Logo

আন্তর্জাতিক

আলজাজিরার প্রতিবেদন

ইইউর ‘আর্টিকেল ৪২.৭’ কি হতে যাচ্ছে ন্যাটোর বিকল্প ধারা

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ২০:২৩

ইইউর ‘আর্টিকেল ৪২.৭’ কি হতে যাচ্ছে ন্যাটোর বিকল্প ধারা

আটলান্টিকের দুই পাড়ের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের ফাটল এখন আর কোনো গোপন বিষয় নয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তন এবং ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মিত্রদের ওপর ওয়াশিংটনের ক্রমবর্ধমান চাপে ইউরোপের দেশগুলো এখন নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। এই ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একটি স্বল্প পরিচিত প্রতিরক্ষা ধারা— আর্টিকেল ৪২.৭’। প্রশ্ন উঠছে, উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট বা ন্যাটোর কি বিকল্প হতে পারে এই ধারাটি?

১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ন্যাটো জোটের মূল ভিত্তি হলো আর্টিকেল ৫’, যার অর্থ হলো— কোনো এক সদস্য রাষ্ট্রের ওপর হামলা মানে পুরো জোটের ওপর হামলা। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটোর উপযোগিতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন তুলেছেন। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা বাজেটে ইউরোপীয় দেশগুলোর কম অবদান এবং ইরান যুদ্ধে ওয়াশিংটনকে পূর্ণ সমর্থন না দেওয়ায় তিনি ন্যাটোকে একটি কাগুজে বাঘ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

পেন্টাগনের একটি ফাঁস হওয়া নথিতে দেখা গেছে, স্পেনসহ যেসব দেশ ইরান যুদ্ধের সমালোচনা করছে, তাদের ন্যাটো থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার বা অন্য কোনো উপায়ে শাস্তি দেওয়ার পথ খুঁজছে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও ন্যাটো থেকে কোনো সদস্যকে বের করে দেওয়ার কোনো আইনি বিধান নেই, তবুও ওয়াশিংটনের এমন অনমনীয় মনোভাব ইউরোপের দেশগুলোকে নিজেদের সুরক্ষা নিজেরাই নিশ্চিত করার কথা ভাবতে বাধ্য করছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের লিসবন চুক্তির আর্টিকেল ৪২.৭’ হলো জোটের একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ধারা। এটি অনুযায়ী, যদি কোনো ইইউ সদস্য রাষ্ট্র তার ভূখণ্ডে সশস্ত্র আগ্রাসনের শিকার হয়, তবে অন্য সদস্য দেশগুলো তাদের সাধ্যের সবটুকু দিয়ে (সামরিক বা অন্যান্য সহায়তা) আক্রান্ত দেশকে সাহায্য করতে বাধ্য থাকবে।

তবে ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-এর সাথে এর একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ন্যাটোর রয়েছে একটি সমন্বিত সামরিক কমান্ড কাঠামো এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সামরিক শক্তি। অন্যদিকে, ইইউ-র এই ধারার কোনো সুনির্দিষ্ট সামরিক পরিকল্পনা বা স্থায়ী বাহিনী নেই। ফলে এতদিন একে কেবল একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার’ হিসেবেই দেখা হতো।

সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধের সময় সাইপ্রাসে অবস্থিত একটি ব্রিটিশ বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলার পর বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে। সাইপ্রাস ইইউ-র সদস্য হলেও ন্যাটোর সদস্য নয়। সাইপ্রাসের প্রেসিডেন্ট নিকোস ক্রিস্টোডৌলাইডেস জোর দিয়ে বলেছেন, এখন সময় এসেছে এই ধারাটি বাস্তবে কীভাবে কাজ করবে তার একটি নীল-নকশা তৈরি করার। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁও এই সুরেই কথা বলছেন।

গ্রিস সফরকালে তিনি বলেন, "আর্টিকেল ৪২.৭ কেবল কয়েকটি শব্দ নয়। আমাদের কাছে এটি একটি বাধ্যতামূলক অঙ্গীকার। এখানে অস্পষ্টতার কোনো সুযোগ নেই।" ইইউ-র পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাসও মনে করেন, ইউরোপকে এখন তার নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে হবে, কারণ ইউরোপ আর ওয়াশিংটনের প্রধান মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু নেই।

ইতিহাসে আর্টিকেল ৪২.৭ মাত্র একবারই ব্যবহার করা হয়েছে। ২০১৫ সালে প্যারিসে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর ফ্রান্স এই ধারাটি কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছিল। তখন ইইউ-র সদস্য দেশগুলো গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে ফ্রান্সকে সহায়তা করেছিল।

অন্যদিকে, ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-ও মাত্র একবার ব্যবহার করা হয়েছে— ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে আল-কায়েদার হামলার পর। তবে ন্যাটোর সেই উদ্যোগের ফলে আফগানিস্তানে দুই দশকের দীর্ঘ যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, যেখানে মিত্র দেশগুলো হাজার হাজার সৈন্য পাঠিয়েছিল।

সাবেক ব্রিটিশ কূটনীতিক কার্ন রস মনে করেন, সমস্যাটি কেবল সামরিক নয়, বরং আদর্শিক। তিনি বলেন, "এটা এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে ওয়াশিংটন আর ইউরোপ একই মূল্যবোধ ধারণ করে না। ট্রাম্প গণতন্ত্রের ভিত্তি উপড়ে ফেলতে চেয়েছেন। গণতন্ত্রকামী ইউরোপের পক্ষে এমন ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করা এখন বিপজ্জনক।"

বিশেষজ্ঞ পাবলো ক্যালডেরন মার্টিনেজের মতে, আইনি জটিলতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র চাইলেই কাউকে ন্যাটো থেকে বের করে দিতে পারবে না। তবে ট্রাম্প প্রশাসন যদি একতরফাভাবে ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেয়, তবে পুরো জোটটিই মুখ থুবড়ে পড়বে। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়াই নিজেদের রক্ষা করার জন্য ইউরোপের বড় দেশগুলো— বিশেষ করে ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালি— তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। ইইউ কাউন্সিল এখন আর্টিকেল ৪২.৭ ব্যবহারের জন্য একটি হ্যান্ডবুক’ বা নির্দেশিকা তৈরি করছে।

ইউরোপের নীতিনির্ধারকদের মতে, কোনো বৃহৎ শক্তিই তার অস্তিত্ব রক্ষার দায়িত্ব অন্যের হাতে দিয়ে টিকে থাকতে পারেনি। তাই ন্যাটো থাকুক বা না থাকুক, ইউরোপকে এখন নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ঐতিহাসিক চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশের খবর/এম.আর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন