দুর্নীতির তদন্তের মুখে স্পেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাপাতেনো
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬, ২০:৫০
স্পেনের বহুল আলোচিত ‘প্লাস আল্ট্রা’ এয়ারলাইন্স কেলেঙ্কারিতে অবৈধ প্রভাব খাটানো ও সংশ্লিষ্ট অপরাধের অভিযোগে দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী হোসে লুইস রদ্রিগেজ জাপাতেনোর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়েছে।
স্পেনের উচ্চ আদালত (হাইকোর্ট) মঙ্গলবার জানিয়েছে, মাদ্রিদে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ আরও তিনটি স্থানে তল্লাশি চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে আগামী ২ জুন তাকে আদালতে হাজির হয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য সমন জারি করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২১ সালে করোনা মহামারি
চলাকালীন। সে সময় স্পেনের রাষ্ট্রীয় হোল্ডিং কোম্পানি ‘সেপি’ -র মাধ্যমে লোকসানে
থাকা বিমান সংস্থা ‘প্লাস আল্ট্রা’কে ৫৩ মিলিয়ন
ইউরো (প্রায় ৬২ মিলিয়ন ডলার) রাষ্ট্রীয় আর্থিক সহায়তা বা ‘বেইলআউট’ দেওয়া হয়। গত
ডিসেম্বরের শেষের দিকে ব্যবসায়ী জুলিও মার্টিনেজ মার্টিনেজ (যিনি ‘হুলিতো’ নামে পরিচিত)
সহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের পর এই মামলার তদন্ত নাটকীয় মোড় নেয়।
অভিযোগ উঠেছে, প্লাস আল্ট্রাকে এই বিশাল
অঙ্কের অনুদান পাইয়ে দেওয়ার পেছনে মূল চালিকাশক্তি ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাপাতেনো।
তিনি সে সময়ের পরিবহন মন্ত্রণালয়কে (যার দায়িত্বে ছিলেন হোসে লুইস আবালোস) এই উদ্ধার
প্যাকেজটি অনুমোদনের জন্য অনৈতিক চাপ প্রয়োগ করেছিলেন।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সন্দেহের তালিকায়
রয়েছে হুলিতোর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানালিসিস রেলেভান্তে’। অভিযোগ রয়েছে,
এই প্রতিষ্ঠানটি ঠিক সমপরিমাণ অর্থ পেয়েছিল, যা পরবর্তীতে প্লাস আল্ট্রা কর্তৃপক্ষ
জাপাতেনোকে পরিশোধ করে। এছাড়া স্পেনের অন্য একটি বড় দুর্নীতি মামলার অন্যতম অভিযুক্ত
ব্যবসায়ী ভিক্টর দে আলদামা দাবি করেছেন, এই চুক্তি সম্পন্ন করার জন্য জাপাতেনো নিজে
১০ মিলিয়ন ইউরো (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৪০ কোটি টাকা) কমিশন বা ঘুষ নিয়েছিলেন।
প্লাস আল্ট্রা এয়ারলাইন্সের এই বেইলআউট শুরু থেকেই রাজনৈতিকভাবে চরম বিতর্কিত ছিল।
সমালোচকেরা এই বিমান সংস্থার আর্থিক সক্ষমতা
নিয়ে যেমন প্রশ্ন তুলেছিলেন, তেমনি এর মালিকানার সাথে ভেনেজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট
নিকোলাস মাদুরোর ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সংযোগের বিষয়টিকেও সামনে এনেছিলেন। ফলে এই
সহায়তার স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে স্পেনে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। আদালত এখন খতিয়ে
দেখছে যে, এই অর্থায়ন সঠিকভাবে অনুমোদিত হয়েছিল নাকি এর পেছনে কোনো অবৈধ লবিং বা প্রভাব
কাজ করেছিল।
স্পেনের আন্দালুসিয়া অঞ্চলের সরকারের
প্রেসিডেন্ট হুয়ানমা মোরেনো স্থানীয় দৈনিক ‘এল পাইস’-কে দেওয়া এক
সাক্ষাৎকারে বলেন, “স্পেনের ইতিহাসে এর আগে কখনো কোনো সাবেক
প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে এমন গুরুতর তদন্ত বা অভিযোগের নজির নেই। এটি অভূতপূর্ব এবং
এর ঝাঁকুনি বর্তমান সরকারের ওপর গিয়ে পড়বে।”
২০০৪ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত স্পেনের শাসন
ক্ষমতায় থাকা সমাজতান্ত্রিক নেতা জাপাতেনো বর্তমান প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সঞ্চেজের একজন
অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও প্রভাবশালী মিত্র হিসেবে পরিচিত। তাছাড়া ক্ষমতা ছাড়ার পর থেকেই ভেনেজুয়েলার
সরকারের সাথে তার ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে বিরোধী দলগুলো বরাবরই সোচ্চার
ছিল।
বর্তমানে এই মামলার সূত্র ধরে রক্ষণশীল
বিরোধী দল ‘পিপলস পার্টি’ (পিপি) প্রধানমন্ত্রী
পেড্রো সঞ্চেজের নেতৃত্বাধীন সোশ্যালিস্ট ওয়ার্কার্স পার্টির বিরুদ্ধে তাদের আক্রমণ
আরও জোরদার করেছে। সঞ্চেজ প্রশাসন ইতিমধ্যেই তার স্ত্রী, ভাই এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের
জড়িয়ে বেশ কয়েকটি পৃথক দুর্নীতি মামলার তদন্তের কারণে চরম রাজনৈতিক চাপে রয়েছে।
তবে এর আগে একটি সংসদীয় কমিটির সামনে
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন জাপাতেনো।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

