেছে এবং মারা গেছে লাখ লাখ গবাদি পশু। এই পরিস্থিতিতে কেবল এ বছরই ৫ লাখেরও বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, চরম
এই মানবিক সংকটের মুখে আন্তর্জাতিক ত্রাণ সহায়তা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় সেখানে
দেখা দিয়েছে গণ-অনাহার। জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয়কারী সংস্থা ওচা -এর তথ্যমতে,
২০২৬ সালে সোমালিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় মোট ত্রাণ তহবিলের মাত্র ১৪ শতাংশ এখন পর্যন্ত
পাওয়া গেছে। স
বচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের
পক্ষ থেকে। দুর্নীতি, ত্রাণ চুরির অভিযোগ এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির গুদাম ধ্বংসের
কারণে সোমালিয়াকে ২ বিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক সহায়তা প্যাকেজ থেকে বাদ দিয়েছে বাইডেন প্রশাসন।
ফলে আশ্রয় শিবিরগুলোতে আসা হাজার হাজার পরিবার এখন সম্পূর্ণ সহায়হীন অবস্থায় রয়েছে।
বাইদোয়া ও ডলো অঞ্চলের বাস্তুচ্যুত শিবিরগুলোতে
এখন কেবল দীর্ঘশ্বাস। ৩৩ বছর বয়সী হাওয়া মুয়ালিম তার ছয় সন্তান নিয়ে বাকুল অঞ্চল থেকে
দুই সপ্তাহ আগে বাইদোয়ার ওয়ামো শিবিরে পৌঁছেছেন। পথে তার সাথে থাকা শেষ সম্বল কয়েকটি
ছাগলও মারা গেছে। এখন সন্তানদের মুখে তুলে দেওয়ার মতো কিছুই নেই তার কাছে। আরেকজন অভাগা
মা, ২৮ বছর বয়সী ফারহিয়া ইসাক। সন্তানদের মুখে আহার তুলে দিতে না পেরে তিনি বাবলা গাছের
ডাল সেদ্ধ করে এক ধরণের ঝোল তৈরি করছেন।
তিনি বলেন, "আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে।
এখানে এসেছি সাহায্যের আশায়, কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সহায়তা পাইনি।" ৪৭ বছর বয়সী
হাসান আদানের গল্পটি আরও হৃদয়বিদারক। প্রতিদিন সূর্য ওঠার আগে তিনি বাইদোয়ার কসাইখানায়
যান। সেখানে কসাইরা ছাগলের পায়ের যে অংশগুলো ফেলে দেয়, সেগুলো কুড়িয়ে এনে সেদ্ধ করে
পরিবারের মুখে তুলে দেন। খরা তার পশুপালকের জীবন কেড়ে নিয়ে তাকে আজ রাস্তার ভিখারিতে
পরিণত করেছে।
সেপ্টেম্বরের ‘দেইর’ বৃষ্টিপাত বিফল হওয়ায় সোমালিয়ায়
কৃষি ও গবাদি পশু পালন ধসে পড়েছে। সোমালিয়ায় বর্তমানে ৩.৩ মিলিয়ন মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে
বাস্তুচ্যুত। ওচা’র ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোই এখন
অনাহারে মারা যাওয়ার সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
অনেক পরিবার দিনের পর দিন মাইলের পর মাইল
পথ হেঁটে শিবিরে পৌঁছাচ্ছে। পথে খাবারের অভাবে তারা বুনো লতাপাতা খেয়ে জীবন বাঁচানোর
চেষ্টা করছে। অনেক শিশু এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে তারা আর হাঁটতে পারছে না। সোমালিয়ার
গেডো অঞ্চলে ১৩ বছর বয়সী হাওয়া আলী আবদির মতো হাজার হাজার কিশোরী এখন পড়াশোনার বদলে
মাইলের পর মাইল হেঁটে পানি সংগ্রহের কাজে ব্যস্ত।
খরা কেবল তাদের শৈশব নয়, তাদের বেঁচে থাকার
অধিকারকেও কেড়ে নিচ্ছে। ২৭ বছর বয়সী মা শামসা আবদিওয়াহাব তার ছয় মাসের শিশুসন্তানকে
নিয়ে শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। সাত সন্তানের এই জননী জানান, সারাদিনে মাত্র একবেলা খাবার
জোটে তাদের কপালে।
নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিল -এর সরবরাহকৃত
তথ্যে দেখা যায়, এপ্রিল-জুন মাসের বৃষ্টিপাত শুরু হলেও তা হারানো গবাদি পশু বা ধ্বংস
হওয়া খামার ফিরিয়ে আনতে পারবে না। সোমালিয়ার মানুষের এখন প্রয়োজন তাৎক্ষণিক খাদ্য ও
চিকিৎসাসেবা।
ত্রাণ তহবিলের এই বিশাল ঘাটতি পূরণ না
হলে সোমালিয়া একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সাক্ষী হতে যাচ্ছে। মানবিক
সংস্থাগুলো সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, রাজনীতির মারপ্যাঁচে ত্রাণ আটকে থাকলে তার মাশুল
দিতে হবে নিরপরাধ শিশুদের।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

