আয়ারল্যান্ডের মূলধারার রাজনীতিতে গ্যাংস্টারদের থাবা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬, ২১:১২
আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনের সেন্ট্রাল আসনের উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশটির মূলধারার রাজনীতিতে এক চরমপন্থী ও উগ্র-অভিবাসনবিরোধী হাওয়া বইতে শুরু করেছে। আর এই আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন দেশটির কুখ্যাত অপরাধ জগতের ডন বা গ্যাংস্টার হিসেবে পরিচিত জেরি 'দ্য মঙ্ক' হাচ। ৬৩ বছর বয়সী এই সাবেক অপরাধী এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়িয়ে সাধারণ ভোটারদের একাংশের মধ্যে ব্যাপক উন্মাদনা তৈরি করেছেন, যা আয়ারল্যান্ডের চিরাচরিত রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন ঘটনা।
চলতি সপ্তাহের শুক্রবার ডাবলিন সেন্ট্রাল
আসনের উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে এবং শনিবার ফলাফল প্রকাশ করা হবে। তবে ভোটের
ফলাফল যা-ই হোক না কেন, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে একটি বিষয় ইতিমধ্যেই স্পষ্ট—আয়ারল্যান্ডের
মূলধারার রাজনীতিতে নবাগত, বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গ ও মুসলিম অভিবাসীদের প্রতি বিদ্বেষ
এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। প্রচারণায় নেমে জেরি হাচ আয়ারল্যান্ডে আসা "অবৈধ অভিবাসীদের"
বিশেষ ক্যাম্পে বন্দি রাখার দাবি জানিয়েছেন। বিশেষ করে পূর্ব আফ্রিকা ও সোমালিয়ার নাগরিকদের
টার্গেট করে তিনি বলেন, "তাদের কোনোভাবেই ঢুকতে দেওয়া উচিত নয়, সরাসরি বন্দিশালায়
পাঠানো উচিত।"
নির্বাচনী প্রচারণার সময় হাচের একটি জনসংযোগের
চিত্র তুলে ধরে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানায়, ট্রাকে করে পপ গান বাজিয়ে
প্রচারণার সময় হাচ দাবি করেন, ৯৪ শতাংশ আইরিশ নাগরিকই অভিবাসন নিয়ে আরও কঠোর আইন চান।
তিনি বলেন, "কিন্তু আয়ারল্যান্ডে এখন এই সত্যি কথাটি বলার উপায় নেই। দেশে তীব্র
আবাসন সংকটের কারণে মানুষ ঘরবাড়ি পাচ্ছে না, অথচ আপনি অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কথা বলতে
পারবেন না।"
ডাবলিন সেন্ট্রাল আসনটিতে একই সাথে যেমন
খেটে খাওয়া শ্রমিক শ্রেণী ও আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসন রয়েছে, তেমনি রয়েছে অভিজাত এলাকাও।
হাচের দাবি, স্থানীয় বাসিন্দাদের অনুরোধেই তিনি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন। রাস্তাঘাটে সাধারণ
মানুষ তাঁর সাথে সেলফি তুলছেন এবং তাঁকে "পরিবর্তনের নায়ক" হিসেবে আখ্যা
দিচ্ছেন। অথচ, জেরি হাচ কয়েক দশক ধরে আয়ারল্যান্ডের অপরাধ জগতের এক ত্রাস হিসেবে
পরিচিত। আদালত তাকে একটি সংগঠিত অপরাধী চক্রের প্রধান হিসেবে চিহ্নিত করেছিল এবং ২০০৮
সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই স্বীকার করেছিলেন, "আমি অনেক অপরাধ করেছি এবং
কিছু অপরাধ করে পার পেয়ে গেছি।"
২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে প্রায় জিতেই
যাচ্ছিলেন হাচ। আর এবার ক্ষমতাসীন 'ফাইন গেল' পার্টির অর্থমন্ত্রী পাসকাল ডোনোহো বিশ্বব্যাংকের
চাকরিতে যোগ দিতে পদত্যাগ করায় শূন্য হওয়া আসনটিতে লড়ছেন তিনি। এক জনমত জরিপে দেখা
গেছে, ১৪ শতাংশ ভোটারের প্রথম পছন্দের তালিকায় তৃতীয় স্থানে আছেন হাচ। একই জরিপ বলছে,
ভোটারদের কাছে সবচেয়ে বড় সমস্যা জীবনযাত্রার ব্যয় (৩৩%) এবং আবাসন সংকট (২৪%)। তবে
অভিবাসনকে (১২%) অনেকে এই দুটি সমস্যার মূল কারণ মনে করছেন। ৪৫ বছর বয়সী কসাই জন ক্লার্ক
বলেন, "আমি বর্ণবাদী নই, কিন্তু বাইরের লোক আনার আগে আমাদের নিজেদের নাগরিকদের
দেখা উচিত। আমার দুই সন্তান এখানে বাড়ি কিনতে না পেরে সিডনি চলে গেছে। বিশেষ করে মুসলিমদের
আসার ব্যাপারে আমার আপত্তি আছে।"
নির্বাচনে বর্ণবাদের এই উত্থানে প্রধান
দলগুলো বিব্রত হলেও ভোট ব্যাংক রক্ষায় সুর নরম করেছে। প্রধান বিরোধী দল সিন ফেইনের
নেত্রী মেরি লু ম্যাকডোনাল্ড হাচের চরমপন্থী মন্তব্যের সরাসরি নিন্দা না করে এড়িয়ে
গেছেন। এদিকে, আয়ারল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন ফিওনা ফেইল পার্টির নেতা
বার্টি আহের্নের একটি গোপন অডিও ফাঁস হওয়ায় বিতর্ক আরও বেড়েছে। সেখানে তাঁকে এক ভোটারের
উদ্দেশ্যে বলতে শোনা যায়, "আমি আফ্রিকানদের নিয়ে চিন্তিত। কঙ্গো বা এই ধরণের জায়গা
থেকে আমরা লোক নিতে পারি না।" তিনি মুসলিমদের নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। যদিও
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মাইকেল মার্টিন এই মন্তব্যকে 'অনভিপ্রেত' বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
গত ১৫ মে ডাবলিনের সিটি সেন্টারে নিরাপত্তা
রক্ষীদের হাতে ইভস সাকিলা (৩৫) নামে এক কঙ্গোলিজ নাগরিকের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে
বর্ণবাদ ও জাতিগত উত্তেজনা আরও তীব্র হয়েছে। সাধারণ মানুষ দেশের মূলধারার দলগুলোর ওপর
ক্ষুব্ধ। ৭৭ বছর বয়সী ভোটার জিমি ম্যাকডেইড বলেন, তিনি হাচকেই ভোট দেবেন। হাচের অপরাধমূলক
অতীত নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, "সব মানুষেরই দ্বিতীয় সুযোগ পাওয়ার অধিকার
আছে। তাছাড়া আমাদের সরকারই তো সবচেয়ে বড় গ্যাংস্টার, মুখে এক বলে আর কাজে আরেক করে।"
ডাবলিনের এই উপনির্বাচন আয়ারল্যান্ডের
রাজনীতিতে এক গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে দীর্ঘদিনের উদারপন্থী সমাজব্যবস্থাকে
পেছনে ফেলে কট্টর ডানপন্থী ও অভিবাসনবিরোধী নীতি ডালপালা মেলছে।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

