Logo

আন্তর্জাতিক

যুদ্ধ শেষের কাছাকাছি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান

Icon

হাসান রাজীব

প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬, ২১:৪১

যুদ্ধ শেষের কাছাকাছি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পূর্বাভাস দিয়েছেন যে, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ ‘খুব দ্রুত’ শেষ হবে। তেহরানের পারমাণবিক ‘উচ্চাকাঙ্ক্ষা’ বন্ধ করার বিষয়ে তার লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অধিকাংশ মানুষই তার এ উদ্দেশ্য ‘বুঝতে পেরেছেন’। ইরান যখন বলছে যে তারা যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্রস্তাবটি এখনো বিবেচনা করছে, ঠিক তখনই ট্রাম্পের এ মন্তব্য সামনে এলো।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধ শেষ করার জন্য একটি চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে খবর প্রকাশিত হওয়ার পর তেহরান বলেছে, মার্কিন প্রস্তাব এখনো তাদের ‘বিবেচনাধীন’। মার্কিন সংবাদ মাধ্যম অ্যাক্সিওস গতকাল বুধবার জানিয়েছে, হোয়াইট হাউস মনে করছে তারা ইরানের সঙ্গে ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারকে সম্মত হওয়ার ‘কাছাকাছি’ রয়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হোয়াইট হাউস মনে করছে, তারা ইরানের সঙ্গে একটি ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। এ স্মারক ভবিষ্যতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনার একটি রূপরেখা বা ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে ইরানের ভেতরে যুক্তরাষ্ট্রের এ প্রস্তাব নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। দেশটির পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির মুখপাত্র ইবরাহিম রেজায়ি মার্কিন প্রস্তাবকে নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা দাবিদাওয়ার তালিকা ছাড়া আর কিছুই নয়।

ইবরাহিম রেজায়ি আরও বলেন, রণক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যা অর্জন করতে পারেনি, তা আলোচনার টেবিলে আদায়ের অপচেষ্টা করছে। ইরান কোনো ‘চাপের মুখে’ নতি স্বীকার করবে না। প্রয়োজনে পাল্টা আঘাতের জন্য দেশটির সেনারা প্রস্তুত আছেন।

অন্যদিকে গালফ নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর সঙ্গে ফোনালাপে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, কূটনৈতিক পথে যুদ্ধ বন্ধে ইরান প্রস্তুত। তবে ইরানের জনগণের অধিকার রক্ষায় কোনো আপস করা হবে না বলে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন।

ফোনালাপে পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি গভীর অবিশ্বাসও প্রকাশ করেন। তার অভিযোগ, দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চলাকালেই ইরানে দুবার হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এটি পেছন থেকে ছুরি মারার সামিল।

মোজতবা খামেনি ও পেজেশকিয়ান বৈঠক: ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সঙ্গে সম্প্রতি একটি বৈঠকে সাক্ষাৎ করেছেন। এই বৈঠকটি অত্যন্ত ‘আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ’ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে ইরানের প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন। 

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি -এর বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে এই বৈঠক চলে। মোজতবা খামেনি নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করার পর প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এটিই প্রথম দীর্ঘ বৈঠক। 

বৈঠকের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, ‘এই বৈঠকে অন্য যেকোনো বিষয়ের চেয়ে আমাকে যা সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে, তা হলো ইসলামী বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতার (মোজতবা খামেনি) দৃষ্টিভঙ্গি এবং তার অত্যন্ত বিনয়ী ও আন্তরিক আচরণ। তার এই দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনার পরিবেশকে আস্থা, প্রশান্তি ও সহমর্মিতার এক অনন্য স্তরে নিয়ে গিয়েছিল, যা সরাসরি সংলাপের জন্য ছিল অত্যন্ত কার্যকর।’ 

উল্লেখ্য, গত মার্চের শুরুতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে মোজতবা খামেনিকে এখনো জনসমক্ষে দেখা যায়নি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় তার বাবা এবং তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। ওই হামলায় মোজতবা খামেনি নিজেও আহত হয়েছিলেন বলে জানা গেছে।

ইরান-পাকিস্তান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ফোনালাপ: ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের মধ্যে ফোনালাপ হয়েছে। আরাগচির অফিসিয়াল টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এ কথা জানা গেছে।

আরাগচি বলেছেন, ফোনালাপে তাঁরা ‘সংলাপ ও কূটনীতি’ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ফোনালাপ এমন সময়ে হলো যখন যুদ্ধ শেষ করার জন্য নতুন মার্কিন প্রস্তাব বিবেচনা করছে ইরান। মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান ইরান যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে সম্ভাব্য চুক্তি সম্পর্কে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব বিবেচনা করছে ইরান: ইরানের পার্লামেন্টের একজন ঊর্ধ্বতন সদস্য একে ‘অবাস্তব দাবি’ বলে উড়িয়ে দিলেও দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের বিষয়ে তেহরান নিজেদের মতামত পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের জানাবে।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেছেন, তার দেশ চলমান যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধের পর্যায়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ইরানের সঙ্গে আমেরিকার ‘খুব ভালো আলোচনা’ হয়েছে এবং একটি চুক্তি হওয়া সম্ভব।

অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে এ চুক্তিনামাকে এক পৃষ্ঠার ১৪ দফার সমঝোতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা আরও বিস্তারিত পারমাণবিক আলোচনার একটি ভিত্তি তৈরি করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ স্থগিত করা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে ফের অবাধে চলাচল।

দুই মার্কিন কর্মকর্তা এবং নাম প্রকাশ না করা দুই সূত্রের বরাতে এ খবর দিয়েছে অ্যাক্সিওস। তারা বলেছেন, সমঝোতার অনেক শর্তই একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর ওপর নির্ভরশীল।

অ্যাক্সিওসে প্রকাশিত খবর সঠিক বলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যস্থতা সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে। যদিও প্রস্তাবটি এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি বার্তা সংস্থা ইসনাকে বলেছেন, আমেরিকান প্রস্তাব এখনো পর্যালোচনা করছে ইরান এবং পর্যালোচনা শেষে এ বিষয়ে মতামত পাকিস্তানকে জানানো হবে।

চুক্তিতে অঞ্চলিক স্বার্থ বিবেচনায় নিতে হবে- কাতার: যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের যেকোনো চুক্তির ক্ষেত্রে অবশ্যই এই অঞ্চলের দেশগুলোর স্বার্থ বিবেচনায় নিতে হবে। পাশাপাশি বৈশ্বিক স্বার্থের কথাও বিবেচনায় করতে হবে। কাতারের প্রধানমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান বিন জসিম আল থানি এসব কথা বলেছেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে। 

কাতারের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি, সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছি এবং দেখতে পাচ্ছি যে, তেহরান এবং ওয়াশিংটনের ভিন্ন অবস্থান সত্ত্বেও, কূটনৈতিকভাবে তা সমাধানের দারুণ সম্ভাবনা রয়েছে।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আশাবাদী যে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে বার্তা বিনিময়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হচ্ছে।’

হরমুজ প্রণালির কাছে আটকা ১৬০০ জাহাজ: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চললেও বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য কৌশলগতভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির কাছে এখনো প্রায় ১ হাজার ৬০০ জাহাজ আটকে আছে।

মাস দুয়েকের বেশি সময় ধরে এ জলপথ ছাড়ার সুযোগের অপেক্ষায় থাকতে গিয়ে জাহাজ চলাচল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ‘ব্যয়বহুল ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’ পরিস্থিতিতে পড়েছে।

এরই মাঝে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজে আটকে পড়া বিভিন্ন দেশের জাহাজ ও ট্যাংকারগুলো নিরাপত্তা দিয়ে প্রণালি পার হতে সহায়তা করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামের এ উদ্যোগ ৪৮ ঘণ্টা স্থায়ী হয়েছিল। এর আওতায় মাত্র দুটি জাহাজ হরমুজ পার হয়েছে।

এখন প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরা ঝুঁকি নিয়ে আর নিজস্ব উদ্যোগে হরমুজ প্রণালি পার হতে নারাজ। তাদের মতে, আটকে থাকা জাহাজগুলো পানিতে ভাসালে, সেটা পণ্য ও কর্মী—উভয়ের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে।

ইরানি তেল ট্যাঙ্কাওে ফের যুক্তরাষ্ট্রের হামলা: যুদ্ধ অবসানে তেহরানের ওপর চাপ বাড়াতে বুধবার একটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। একই সময়ে ইরান জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করছে। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি এ খবর জানিয়েছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে জানিয়েছে, ওমান উপসাগরে একটি যুদ্ধবিমান ট্যাংকারটির রাডারে আঘাত হানে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, জাহাজটি ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে আরোপ করা মার্কিন অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করছিল।

উল্লেখ্য, ইরান ও আমেরিকার মধ্যে বর্তমানে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি যুদ্ধবিরতি চলছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার শর্তসহ কোনও চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে তেহরানে নতুন করে বোমাবর্ষণের হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প।


বাংলাদেশের খবর/এইচআর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন