দ্যা গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের নীরবতা ও ট্রাম্পের যুদ্ধনীতির নেপথ্যে কি?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ২০:৫৬
২০২৬ সালের এপ্রিলে মধ্যপ্রাচ্য যখন এক ভয়াবহ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছেন টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর জেসন স্ট্যানলি।
গত ৭ এপ্রিল নিউইয়র্ক টাইমসের একটি বিশেষ
নিবন্ধে ফাঁস হওয়া তথ্য অনুযায়ী, ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন, তখন হোয়াইট হাউসের ‘সিচুয়েশন রুম’ কার্যত দখল করে নিয়েছিলেন
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। সেখানে তিনি মোসাদ প্রধান এবং সামরিক
কর্মকর্তাদের সাথে নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে যুদ্ধের জন্য প্ররোচিত করেন।
জেসন স্ট্যানলি তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন,
মার্কিন মূলধারার মিডিয়া রাশিয়ার প্রভাব নিয়ে যতটা সোচ্চার, ইসরায়েলের ক্ষেত্রে ততটাই
নিশ্চুপ। তার মতে, এই নীরবতা এক ধরণের ‘আধুনিক অপপ্রচার’ বা প্রোপাগান্ডা।
নিউইয়র্ক টাইমসের বর্ণনা অনুযায়ী, হোয়াইট
হাউসের সিচুয়েশন রুমে বিদেশি নেতাদের সাথে ব্যক্তিগত বৈঠক বিরল। কিন্তু সেই বৈঠকে
নেতানিয়াহু কেবল উপস্থিতই ছিলেন না, বরং তিনি পুরো প্রেজেন্টেশন স্পেসটি নিয়ন্ত্রণ
করছিলেন। তার পেছনে স্ক্রিনে ভেসে উঠছিল ইসরায়েলি সামরিক কমান্ড ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের
ছবি। একজন যুদ্ধকালীন নেতার মতো তিনি ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণে অংশীদার
হওয়ার জন্য ‘হার্ড সেল’ বা
জোরালো চাপ দিচ্ছিলেন। স্ট্যানলি বলছেন, এই তথ্যটি সামনে আসার পরও মার্কিন মিডিয়া ইসরায়েলের
এই সরাসরি হস্তক্ষেপ নিয়ে রহস্যজনকভাবে নীরব।
মার্কিন সাংবাদিকরা রাশিয়ার প্রভাব নিয়ে
প্রতিনিয়ত সমালোচনা করেন। রেচেল ম্যাডো-র মতো জনপ্রিয় সংবাদ উপস্থাপকদের উদাহরণ টেনে
স্ট্যানলি দেখান যে, তারা রাশিয়ার প্রভাবকে গণতন্ত্রের জন্য হুমকি মনে করলেও ইসরায়েলের
ক্ষেত্রে চোখ বুজে থাকেন। ম্যাডো তার সাম্প্রতিক আলোচনায় ইরানের সাথে উত্তেজনার জন্য
কেবল উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে দায়ী করেছেন, কিন্তু ইসরায়েলের নাম মুখে আনেননি।
স্ট্যানলির মতে, অপপ্রচার কেবল মিথ্যা
বলে করা হয় না; গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করাও অপপ্রচারের একটি অংশ। যদি সংবাদমাধ্যম
রাশিয়ার প্রভাবকে বড় করে দেখায় এবং ইসরায়েলের প্রভাবকে আড়াল করে, তবে সেটি মুক্ত
সাংবাদিকতা হতে পারে না।
কেন মার্কিন মিডিয়া ইসরায়েলকে নিয়ে সমালোচনা
এড়িয়ে যায়? স্ট্যানলি সন্দেহ করছেন, সাংবাদিকরা ভয় পান যে ইসরায়েলের সমালোচনা করলে
তাদের ‘ইহুদিবিদ্বেষী’
বা অ্যান্টিসেমিটিক তকমা দেওয়া হবে। কিন্তু তিনি একে এক বিপজ্জনক যুক্তি হিসেবে দেখিয়েছেন।
আইএইচআরএ এর সংজ্ঞা অনুযায়ী, ইসরায়েল রাষ্ট্র এবং ইহুদি জনগণকে এক করে দেখা ঠিক নয়।
অথচ মিডিয়া যখন ইসরায়েলের সমালোচনাকে ইহুদিদের ওপর আক্রমণ মনে করে নীরব থাকে, তখন
তারা পরোক্ষভাবে ইসরায়েল রাষ্ট্রের অপরাধের দায় বিশ্বের সকল ইহুদি মানুষের ওপর চাপিয়ে
দেয়। এটি নিজেই একটি ইহুদিবিদ্বেষী আচরণ।
বর্তমানে ইসরায়েল গাজায় যে সামরিক অভিযান
চালাচ্ছে এবং লেবাননে যেভাবে জাতিগত নিধন ও বাস্তুচ্যুতির অভিযোগ উঠেছে, সেই সময়ে তাদের
প্রভাব নিয়ে মিডিয়ার নীরবতা এই অপরাধগুলোকে আরও প্রশ্রয় দিচ্ছে।
স্ট্যানলি সতর্ক করে বলেছেন, যেভাবে কিছু
চরমপন্থী ইসলামিক শাসনের অপরাধের জন্য সকল মুসলিমকে দায়ী করা ইসলামোফোবিয়া, তেমনি
ইসরায়েলের সমালোচনা না করাও ইহুদিদের জন্য নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে।
জেসন স্ট্যানলি তার কলামের শেষে পরিষ্কারভাবে
বলেছেন যে, মার্কিন নীতিনির্ধারণীতে ইসরায়েলের বিদেশি হস্তক্ষেপ আড়াল করার কোনো নৈতিক
ভিত্তি নেই। যে সংবাদমাধ্যম আংশিক সত্য বলে, তারা মিথ্যুকদের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক।
কারণ এই আংশিক সত্য একটি মুখোশ হিসেবে কাজ করে, যা পর্দার পেছনের অশুভ তৎপরতাকে ঢেকে
রাখে।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান যুদ্ধংদেহী মনোভার
এবং ইরানের সাথে সংঘাতের নেপথ্যে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ও মোসাদের যে সরাসরি হাত
রয়েছে, তা নিয়ে সোচ্চার না হওয়াকে স্ট্যানলি সংবাদমাধ্যমের ‘স্বার্থপর আপস’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
জেসন স্ট্যানলি টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের
অধ্যাপক এবং একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রোপাগান্ডা এবং ফ্যাসিবাদের
রাজনীতি নিয়ে গবেষণা করছেন। তার এই বিশ্লেষণটি বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা
সাংবাদিকতার স্বচ্ছতা নিয়ে বড় এক প্রশ্ন তুলে দিল।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

