পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন শুভেন্দু অধিকারী
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬, ২১:৩৪
পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো সরকার গঠন করল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি)। বিজেপির প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। এছাড়া শপথ নিয়েছেন নতুন সরকারের মন্ত্রীরা। এর মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ৫৯ বছর পর ফিরে এসেছে ১৯৬৭ সালের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। মেদিনীপুরের ভূমিপুত্র অজয় কুমার মুখোপাধ্যায়ের পর দ্বিতীয় কোনো নেতা হিসেবে ক্ষমতাসীন মুখ্যমন্ত্রীকে পরাজিত করে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হলেন শুভেন্দু অধিকারী।
এদিকে, ব্যাপক নাটকীতার পর প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে অভিনেতা থালাপতি বিজয়ের দল তামিলাগা ভেট্ট্রি কাজাগাম (টিভিকে)। এতে রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী যে বিজয়ই হচ্ছেন তা নিশ্চিত হয়ে গেল।
শনিবার কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে রাজ্যে বিজেপি সরকারের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শুভেন্দু অধিকারী। ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-সহ বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবং বিজেপিশাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের উপস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর পদে শপথ নিলেন শুভেন্দু।
শুভেন্দুর মন্ত্রিসভায় পাঁচ জনের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। তারা হলেন— দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল, অশোক কীর্তনিয়া, নিশীথ প্রামাণিক এবং ক্ষুদিরাম টুডু। শুভেন্দুর পর শপথ নেন দিলীপ ঘোষ। তার পর অগ্নিমিত্রা, অশোক কীর্তনিয়া, নিশীথ প্রামাণিক এবং ক্ষুদিরাম টুডু।
রবীন্দ্র জয়ন্তীর এ দিনে শপথ মঞ্চে উঠে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী মোদি। বাজানো হয় জাতীয় সংগীত। আগেই অনুষ্ঠানস্থলে হাজির হন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা অমিত শাহ। শপথ মঞ্চে দেখা গেছে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রাজনাথ সিং, শিবরাজ সিং চৌহান, জেপি নাড্ডাকে।
বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের মধ্যে ছিলেন উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথ, অন্ধ্রপ্রদেশের চন্দ্রবাবু নাইডু, মহারাষ্ট্রের দেবেন্দ্র ফডনবীশ, আসামের হিমন্ত বিশ্বশর্মা, ত্রিপুরার মানিক সাহা, দিল্লির রেখা গুপ্ত, বিহারের সম্রাট চৌধুরী, উত্তরাখণ্ডের পুষ্কর সিং ধামি প্রমুখ। আরও ছিলেন সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি, বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পাল, অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তীসহ কেন্দ্র ও রাজ্য বিজেপির শীর্ষ নেতারা। কলকাতা আর দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকে শপথ অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন। রাজ্যের সবগুলো জেলা থেকে বিজেপির নেতা-কর্মীরাও এসেছেন।
শুভেন্দু অধিকারী বিজেপির প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হলেন, কিন্তু ঘটনাচক্রে কলকাতার ভবানীপুর আসন থেকে জয়ী দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী তিনি। সদ্য প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী ওই আসন থেকে তিনবার ভোটে লড়ে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন।
মমতা ব্যানার্জীর এক সময়ের সতীর্থ বা রাজনৈতিক সহকর্মী থেকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। তার কাছেই পর পর দুটো বিধানসভা নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন মমতা ব্যানার্জী। প্রথমবার ২০২১ সালে নন্দীগ্রামে, আবার এ বছর তার ঘরের মাঠ বলে পরিচিত ভবানীপুর আসনে। তাই শুভেন্দু অধিকারীকে ‘জায়ান্ট কিলার’ও বলা হচ্ছে ভারতের অনেক গণমাধ্যমে, যিনি মুখ্যমন্ত্রীকে দুবার পরাজিত করেছেন।
সোমবারের ভোট গণনায় বিজেপি রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ২০৭টিতে জয়লাভ করে, ফলে ব্যানার্জীর সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে এবং এই হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলটি রাজ্যে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসে।
এর আগে ১৯৬৭ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল চন্দ্র সেনকে তার নিজের কেন্দ্র আরামবাগে পরাজিত করেছিলেন অজয় মুখোপাধ্যায়। ঠিক একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল ২০২৬-এ। শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভবানীপুরে ১৫,৫০৫ ভোটে পরাজিত করেছেন। শুধু তাই নয়, অজয় মুখোপাধ্যায়ের মতো তিনিও মেদিনীপুরের নিজস্ব গড় এবং মুখ্যমন্ত্রীর কেন্দ্র— এই দুই আসনেই জয়লাভ করে বিধানসভায় প্রবেশ করেছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দুই নেতার উত্থান ও কৌশলের মধ্যে রয়েছে অদ্ভুত মিল। অজয় মুখোপাধ্যায় কংগ্রেস ত্যাগের আগে সেচমন্ত্রী ছিলেন। শুভেন্দু অধিকারীও তৃণমূল ত্যাগের আগে সেচ দফতরের দায়িত্বেই ছিলেন। ১৯৬৭ সালে খাদ্যসংকট ও ‘কাঁচকলা মন্ত্রিসভা’র বিরুদ্ধে জনরোষকে কাজে লাগিয়েছিলেন অজয় বাবু।
অন্যদিকে, ২০২৬-এ দুর্নীতির অভিযোগ ও পরিবর্তনের আবেগকে হাতিয়ার করেছেন শুভেন্দু। শুক্রবার (৮ মে) বিজেপির পরিষদীয় দলের বৈঠকে শুভেন্দুকে সর্বসম্মতিতে নেতা নির্বাচিত করা হয়। ইতিহাস বলছে, অজয় মুখোপাধ্যায়ের জোট সরকার (যুক্তফ্রন্ট) অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। তবে শুভেন্দু অধিকারীর সামনে সেই সংকট নেই। ২০৭টি আসন নিয়ে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে একক শক্তিতে সরকার গড়তে চলেছে বিজেপি।
নিজের নতুন দায়িত্ব নিয়ে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘আমি নয়, আমরা’— এই মন্ত্রেই কাজ হবে। কথা কম, কাজ বেশি করবে নতুন সরকার। ভয়ের পরিবেশ কাটিয়ে রাজ্যে ‘ভরসার পরিবেশ’ গড়ে তোলাই তার প্রধান লক্ষ্য বলে তিনি জানান।
উল্লেখ্য, শুভেন্দু অধিকারী একজন ভারতীয় রাজনীতিবিদ, যিনি ভারতীয় জনতা পার্টির সদস্য। তিনি ২০২১ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়াও, তিনি ২০২১ সাল থেকে নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক এবং ২০০৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত কাঁথি দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক ছিলেন।
তিনি এর আগে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পরিবহন মন্ত্রী হিসেবে ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত এবং ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সেচ ও জলসম্পদ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তমলুক লোকসভা কেন্দ্রের সংসদ সদস্য ছিলেন এবং ২০২০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ভারতীয় পাট নিগমের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি ১৯৯৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্য এবং ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সদস্য ছিলেন। তিনি শিশির অধিকারীর পুত্র, যিনি একজন সংসদ সদস্য এবং মনমোহন সিং সরকারের পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের প্রাক্তন কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন।
শুভেন্দু অধিকারী ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭০ সালে পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কাঁকুলিতে মাহিষ্য ক্ষত্রিয় জনগোষ্ঠীর শিশির অধিকারী ও গায়ত্রী অধিকারীর ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। শিশির অধিকারী একজন রাজনীতিবিদ এবং দ্বিতীয় মনমোহন সিং মন্ত্রিসভায় প্রাক্তন রাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। তিনি ২০১৯ সালে কাঁথি লোকসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হন। শুভেন্দু অধিকারী অবিবাহিত।
শুভেন্দুর ভাইদের মধ্যে একজন সৌমেন্দু অধিকারী কাঁথি পৌরসভার চেয়ারম্যান। দিব্যেন্দু অধিকারী, যিনি ২০১৯ সালে তমলুক লোকসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হন, তিনিও তার ভাই। অধিকারী নেতাজি সুভাষ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার অব আর্টস (এমএ) ডিগ্রি অর্জন করেছেন।
পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কাঁথি শহরের বাসিন্দা শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক জীবন পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীঘার নিকটবর্তী এই অঞ্চল থেকে উঠে আসা অধিকারী পরিবার দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক পটভূমি মূলত কংগ্রেস ঘরানার। তার বাবা শিশির অধিকারী একসময় মেদিনীপুর জেলার প্রভাবশালী কংগ্রেস নেতা ছিলেন এবং পরবর্তীতে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন। তৃণমূল গঠনের পর তিনি দলীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন থালাপতি বিজয়: এদিকে, ব্যাপক নাটকীতার পর প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল অভিনেতা থালাপতি বিজয়ের দল তামিলাগা ভেট্ট্রি কাজাগাম (টিভিকে)। রাজ্যের ছোট দুই দল- ভিদুথালাই চিরুথাইগাল কাচ্চি (ভিসিকে) ও ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগ (আইইউএমএল) থালাপতির দল টিভিকে-কে নিঃশর্ত সমর্থনের ঘোষণা দিয়েছে। এতে রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী যে বিজয়ই হচ্ছেন তা নিশ্চিত হয়ে গেল।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, শনিবার ভিসিকে এবং আইইউএমএল, যাদের প্রত্যেকের দুজন করে বিধায়ক রয়েছে টিভিকে-কে নিঃশর্ত সমর্থন জানিয়েছে। তাদের সমর্থনে টিভিকে-নেতৃত্বাধীন জোটের আসন সংখ্যা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১১৮ সীমা অতিক্রম করে ১২০টিতে পৌঁছেছে।
এনডিটিভির হাতে আসা রাজ্যের গভর্নর আর ভি আরলেকারকে লেখা ভিসিকের সমর্থনপত্রে বলা হয়েছে, তামিলনাড়ুতে একটি স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক সরকার নিশ্চিত করার জন্যই বিজয়কে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
দলটির সভাপতি ড. থোল থিরুমাভালাভান বলেছেন, ‘আমাদের দুই বিধায়কের পক্ষ থেকে, তামিলনাড়ু রাজ্যে সরকার গঠনের উদ্দেশ্যে বিজয়ের নেতৃত্বে থাকা টিভিকে-কে আমাদের সমর্থন জ্ঞাপন করছি। এই সমর্থন... তামিলনাড়ুর জনগণের জন্য স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক শাসন নিশ্চিত করার স্বার্থে জানানো হচ্ছে। আমি আমাদের এই নিঃশর্ত সমর্থন গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ করছি’।
এরআগে গতকাল শুক্রবার (৮মে) বিজয়কে সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছিল ভিসিকে ও আইইউএমএল। এতে টানা তিনদিনে তৃতীয়বারের মতো রাজ্যের গভর্নর আরলেকারের সঙ্গে বৈঠকে বসেন বিজয়। এ বৈঠকেই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার গঠনের দাবি জানান তিনি। তবে গর্ভনরের কাছে ওই দুই দলের আনুষ্ঠানিক সমর্থনপত্র দেখাতে পারেননি বিজয়। এতে আবারো বিপাকে পড়েন দক্ষিণী সিনেমার এই অভিনেতা।
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

